মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডর (বিসিইসি) আপাতদৃষ্টিতে একটি অবকাঠামোগত ও বাণিজ্যিক সংযোগ প্রকল্প। কিন্তু গভীরে গেলে এটি শুধু রাস্তা, রেল, বন্দর, পাইপলাইন বা শিল্পাঞ্চলের প্রশ্ন নয়, এটি বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে এশিয়ার নতুন ভূ-অর্থনৈতিক মানচিত্র নির্মাণের একটি ইঙ্গিত।
চীন
২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশ, মিয়ানমার
ও চীনকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক
করিডর প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য আঞ্চলিক
সংযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ গভীর
করা বলে জানানো হয়েছে।
এই প্রস্তাব এমন সময়ে এসেছে,
যখন চীন ইতিমধ্যে মিয়ানমারের
ভেতর দিয়ে ‘চায়না-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডর (সিএমইসি)’ এগিয়ে নিচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়া
ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ-রাজনীতিতে ভারত, চীন, বাংলাদেশ ও
মিয়ানমারের অবস্থান নতুনভাবে পুনর্বিন্যস্ত হচ্ছে।
প্রথম
প্রশ্ন হলো, অর্থনৈতিক করিডর
আসলে কী? চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরকে সরলভাবে বোঝা যায় চীনের
ইউনান প্রদেশ, মিয়ানমারের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চল এবং
বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দরব্যবস্থাকে যুক্ত
করার একটি সম্ভাব্য বহুমাত্রিক
সংযোগব্যবস্থা হিসেবে। এর মধ্যে থাকতে
পারে সড়ক, রেল, নদীপথ,
সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো,
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, লজিস্টিক হাব এবং ডিজিটাল
সংযোগ।
এর মূল ভিত্তি সম্ভবত
বিদ্যমান চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক
করিডর। সিএমইসি সাধারণত ইউনান থেকে মিয়ানমারের মান্দালয়
হয়ে রাখাইনের কিয়াউকফিউ বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ‘ইনভার্টেড ওয়াই-শেপড’ অবকাঠামো
করিডর হিসেবে বিবেচিত হয়। কিয়াউকফিউ গভীর
সমুদ্রবন্দর, পাইপলাইন ও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ
সংযোগ যদি বাংলাদেশের সঙ্গে
যুক্ত হয়, তাহলে বঙ্গোপসাগর
একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক বাণিজ্য অক্ষে পরিণত হতে পারে।
এই ধারণা একেবারে নতুন নয়। নব্বইয়ের
দশকের ‘কুনমিং ইনিশিয়েটিভ’ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার বা
বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডরের ধারণায় রূপ নেয়। সেই
করিডরে কলকাতা, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনের কুনমিংকে
যুক্ত করার কথা ছিল।
কিন্তু
ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েন,
সীমান্তবিরোধ, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)
নিয়ে ভারতের আপত্তি এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক
অস্থিতিশীলতা বিসিআইএমকে কার্যত স্থবির করে দেয়। নতুন
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরকে তাই বিসিআইএমের বিকল্প,
সংকুচিত বা পুনর্গঠিত রূপ
হিসেবেও দেখা যায়, যেখানে
ভারত আপাতত অনুপস্থিত; কিন্তু ভৌগোলিকভাবে প্রভাবিত পক্ষ হিসেবে থেকে
যাচ্ছে।
২.
এটি
কীভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে? সম্ভাব্যভাবে
তিনটি স্তরে। প্রথমত, চীন থেকে মিয়ানমার
পর্যন্ত বিদ্যমান ও পরিকল্পিত অবকাঠামোর
উন্নয়ন: ইউনান-মুসে-মান্দালয়-কিয়াউকফিউ
রুট, সড়ক ও রেল,
পাইপলাইন, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বন্দর।
দ্বিতীয়ত,
মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে
সংযোগ: রাখাইন-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-মাতারবাড়ী অঞ্চল, টেকনাফ বা স্থলপথ, অথবা
সমুদ্রভিত্তিক বন্দর–সংযোগ।
তৃতীয়ত,
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংযুক্তি: চট্টগ্রাম, মাতারবাড়ী, পায়রা, মোংলা, ঢাকা, সিলেট, উত্তরবঙ্গ এবং শিল্পাঞ্চলকে একটি
আঞ্চলিক সরবরাহ–শৃঙ্খলের অংশ করা। তবে
এখন পর্যন্ত পূর্ণ করিডরের আনুষ্ঠানিক দৈর্ঘ্য, নির্দিষ্ট রুট, অর্থায়ন কাঠামো
বা প্রকল্পের তালিকা স্পষ্ট নয়। বিদ্যমান সিএমইসি
প্রায় ১ হাজার ৭০০
কিলোমিটার দীর্ঘ বলে আলোচনায় এসেছে,
বাংলাদেশে সম্প্রসারণ হলে তা আরও
দীর্ঘ হবে, কিন্তু পূর্ণ
দৈর্ঘ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত
করা হয়নি।
এই করিডরে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হবে চীন, মিয়ানমার
ও বাংলাদেশ। কিন্তু পরোক্ষভাবে ভারত, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, আসিয়ান দেশগুলো; জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোও
এর ভূরাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকবে না। কারণ, বঙ্গোপসাগর
এখন শুধু একটি জলসীমা
নয়, এটি ভারত মহাসাগরীয়
নিরাপত্তা, জ্বালানি পরিবহন, সামুদ্রিক বাণিজ্য, ব্লু ইকোনমি, সাবমেরিন
কেব্ল, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা
এবং সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
চীনের
জন্য এই করিডর মালাক্কা
প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর
একটি সম্ভাব্য পথ, ইউনানসহ দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের স্থলবেষ্টিত প্রদেশগুলোর জন্য সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকার
এবং বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত উপস্থিতি বৃদ্ধির সুযোগ।
বাংলাদেশের
জন্য এটি হতে পারে
বাজার সম্প্রসারণ, ট্রানজিট আয়, শিল্পায়ন, রপ্তানি
বৈচিত্র্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার সঙ্গে বাস্তব সংযোগ তৈরির সুযোগ। মিয়ানমারের জন্য এটি অবকাঠামো,
বিনিয়োগ ও বন্দরভিত্তিক অর্থনীতির
সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে,
যদিও দেশটির গৃহযুদ্ধ ও সরকারের রাজনৈতিক
বৈধতার সংকট এই সম্ভাবনাকে
গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে।
কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে,
এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়। চীন
লাভবান হবে কৌশলগতভাবে; কারণ,
করিডর তাকে বঙ্গোপসাগরে আরও
কার্যকর প্রবেশাধিকার দেবে। বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে অর্থনৈতিকভাবে,
যদি প্রকল্পটি বাংলাদেশকেন্দ্রিক মূল্যসংযোজন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বন্দর ব্যবহারের
বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করে। মিয়ানমার
লাভবান হতে পারে যদি
করিডরটি তার জনগণের অর্থনৈতিক
অন্তর্ভুক্তি, সংঘাত-সংবেদনশীল উন্নয়ন এবং সীমান্ত অঞ্চলের
স্থিতিশীলতা বাড়ায়।
কিন্তু
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো,
যদি করিডরটি কেবল চীনা পণ্য,
চীনা ঋণ, চীনা ঠিকাদার
ও চীনা কৌশলগত সুবিধার
বাহন হয়ে দাঁড়ায়; তাহলে
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ভোক্তা,
ঋণগ্রহীতা ও ভূরাজনৈতিক করিডরে
পরিণত হবে। উৎপাদক, দর–কষাকষিকারী ও নীতিনির্ধারক নয়।
৩.
বাংলাদেশের
জন্য সম্ভাবনা বড়, কিন্তু শর্তসাপেক্ষ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বহু বছর ধরে
তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, কৃষি-শ্রম
ও অভ্যন্তরীণ ভোক্তা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। এলডিসি
উত্তরণ-পরবর্তী সময়, শুল্ক–সুবিধা
সংকোচন, রপ্তানি বৈচিত্র্যের প্রয়োজন, জ্বালানিঘাটতি, লজিস্টিক ব্যয় ও বৈদেশিক
মুদ্রার চাপ—এসব বাস্তবতায়
একটি কার্যকর আঞ্চলিক করিডর নতুন সুযোগ তৈরি
করতে পারে।
যদি
চট্টগ্রাম-মাতারবাড়ী অঞ্চলকে শুধু বন্দর নয়;
বরং শিল্প, লজিস্টিক, কোল্ড চেইন, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ,
হালকা প্রকৌশল, আইটি ও আঞ্চলিক
বাণিজ্যের হাবে রূপান্তর করা
যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু পণ্য চলাচলের
রাস্তা হবে না; উৎপাদন
ও মূল্যসংযোজনের কেন্দ্র হতে পারে। তবে
এর ভূরাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।
ভারত
এই করিডরকে শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প
হিসেবে দেখবে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, শিলিগুড়ি করিডর, বঙ্গোপসাগর, আন্দামান-নিকোবর এবং বাংলাদেশ-ভারত
সম্পর্কের নিরাপত্তা ইস্যু এই প্রকল্পকে সংবেদনশীল
করে তোলে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে
বিসিআইএম নিয়ে সতর্ক ছিল,
বিশেষত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ কাঠামোর
সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে।
ভারতীয়
নীতিনির্ধারক ও কৌশলগত মহলে
নতুন করিডরকে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক
করিডরের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরূপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে, অর্থাৎ
ভারতের পশ্চিমে সিপিইসি এবং পূর্বে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন সংযোগ। সাম্প্রতিক
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও এই তুলনা এসেছে।
যদিও সংবাদমাধ্যমের ভাষা অনেক সময়
উদ্বেগনির্ভর, তবু ভারতের কৌশলগত
অস্বস্তি বাস্তব।
৪.
বাংলাদেশের
কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখানেই। বাংলাদেশের উচিত হবে এই
করিডরকে ‘চীন বনাম ভারত’
প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে নয়;
বরং ‘বাংলাদেশকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সংযোগনীতি’ হিসেবে উপস্থাপন করা। ঢাকার অবস্থান
হওয়া উচিত: বাংলাদেশ কারও সামরিক বা
কৌশলগত প্রক্সি নয়; বাংলাদেশ সংযোগ
চায়, সংঘাত নয়; বাণিজ্য চায়,
ঘাঁটি নয়; বিনিয়োগ চায়,
নির্ভরতা নয়।
প্রতিবেশী
দেশগুলোকে বোঝাতে হবে যে করিডরের
উদ্দেশ্য সামরিক নয়, অর্থনৈতিক; একচেটিয়া
নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং কোনো দেশের
নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করে এটি এগোনো
উচিত নয়। প্রয়োজনে বাংলাদেশ
ভারত, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড ও আসিয়ানকে ভবিষ্যৎ
বাণিজ্য ও লজিস্টিক–কাঠামোর
সঙ্গে যুক্ত করার ধারণা তুলে
ধরতে পারে। চীনও বলেছে যে
ভবিষ্যতে অন্য দেশকে যুক্ত
করার সুযোগ থাকতে পারে।
সবচেয়ে
জটিল প্রশ্ন হলো, মিয়ানমার পরিস্থিতি।
মিয়ানমার এখনো গভীর রাজনৈতিক
অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, সামরিক শাসন, জাতিগত সংঘর্ষ ও মানবিক বিপর্যয়ের
মধ্যে আছে। ২০২১ সালের
সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ
নিয়ন্ত্রণ ভেঙে গেছে বহু
অঞ্চলে। সাম্প্রতিক সময়ে চীন মিয়ানমারের
সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে; মিয়ানমারের বর্তমান নেতৃত্বের চীন সফর, অবকাঠামো
প্রকল্প, বিরল খনিজ, সীমান্ত
স্থিতিশীলতা এবং কিয়াউকফিউ বন্দরের
মতো প্রকল্পগুলো চীনের কৌশলগত আগ্রহকে স্পষ্ট করে।
এমন
পরিস্থিতিতে মিয়ানমারভিত্তিক যেকোনো করিডরের নিরাপত্তা, বৈধতা, মানবাধিকার এবং স্থানীয় জনগণের
অংশগ্রহণের প্রশ্ন এড়াতে পারে না। রাখাইন
অঞ্চল দিয়ে কোনো সংযোগ
হলে রোহিঙ্গা সংকটকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়ন
করা রাজনৈতিকভাবে অদূরদর্শী হবে। উন্নয়ন যদি
বাস্তুচ্যুতি, সামরিকীকরণ বা স্থানীয় জনগণের
বঞ্চনা বাড়ায়, তাহলে করিডর স্থিতিশীলতার বদলে সংঘাত তৈরি
করবে।
ভূরাজনৈতিকভাবে
এই করিডর বঙ্গোপসাগরে চীনের উপস্থিতি বাড়াবে, এটি অস্বীকার করার
সুযোগ নেই। কিন্তু উপস্থিতি
মানেই সংঘাত নয়, আবার বিনিয়োগ
মানেই উন্নয়নও নয়। ফলাফল নির্ভর
করবে শাসনকাঠামো, চুক্তির স্বচ্ছতা, ঋণের শর্ত, পরিবেশ
মূল্যায়ন, স্থানীয় অংশগ্রহণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বহুপক্ষীয় ভারসাম্যের
ওপর।
বাংলাদেশের
জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক হবে অস্পষ্ট ঋণ,
অস্বচ্ছ চুক্তি, বিদেশি ঠিকাদারনির্ভর প্রকল্প, স্থানীয় শিল্পের সীমিত অংশগ্রহণ এবং বন্দর ব্যবহারে
কৌশলগত অস্পষ্টতা। সবচেয়ে লাভজনক হবে প্রকল্পভিত্তিক নয়,
নীতিভিত্তিক অংশগ্রহণ: কোন অবকাঠামো বাংলাদেশের
জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত? কোন প্রকল্প রপ্তানি
আয় বাড়াবে? কোনটি ঋণফাঁদ তৈরি করতে পারে?
কোনটি পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ? কোনটি স্থানীয় কর্মসংস্থান দেবে? কোনটি শুধু ট্রানজিট–সুবিধা
দিয়ে চলে যাবে?
প্রতিবেশী
দেশগুলোরও এ করিডরকে ঠান্ডা
মাথায় বিবেচনা করা উচিত। ভারতের
জন্য এটি শুধু নিরাপত্তা
হুমকি হিসেবে দেখলে ভুল হবে; বরং
এটি হতে পারে ভারতের
উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব
এশিয়ার বাজার সংযোগের নতুন বাস্তবতা বোঝার
সুযোগ।
নেপাল
ও ভুটানের জন্য বাংলাদেশের বন্দর
ব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। আসিয়ানের জন্য বাংলাদেশ দক্ষিণ
এশিয়ার প্রবেশদ্বার হতে পারে। জাপান,
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের জন্যও
এটি একটি সংকেত: যদি
তারা বঙ্গোপসাগরে ভারসাম্য, স্বচ্ছতা ও উন্নয়ন চায়,
তবে শুধু নিরাপত্তা ভাষায়
নয়; অবকাঠামো, বাণিজ্য, জ্বালানি, জলবায়ু ও মানবিক বিনিয়োগের
ভাষায় বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিতে হবে।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডরকে অন্ধ সমর্থন কিংবা
অন্ধ বিরোধিতার জায়গা থেকে দেখা উচিত
নয়। এটি সম্ভাবনা ও
ঝুঁকির যুগপৎ প্রকল্প। বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন
হওয়া উচিত: ‘আমরা কী অন্যের
করিডর হব, নাকি নিজেদের
ভূ-অর্থনৈতিক কেন্দ্র বানাব?’
৫.
বাংলাদেশ
কীভাবে ইতিবাচকভাবে এ সুযোগ কাজে
লাগাতে পারে?
প্রথমত,
একটি ‘জাতীয় করিডরনীতি’ দরকার, যেখানে চীন, ভারত, জাপান,
আসিয়ান, বিশ্বব্যাংক, এডিবি—সব বিনিয়োগ ও
সংযোগ উদ্যোগকে বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকারের অধীন রাখা হবে।
দ্বিতীয়ত,
প্রতিটি প্রকল্পে পূর্ণ স্বচ্ছতা, সংসদীয় নজরদারি, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব
মূল্যায়ন এবং ঋণ-টেকসইতার
হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
তৃতীয়ত,
বাংলাদেশকে শুধু অবকাঠামো নয়,
শিল্পনীতি যুক্ত করতে হবে; বিশেষ
অর্থনৈতিক অঞ্চল, দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় সরবরাহকারী, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি বাজার এবং বন্দরকেন্দ্রিক উৎপাদনকে
একসঙ্গে ভাবতে হবে।
চতুর্থত,
ভারতকে আস্থায় নিতে হবে। দিল্লিকে
বাদ দিয়ে নয়; বরং
দিল্লিকে বোঝাতে হবে—এই করিডর
দক্ষিণ এশিয়াকে বিভক্ত নয়, সংযুক্ত করতে
পারে। পঞ্চমত, মিয়ানমার প্রসঙ্গে বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, রাখাইনের স্থিতিশীলতা ও মানবিক নিরাপত্তাকে
করিডর আলোচনার বাইরে রাখতে পারবে না।
বাংলাদেশ
যদি স্বচ্ছ, ভারসাম্য, বহুপক্ষীয়তা, ঋণসতর্কতা, স্থানীয় শিল্পায়ন এবং কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা
বজায় রাখতে পারে, তবে এই করিডর
বঙ্গোপসাগরীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু
যদি এটি কেবল বৃহৎ
শক্তির প্রতিযোগিতার সড়ক হয়ে দাঁড়ায়,
তবে বাংলাদেশ লাভের চেয়ে চাপ বেশি
পাবে।
তাই
সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ হলো চীনের
সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে কৌশলগত আস্থা, মিয়ানমারের ক্ষেত্রে মানবিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতা
এবং বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়নের স্বার্থ—এই চারটি স্তম্ভের
ওপর দাঁড়িয়ে করিডরকে দেখা।
করিডরের
সফলতা শেষ পর্যন্ত রাস্তার
দৈর্ঘ্যে নয়, রাষ্ট্রের দূরদর্শিতায়
নির্ধারিত হবে।
লেখক ইউনিভার্সিটি
অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই-এ আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিভাগের অধ্যাপক।
প্রথম আলো