গত ২১ অক্টোবর পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার এবং ইন্দোনেশিয়া ‘বদর চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে, যা একটি চতুর্পাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামো। দোহায় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, এই চুক্তির লক্ষ্য হলো স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, যৌথ গবেষণা ও উন্নয়ন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে আরও গভীর করা।
এই চুক্তির মাধ্যমে চারটি দেশের প্রতিরক্ষা খাতের পারস্পরিক পরিপূরক শক্তিগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিগত
সমন্বয় এবং যৌথ উৎপাদনের
পথ প্রশস্ত হবে বলে আশা
করা হচ্ছে।
এই চুক্তিটি পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন। গত এক বছরে
ইসলামাবাদ পশ্চিম এশিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের
বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে একাধিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
২০২৫
সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সৌদি আরবের সঙ্গে
‘কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষর করে, যার আওতায়
এক পক্ষের ওপর আগ্রাসনকে অন্য
পক্ষের ওপর আগ্রাসন হিসেবে
গণ্য করা হবে। ২০২৬
সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান, তুরস্ক
ও সৌদি আরব ‘মক্কা
যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’স্বাক্ষর করে, যাতে সুস্পষ্টভাবে
সম্মিলিত প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। একই মাসে পাকিস্তান
কুয়েতের সঙ্গে একটি প্রোটোকল চুক্তি
স্বাক্ষর করে, যা উভয়
দেশের মধ্যে প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য
ক্ষেত্রে সামরিক সহযোগিতাকে সম্প্রসারিত করেছে।
‘বদর
চুক্তি’র মাধ্যমে এখন
তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে
একটি বহুপাক্ষিক শিল্প সহযোগিতা কাঠামো যুক্ত হলো।
এই চুক্তিগুলোতে পাকিস্তানের অংশগ্রহণের পেছনে তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত কারণ রয়েছে, যা
প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের বর্তমান কৌশলগত গতিপথকে তুলে ধরে।
প্রথমত,
পশ্চিম এশিয়ায় দ্রুত পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে, গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সম্পৃক্ততাকে এই চুক্তিগুলো প্রতিফলিত
করে। উল্লেখ্য, গত বছর ভারতের
সঙ্গে সংঘর্ষের সময় পাকিস্তানের সামরিক
সক্ষমতা তাদের প্রথাগত সামরিক শক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রমাণ করেছে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে
তাদের কৌশলগত গ্রহণযোগ্যতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করেছে। একই সঙ্গে, ইরান
ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ ও
দৃশ্যমান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। এমন
এক সময়ে যখন অন্যান্য
অনেক পক্ষ নিজেদের জোটবদ্ধতার
সীমাবদ্ধতায় আটকা পড়েছিল, তখন
পাকিস্তান যোগাযোগ চ্যানেলগুলো সচল রাখতে সহায়তা
করেছে।
বলা
যায়, এই ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানকে
একটি কার্যকর ‘মধ্য শক্তি’হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী
ক্ষমতার বলয়ের সঙ্গেও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত হতে সক্ষম। পশ্চিম
এশিয়ার মতো একটি অস্থির
অঞ্চলে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে
প্রথাগত নিরাপত্তা বলয়গুলোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই
পরিস্থিতিতে, পাকিস্তান—যে দেশটি বিভিন্ন
পক্ষের সাথেই কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে—তার সাথে সম্পর্ক
গভীর করার গুরুত্ব অনেক
দেশই উপলব্ধি করছে।
দ্বিতীয়ত,
পাকিস্তান দীর্ঘকাল ধরে যৌথ প্রতিরক্ষা
উৎপাদন এবং নিজস্ব প্রতিরক্ষা
শিল্পে বিনিয়োগের ধারণাটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যাতে
নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব কেবল অস্ত্র কেনা-বেচার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই
দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানকে নানাভাবে উপকৃত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের সাথে সহযোগিতার ফলে
জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি
এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প সক্ষমতার মতো উল্লেখযোগ্য সাফল্য
অর্জিত হয়েছে। একইভাবে, তুরস্কের সাথে সম্পর্ক নৌ-জাহাজ নির্মাণসহ অন্যান্য প্রযুক্তি ও উৎপাদনমূলক উদ্যোগের
দিকে প্রসারিত হয়েছে।
‘ডন’
পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা
যায়, পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত প্রতিটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতেই যৌথ প্রতিরক্ষা উৎপাদন
এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। এতে উল্লেখ করা
হয়েছে, “প্রতিটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে এই শর্তটি অন্তর্ভুক্ত
থাকার অর্থ হলো, পাকিস্তান
দীর্ঘমেয়াদে এমন একটি কৌশলগত
লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে
তারা কেবল ক্রেতা-বিক্রেতা
সম্পর্কের পরিবর্তে আঞ্চলিক নির্ভরযোগ্য অংশীদারদের সাথে যৌথ উৎপাদনের
অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়।”
এর মূল তাৎপর্য হলো,
এই ধরনের সুযোগ পাকিস্তানকে তার প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন
ত্বরান্বিত করতে এবং প্রতিকূল
ভূ-রাজনৈতিক পরিবেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রথাগত
প্রতিরোধ ব্যবস্থা বজায় রাখতে সহায়তা
করতে পারে।
তৃতীয়ত,
পাকিস্তান একটি অধিকতর প্রতিযোগিতামূলক
প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার লক্ষ্যে
কাজ করছে, যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে
অস্ত্র রপ্তানিতে সক্ষম এবং আন্তর্জাতিক বাজারের
বড় খেলোয়াড়দের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে
পারে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চলের
দেশগুলোর সাথে অস্ত্র রপ্তানি
নিয়ে আলোচনা ও চুক্তির খবর
উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর
মধ্যে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান
ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার মতো বড় ধরনের
প্রতিরক্ষা প্যাকেজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাছাড়া, পাকিস্তান
দীর্ঘকাল ধরেই আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে।
এসব প্রদর্শনীতে তারা নিজেদের দেশে তৈরি সরঞ্জামের পাশাপাশি চীনের মতো অংশীদারদের সাথে
যৌথভাবে উৎপাদিত সরঞ্জামও তুলে ধরেছে। এই প্রেক্ষাপটে, নতুন চুক্তিগুলো পাকিস্তানকে
অস্ত্র রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ করে দিচ্ছে; একই সাথে এটি এই খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণ
করতে এবং পাকিস্তানি পণ্যগুলোর প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। বলা যেতে
পারে যে, সময়ের সাথে সাথে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো পাকিস্তানের স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা
আরও বিকাশে সহায়ক হতে পারে। এর ফলে শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় অর্জন এবং কার্যক্ষেত্রে
স্বনির্ভরতা অর্জনের মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হবে।
সামগ্রিকভাবে,
‘বদর’ চুক্তি এবং পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অন্যান্য প্রতিরক্ষা
চুক্তিগুলো পশ্চিম এশিয়ায় উদীয়মান নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকেই
প্রতিফলিত করে। এসব কাঠামোর মাধ্যমে পাকিস্তান কেবল সামরিক প্রশিক্ষণ, কৌশলগত দক্ষতা
এবং যৌথ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে তার অংশীদারদের নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে তা-ই নয়,
বরং এর পাশাপাশি তারা বিদেশি বিনিয়োগ লাভ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে
স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেও উপকৃত হবে।
এখন দেখার বিষয়
হলো, পাকিস্তান কীভাবে এই নতুন সুযোগগুলোকে কাজে লাগায় এবং একই সাথে ক্রমবর্ধমান দায়বদ্ধতার
তালিকা থেকে উদ্ভূত সীমাবদ্ধতাগুলোকে কীভাবে সামাল দেয়।
দ্য ডিপ্লোম্যাট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ