দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবনের দাবি জোরালো হচ্ছে। বেশ কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র এই আঞ্চলিক জোটটিকে পুনরায় সক্রিয় করার বিষয়ে নতুন করে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার উত্তেজনা এখনো প্রধান বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

গত সপ্তাহে পাকিস্তান সফরের সময় মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানান এবং এই প্রক্রিয়ায় তার দেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন।

২১ অক্টোবর ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মুইজ্জু বলেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব। তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন, অর্থবহ সংলাপ উৎসাহিত করা এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত থাকা সার্ক শীর্ষ সম্মেলন যত দ্রুত সম্ভব আয়োজন করার আহ্বান জানান। মুইজ্জু বলেন, প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরির জন্য মালদ্বীপ অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। এর আগে জুলাই মাসে মালদ্বীপের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানেও তিনি একই আহ্বান জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, সংস্থাটিকে পুনরায় সক্রিয় করার প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতা করতে তার দেশ প্রস্তুত রয়েছে।

সর্বশেষ সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ২০১৪ সালের ২৬-২৭ নভেম্বর কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর আর কোনো শীর্ষ সম্মেলন হয়নি; অথচ এই ১২ বছরে অন্তত ছয়টি সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। এই জোটের সদস্য দেশগুলো হলো—আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা।

সর্বশেষ শীর্ষ সম্মেলনের পর থেকে সার্কের সভাপতিত্ব করছে নেপাল। গত এক দশকে তারা সংস্থাটিকে পুনরায় সচল করার জন্য বারবার চেষ্টা চালিয়েও সফল হয়নি। কূটনীতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এই নতুন আগ্রহকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, কেবল সমর্থনসূচক বক্তব্য দিয়ে এই জোটকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে না।

কূটনীতিক শম্ভু রাম সিমখাদা জানান, সার্কের বিষয়ে কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে—এমনকি ভারতের কিছু কূটনীতিকের মধ্যেও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

সিমখাদা বলেন, “অনেকে সার্ক পুনরুজ্জীবনের আহ্বান জানাচ্ছেন, যা আশাব্যঞ্জক। তবে এর ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। ভারত যদি নিজেদের অবস্থানে পরিবর্তন না আনে, তবে সার্কের গতি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।”

বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও ভুটানের উদ্যোগ

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারও সার্ক (SAARC)-কে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানিয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন যে, সরকার এই সংস্থাকে পুনরায় সক্রিয় করার লক্ষ্যে কাজ করছে। তিনি জানান, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সাথে বিভিন্ন বৈঠকে তিনি সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়ে বাংলাদেশের জোরালো আগ্রহের কথা তুলে ধরেছেন।

১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

শ্রীলঙ্কাতেও সার্ক পুনরুজ্জীবনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা গতি পেয়েছে; দেশটি এই ইস্যুতে কূটনৈতিক সংলাপ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। জুন মাসে শ্রীলঙ্কার থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘রিজিওনাল সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’ কলম্বোতে এই জোটকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সার্কের মহাসচিব গোলাম সারওয়ার, শ্রীলঙ্কা সরকারের কর্মকর্তা এবং কূটনীতিকরা সংস্থাটিকে পুনরায় কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

একই সময়ে, সারওয়ার শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী হারিনি আমারাসুরিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সার্কের প্রতি তাঁর দেশের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

ভুটানও দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনায় এই জোটকে পুনরায় সক্রিয় করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে। আগস্ট মাসে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে উভয় পক্ষই জোটটিকে পুনরুজ্জীবিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দেয়। এছাড়া, ভুটান সংস্থাটির ১৬তম মহাসচিব হিসেবে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সার্কের সচিবালয় কাঠমান্ডুতে অবস্থিত। বর্তমানে নেপাল এর সভাপতিত্ব করছে, কারণ ২০১৬ সালে যে শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল—যেখানে পাকিস্তানের কাছে সভাপতিত্ব হস্তান্তরিত হওয়ার কথা ছিল—তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

বর্তমান মহাসচিব, বাংলাদেশের মো. গোলাম সারওয়ার তাঁর তিন বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছেন। পরবর্তী মহাসচিব মনোনীত করার পালা এখন ভুটানের; তারা এ বিষয়ে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতি পাওয়ার চেষ্টা করছে।

আফগানিস্তানের বিষয়টি একটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২০০৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৩তম শীর্ষ সম্মেলনে ভারতের প্রস্তাবের ভিত্তিতে আফগানিস্তান সার্কের সদস্য হয়। একই সম্মেলনে নেপালের উদ্যোগে চীনকে পর্যবেক্ষকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফিরে আসা আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তালেবান-নেতৃত্বাধীন সরকার ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্ক বারবার অবনতির দিকে গেছে, যা সার্কের (SAARC) ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

এখন পর্যন্ত সার্কের অন্য কোনো সদস্য রাষ্ট্র তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে মনে হয় না। ভারত আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রেখেছে এবং দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে, তবে তারা এখনো তালেবান প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি সার্কের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই স্থবিরতা কেবল শীর্ষ সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সার্ক কাঠামোর আওতায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও একে অপরের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেননি। নেপাল বারবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের আয়োজন করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

যদিও সার্কের শীর্ষ সম্মেলনগুলো অনুষ্ঠিত হয়নি, তবুও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সময় একে অপরের সঙ্গে বৈঠক করতেন। ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তাঁরা একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।

এর আগে, ২০১৮ সালে নিউইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার সভাপতিত্ব করেছিলেন নেপালের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রদীপ গাওয়ালি। তবে, পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি কথা বলার আগেই ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বৈঠক থেকে বেরিয়ে যান। ২০১৮ সালের সরাসরি বৈঠক এবং ২০২০ সালের ভার্চুয়াল বৈঠকের পর থেকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে সার্ক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের আর কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।

সার্কের সনদ অনুযায়ী, কেবল সব সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতির ভিত্তিতেই একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব।

শুধুমাত্র সমর্থনে সার্ক পুনরুজ্জীবিত  হবে না

নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের অধ্যাপক সঞ্জয় কে. ভরদ্বাজ বলেন, সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং সার্ক (SAARC) ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে কাজ করে। তিনি জানান, পাকিস্তানে আয়োজিত হতে যাওয়া শীর্ষ সম্মেলনে ভারত অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং তাদের সেই অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। আর সে কারণেই তারা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আসেনি এবং আমার মনে হয় না যে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার মতো অনুকূল পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “সার্ক একটি আঞ্চলিক ফোরাম এবং এ বিষয়ে ভারতের একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান রয়েছে। অন্যদিকে, এসসিও হলো একটি বৈশ্বিক বহুপক্ষীয় ফোরাম। এই দুটির প্রকৃতি ভিন্ন।”

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক চন্দ্রদেব ভট্ট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করার ব্যাপারে আগ্রহী বলে মনে হলেও, কেবল তাদের এই উৎসাহ দিয়ে অচলাবস্থা কাটানো সম্ভব নয়।

ভট্ট বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো ধরনের বোঝাপড়া ছাড়া সার্কের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। উভয় দেশই নীতিগতভাবে সার্ককে সমর্থন করার কথা বললেও, তাদের কর্মকাণ্ডে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।”

তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি দ্বিপাক্ষিক বিরোধগুলোকে পাশে সরিয়ে রেখে অভিন্ন আঞ্চলিক স্বার্থ অর্জনে মনোনিবেশ না করে বরং সেই বিরোধগুলো নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তবে আঞ্চলিক সহযোগিতা বজায় রাখা কঠিনই থেকে যাবে।

ভট্টের মতে, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ক্রমবর্ধমান আহ্বানগুলো আশাব্যঞ্জক; যদিও এর ফলে যারা এই অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করছে, তাদের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো চাপ পড়ার সম্ভাবনা কম। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই আহ্বানগুলো এমন পরিস্থিতি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে, যা এই সংগঠনটিকে পুনরায় সক্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয়।

কাঠমান্ডু পোস্ট