ইসলামাবাদকে ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রযুক্তির সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুত্রদের সাথে সংশ্লিষ্ট মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানি 'পাওয়ারাস'। সম্প্রতি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে তারা একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে।
মার্কিন
গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশেষ বাহিনীর
অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা ২০২৫ সালের
অক্টোবরে 'অটোনোমাস পাওয়ার কর্পোরেশন' নামে ‘পাওয়ারাস’ প্রতিষ্ঠা করেন। গত মার্চে কোম্পানিটি 'অরিয়াস গ্রিনওয়ে হোল্ডিংস'-এর সাথে একীভূত
হওয়ার ঘোষণা দেয়। প্রক্রিয়াটি এই অক্টোবরে 'পাওয়ারাস'
নামেই সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
অরিয়াস
গ্রিনওয়ে মার্কিন সামরিক-শিল্প কাঠামোর কোনো পরিচিত নাম
নয়। বরং গলফ রিসোর্টের
মালিক হিসেবেই তারা বেশি পরিচিত।
পাওয়ারাসের বিনিয়োগকারীদের কথা বিবেচনা না
করলে এই অংশীদারিত্বকে আপাতদৃষ্টিতে
অদ্ভুত মনে হতে পারে।
তাদের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে ট্রাম্প পরিবারের মালিকানাধীন তহবিল 'আমেরিকান ভেঞ্চারস' এবং 'আনইউজুয়াল মেশিনস'
। ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র শেষোক্ত কোম্পানির একজন উপদেষ্টা ও
শেয়ারহোল্ডার।
গঠনের মাত্র
ছয় মাসের মধ্যে পাওয়ারাস তিনটি ছোট প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ
করে এবং চালকবিহীন আকাশ
ও সামুদ্রিক ব্যবস্থা তৈরি শুরু করে। একই সময়ে,
ইউক্রেনে উদ্ভাবিত স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে পাওয়ারাস 'জি১ এক্সপ্লোরেশন'-এর
সাথেও চুক্তি করে।
ইউক্রেনীয়
নির্মাতাদের তৈরি সাতটি পূর্ণাঙ্গ
ড্রোন মডেল এবং আরও
বেশ কিছু উন্নয়নাধীন ব্যবস্থার
মেধাস্বত্ব 'জি১
এক্সপ্লোরেশন'-এর হাতে রয়েছে।
যৌথ প্রচেষ্টায় কোম্পানি দুটি 'গার্ডিয়ান' সিরিজের ইন্টারসেপ্টর ড্রোন বাজারে আনে।
লকহিড
মার্টিন, জেনারেল ডাইনামিক্স এবং বোয়িং-এর
মতো অনেক বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের
সাথে প্রতিযোগিতা করে এই গ্রীষ্মে
পাওয়ারাস বেশ কয়েকটি চুক্তি
করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য,
ওই প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন অনেক বেশি, চালকবিহীন
প্রযুক্তির বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব বিশাল এবং লবিং বা
প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাও অনেক বেশি।
'অটোনোমাস
পাওয়ার কর্পোরেশন'-এর পূর্ণ মালিকানাধীন
অঙ্গপ্রতিষ্ঠান 'ট্যান্ডেম ডিফেন্স এলএলসি'-র হয়ে কার্যক্রম
পরিচালনাকারী পাওয়ারাস ৩,০০০ ইন্টারসেপ্টর
ড্রোন সরবরাহের জন্য মার্কিন বিমান
বাহিনীর সাথে ৯০ মিলিয়ন
মার্কিন ডলারের একটি চুক্তি লাভ
করে। এছাড়া আগস্ট মাসে, ১,৫০০টি 'ফার্স্ট-পারসন-ভিউ' ড্রোন, কন্ট্রোল
কিট এবং খুচরা যন্ত্রাংশ
সরবরাহের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা
বিভাগের সাথে ২.৫
মিলিয়ন ডলারের আরেকটি চুক্তিও তারা জিতে নেয়।
পাওয়ারাসের
আরেকটি উল্লেখযোগ্য চুক্তি হলো ট্রাম্প-নেতৃত্বাধীন
মার্কিন সরকারের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তেল
ও গ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সুরক্ষার একটি ব্যবস্থা গড়ে
তোলার জন্য ২২.৩
মিলিয়ন ডলারের চুক্তি। দুই বছর মেয়াদী
এই চুক্তির আওতায়, ইরানের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় আকাশপথে হুমকি শনাক্তকারী নেটওয়ার্ক স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য
পাওয়ারাস প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার সরবরাহ
করবে।
পরবর্তীতে
কোম্পানিটি 'গালফ কো-অপারেশন
কাউন্সিল'-এর অন্তর্ভুক্ত একটি
দেশে (যার নাম প্রকাশ
করা হয়নি) 'গার্ডিয়ান ইন্টারসেপ্টর' উৎপাদনের জন্য একটি কারখানা
বা প্রোডাকশন লাইন চালুর ঘোষণা
দেয়। চুক্তিসংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গার্ডিয়ান
এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে
যা "একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন (ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক
ড্রোন) এবং অন্যান্য স্বল্পমূল্যের
আকাশ-হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম"।
এতে আরও বলা হয়,
"আঞ্চলিক উৎপাদনের ফলে গ্রাহকদের কাছাকাছি
উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ওঠে, যা
যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত
ব্যবস্থা (সিস্টেম) শিপিং বা পরিবহনের তুলনায়
সরবরাহের সময় কমিয়ে আনে।"
পাওয়ারাস
ভারতীয় উপমহাদেশে ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রযুক্তি পুনঃরপ্তানিও শুরু করেছে। শুরুতে
তারা ভারতে 'গার্ডিয়ান-১' প্রযুক্তি উৎপাদন
ও বিক্রির জন্য মুম্বাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান
'পারাস ডিফেন্স অ্যান্ড স্পেস টেকনোলজিস'-এর সাথে চুক্তি
স্বাক্ষর করে।
এরপর
১৬ সেপ্টেম্বর তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর
সাথে একটি সমঝোতা স্মারক
স্বাক্ষর করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর
প্রতিনিধিত্ব করেন ফিল্ড মার্শাল
আসিম মুনির, যিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের
সাথে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য পরিচিত।
পাওয়ারাসের
সহ-প্রতিষ্ঠাতা ব্রেট ভেলিকোভিচ জানান, এই চুক্তির আওতায়
প্রাথমিকভাবে কিছু চালকবিহীন আকাশযান
(ইউএভি) সরবরাহের আদেশ রয়েছে। যদিও
এর সুনির্দিষ্ট বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি। তিনি
আরও বলেন, পাকিস্তানের সাথে যৌথ প্রযুক্তি
অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং
সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করাই কোম্পানির চূড়ান্ত
লক্ষ্য।
পাওয়ারাসের
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অ্যান্ড্রু ফক্স যোগ করেন
যে, পাকিস্তানের বেসরকারি প্রতিরক্ষা খাত উন্নয়নের প্রাথমিক
পর্যায়ে থাকলেও এটি মার্কিন কোম্পানিগুলোর
কাছে বেশ আগ্রহের বিষয়।
এই বিবৃতিগুলো
যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য পুনরুজ্জীবন কিনা
সেই প্রশ্ন উঠেছে। ওয়াশিংটন মূলত ইসলামাবাদকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে এবং কেবল
আগে সরবরাহ করা এফ-১৬ যুদ্ধবিমানগুলোর আধুনিকায়নের প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে 'পাওয়ারাস'
চুক্তিটি ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
'অপারেশন সিন্দুর'-এর
সময়কার সংঘাতের পর পাকিস্তান তার সামরিক ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। তারা বেসরকারি
কোম্পানিগুলোকে ড্রোন তৈরির জন্য উৎসাহিত করে এবং দেশজুড়ে ছোট ও বিকেন্দ্রীভূত উৎপাদন
কেন্দ্রের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
গুরুত্বপূর্ণ
স্থাপনাগুলোর সুরক্ষায় পুলিশ 'অ্যান্টি-ড্রোন নেট' বা ড্রোন-প্রতিরোধী জাল ব্যবহারের
ব্যবস্থা নেয় এবং সরকার পাল্টা ড্রোন ব্যবস্থা (কাউন্টার-ড্রোন সিস্টেম) গড়ে তোলে।
এছাড়া, ইসলামাবাদ বেসরকারি খাত এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বিদেশি সম্পৃক্ততা
বাড়ানোরও চেষ্টা চালায়।
রাশিয়ার সাথে
যুদ্ধ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্পকে বেগবান করেছে। কিয়েভ এখন তার যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে
কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে এবং মিত্র ও নিরপেক্ষ—উভয়
ধরনের দেশের সাথেই অসংখ্য ড্রোন চুক্তি স্বাক্ষর করছে।
এশিয়া টাইমস, ইংরেজি থেকে অনুবাদ