বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সে সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে অতিমাত্রায় সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় আসার পর এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। অতীতে ঢাকায় কর্মরত কোনো কূটনীতিককে এমন দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যায়নি।

গত দুই মাসে দীনেশ ত্রিবেদী একের পর এক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংসদের স্পিকার, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, অর্থসহ অন্তত ২৮ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে তিনি ভারতীয় প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু, দুদেশের মধ্যে মৈত্রী এক্সপ্রেস পুনরায় চালু, দুদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ ও সফর বিনিময় পুনরায় শুরু, বাংলাদেশি আমলাদের প্রশিক্ষণের জন্য আবার দিল্লিতে পাঠানো, বাংলাদেশ-ভারত সংসদীয় ককার্স গঠনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর ইস্যুটি। দীনেশ ত্রিবেদী তার দেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিল্লি নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীসহ অন্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকে প্রস্তাবিত এ সফরের গুরুত্ব বারবার তুলে ধরে ভারতীয় দূত বলেছেন, তারেক রহমানের জন্য অপেক্ষায় আছে দিল্লি। দুই প্রধানমন্ত্রী একত্রে বসলে অনেক কিছুরই সমাধান হয়ে যাবে।

ত্রিবেদী যেসব ইস্যুতে জোর দিয়েছেন, সেগুলো ভারতের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈঠকগুলোতে হাতেগোনা দু-একজন মন্ত্রী ও উপদেষ্টা বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে জোরালো অবস্থান নিলেও অধিকাংশ মন্ত্রী-উপদেষ্টাকে তেমন কোনো শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি।

এদিকে ভারতীয় হাইকমিশনারের বিরতিহীন তৎপরতা এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বিষয়ে আমার দেশ-এর প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আমার প্রধানমন্ত্রী একটি দায়িত্ব দিয়ে এখানে পাঠিয়েছেন। সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়াই আমার কাজ। আমি শতভাগ নিশ্চিত, দুদেশের জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পর্কের একটি সোনালি অধ্যায় শুরু হবে।

উল্লেখ্য, দীনেশ ত্রিবেদী গত ১২ জুন কলকাতা থেকে সড়কপথে ঢাকা আসেন। ২৫ জুন তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয়পত্র পেশের মাধ্যমে ঢাকায় তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রেওয়াজ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনাররা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের প্রথম সৌজন্য বৈঠক করে থাকেন। এ জন্য দীনেশ ত্রিবেদীকে এক মাসেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়।

২৯ জুলাই দীনেশ ত্রিবেদী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথম বৈঠকে বসেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে। বৈঠকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরও উপস্থিত ছিলেন। একই দিনে তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গেও বৈঠক করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় দূতের প্রথম বৈঠকটি সৌজন্যমূলক হলেও বৈঠকে ঢাকা-দিল্লি ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, দুদেশই একমত যে, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন এক যাত্রা শুরু করতে হবে। তবে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশকিছু অস্বস্তির জায়গাও রয়েছে। এগুলো দূর হওয়া জরুরি। তিনি স্পষ্ট জানান, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্বার্থের ভিত্তিতে।

বৈঠকের পর ভারতীয় হাইকমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, দুদেশের জনগণ যা চায়, জনগণের জন্য যেটা ভালো, আমি সেটাই করব। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, এমন কোনো ইস্যু নেই, যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যাবে না। আমি মনে করি, দুই প্রধানমন্ত্রী একত্রে বসলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

গত ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। সাক্ষাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখতে পারেনÑগণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ খবরটি আলোচনায় গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।

হুমায়ুন কবীর ত্রিবেদীকে জানান, পলাতক হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেউ যেন ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারেÑদিল্লিকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এ ধরনের কার্যক্রম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ভারতীয় হাইকমিশনার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় খোঁজ-খবর নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেন।

গত ৬ আগস্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। বৈঠক সম্পর্কে ভারতীয় হাইকমিশনের এক বার্তায় বলা হয়, আলোচনায় ভারত-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংযোগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠকে পাইপলাইনের মাধ্যমে আরো বেশি জ্বালানি সরবরাহের জন্য ভারতকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানান বিদ্যুৎমন্ত্রী।

গত ৯ আগস্ট সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে আবারও বৈঠকে বসেন দীনেশ ত্রিবেদী। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের এক দিন আগে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা গুরুত্বপূর্ণ ওই বৈঠক সম্পর্কে তখন কোনো পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মন্তব্য করা হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যাবতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয় বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়।

বাংলাদেশের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দিল্লিতে হাসিনাকে ৫ আগস্ট প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগদানে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়। ঢাকার তরফে জানানো হয় কড়া প্রতিক্রিয়া।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার সচিবালয়ের দপ্তরে সাক্ষাৎ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। সাক্ষাতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন ভারতীয় দূত। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তার পরিবারসহ দিল্লিতে একটি ‘গ্র্যান্ড ভিজিট’, অর্থাৎ একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় সফরের অনুরোধ জানান। এ ব্যাপারে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের জন্য একটি অনুকূল ও সহায়ক পরিবেশ জরুরি। আর এ পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব ভারতের। আনুষ্ঠানিক আলোচনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে একান্তে কথা বলেন দীনেশ ত্রিবেদী।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বেরিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে। বৈঠকে সমতা ও আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য অপরাধীকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানান।

অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেন দীনেশ ত্রিবেদী। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ভারতীয় দূত বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমরা খুব সম্মান করি। তার সঙ্গে কথা বলে ভালো লেগেছে এবং সবকিছুই ইতিবাচক আছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন জনবান্ধব ব্যক্তি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও জনবান্ধব। আমি মনে করি দুই নেতা একসঙ্গে বসলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সমস্যার সমাধান তো তখনই হয়, যখন উভয় পক্ষ কথাবার্তা বলে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ওইদিন রাতেই দিল্লি ছুটে যান দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি ১১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফ করেন।

দিল্লি থেকে ফিরে আবারও তৎপর হন ভারতীয় হাইকমিশনার। গত ২০ আগস্ট তিনি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেন। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে থেমে থাকা ভারতীয় প্রকল্পগুলো চালুর ওপর বিশেষ জোর দেন ত্রিবেদী।

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে ভারতীয় হাইকমিশনের এক বার্তায় বলা হয়, হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন। বার্তায় আরো বলা হয়, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গত ২৪ আগস্ট সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেন দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বন্ধ থাকা সীমান্ত হাটগুলো পুনরায় চালু, স্থলবন্দরগুলো কার্যকর করা ও স্থলপথে সুতা আমদানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, দুদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষ উন্নয়ন ও অগ্রগতি চায়। নতুন প্রজন্মের জন্য উভয় দেশকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

ভারতীয় দূত আরো বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ কেউ ছোট বা কেউ বড় নয়—দুদেশই সমান। সমতার ভিত্তিতে আমি সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চাই। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে যৌথ বিনিয়োগে দিল্লির আগ্রহের কথা জানান তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল তিতুমীরের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো জোরদারের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

গত ১ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মইন খান এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ভারতীয় হাইকমিশনার হাসিনা প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেন, আমি রাজনীতি নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না। এ ব্যাপারে আমাদের কথা বলা উচিতও না। ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত দুদেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক। তিনি বলেন, আমাদের অতীতে আটকে থাকার কোনো সুযোগ নেই। অতীতে আটকে থাকলে উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।

গত ২ সেপ্টেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনার আলাদাভাবে বৈঠক করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সঙ্গে। এসব বৈঠকে দীনেশ ত্রিবেদী ভারত ও বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ গঠনের প্রস্তাব দেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, আমাদের থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই, আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। পদ্মা ও গঙ্গা প্রবাহের মতো আমাদের আলোচনাও চলতে থাকবে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় চিফ হুইপ বলেন, গত ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। এ দেশের মানুষের মানবাধিকার বলতে কিছুই ছিল না। ভারত একবারও এসব ইস্যুতে কথা বলেনি। সে দুঃখ আমাদের আছে এবং অনেক দিন ধরে থাকবে। তিনি আরো বলেন, আমরা বলি ভারত আমাদের বন্ধু, ভারতও বলে আমরা তাদের বন্ধু। কিন্তু সীমান্তে তারা আমাদের জন্য বেড়া দিয়েছে। বিএসএফের হাতে নিরীহ বাংলাদেশি নিহত হচ্ছে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের সঙ্গে বৈঠকে বসেন দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, সমসাময়িক বিশ্বে ধর্মীয় চরমপন্থা, অসহিষ্ণুতা ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সাংস্কৃতিক জাগরণ। বৈঠকে দীনেশ ত্রিবেদী দুদেশের তরুণ প্রতিভাবানদের জন্য যৌথ প্রশিক্ষণ, আবাসিক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম চালুর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, এসব কার্যক্রম চালু হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরো জোরদার হবে।

গত ৭ সেপ্টেম্বর দীনেশ ত্রিবেদী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহর সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করেন।

জনপ্রশাসন উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে ভারতীয় দূত প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশি আমলাদের ভারতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, দুদেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি গড়ে তোলা জরুরি। উভয় দেশের জনপ্রশাসনের মধ্যে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি পুনরায় চালু হওয়া জরুরি। বৈঠকে ইসমাইল জবিউল্লাহ সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পাশাপাশি গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতের আহ্বান জানান।

গত ৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। এ সময় তিনি ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন ইতিহাস, ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক বন্ধন এবং দুদেশের জনগণের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা গভীর বন্ধনের কথা তুলে ধরেন।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই সার্বভৌম রাষ্ট্রের পারস্পরিক কল্যাণের জন্য দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে আরো জোরদার করতে হবে। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের পর ওইদিনই ভারতীয় দূত বৈঠক করেন সড়ক পরিবহন এবং সেতু, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে। বৈঠকে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে গঠনমূলকভাবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভারত অত্যন্ত আগ্রহী ও আন্তরিক। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, আমাদের কানেক্টিভিটি বাড়াতে হবে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌ-যোগাযোগ আরো শক্তিশালী করা জরুরি। তিনি বলেন, মৈত্রী এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর বিষয়ে আমরা ইতিবাচক আলোচনা করেছি। ধৈর্য ধরুন, এ ব্যাপারে ইতিবাচক খবর পাবেন।

৯ সেপ্টেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনার বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামসুল ইসলামের সঙ্গে। ঢাকা সেনানিবাসে উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের গভীর সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্কের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর পেশাগত মানোন্নয়নে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সামরিক কর্মকর্তাদের পারস্পরিক অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ বিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুদেশ একসঙ্গে কাজ করবে।

১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় হাইকমিশনার আলাদাভাবে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ও প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক সম্পর্কে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দুদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সম্মিলিত সংস্কৃতি ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতবিনিময় করে উভয় পক্ষ। তারা দুদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তথ্য উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশন জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিস্তৃত বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। গণতান্ত্রিক দুটি দেশ জনগণের মধ্যে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে আগামী দিনগুলোতে যৌথভাবে কাজ করে যাবে।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর বেসরকারি বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে বৈঠক করেন হাইকমিশনার। এ সময় ভারতীয় দূত বাংলাদেশের অ্যাভিয়েশন খাতের উন্নয়নে ভারতের কাজ করার আগ্রহের কথা জানিয়ে বলেন, ভারতের নিজস্বভাবে তৈরি ছোট রানওয়েতে উড্ডয়ন ও অবতরণে সক্ষম উড়োজাহাজ বাংলাদেশের বিভিন্ন এয়ারস্ট্রিপে ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বৈঠকে বিমানমন্ত্রী জানান, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অ্যাভিয়েশন হাব হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে দিল্লির সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হবে।

পরদিন ১৭ সেপ্টেম্বর দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে মাহদী আমিন বলেন, ভারতে অবস্থানরত দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা যেন বাংলাদেশে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে ব্যাপারে দিল্লিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বৈঠকে বাংলাদেশ এবং ভারতের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মূল্যবোধ আরো সুসংহত করার গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে দুদেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।

সবশেষ গত ৩০ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতীয় দূত দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জ থাকবেÑএটাই স্বাভাবিক। তবে সবকিছুই সঠিক পথে আছে। সময়মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে যাবেন, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।

এ সময় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে অব্যাহত বৈঠক, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বিষয়ে আমার দেশ-এর প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, আমার প্রধানমন্ত্রী এখানে আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। আমার কাজ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া। আমি শতভাগ আশাবাদী, দুদেশের জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী একটি সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হবে। গণতন্ত্রের অর্থই হলো সবকিছু জনগণের জন্যই। দুদেশের জনগণের জন্য যেটা ভালো, আমি সে কাজটিই করছি।

সূত্র: আমার দেশ