ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সপ্তাহান্তে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নয়াদিল্লিতে সমবেত হন। বিরোধীদের অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমারের তত্ত্বাবধানে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় কারচুপি করা হয়েছে, যা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নির্বাচনী সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে সরকারের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে কেবল তাদেরই বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের সেখানে থাকার কথা নয়।

১০ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তা বাহিনী প্রায় ৭ হাজার মানুষকে আটক করে। এছাড়া কর্তৃপক্ষ মেট্রো স্টেশনগুলো বন্ধ করে দেয় এবং মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। গ্রীষ্মকালে ভারতের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে হওয়া ব্যাপক বিক্ষোভের পরপরই এই নতুন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ১২ বছরের শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘস্থায়ী গণ-আন্দোলনে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

দেশের বড় বড় শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ সহসাই থেমে যাবে বলে মনে হয় না। তবে এই আন্দোলনকে সঠিক প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন।

যদিও এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন, কিন্তু ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশে একে পুরোপুরি জাতীয় পর্যায়ের গণ-আন্দোলন বলা যায় না। ২০১২ ও ২০১৩ সালে যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং ২০১১ সালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এর চেয়েও বেশি মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন—আর সেই ঘটনাগুলো ঘটেছিল মোদীর পূর্বসূরি, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের শাসনামলে।

ভারতের বর্তমান বিক্ষোভের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় সরকার পতনের গণ-আন্দোলনগুলোর একটি বড় পার্থক্য রয়েছে: মোদী সরকার এখনো বেশ জনপ্রিয়। যদিও অনেক ভারতীয়—বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম—কুশাসন ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন, তবুও জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখনো মোদীকে সমর্থন করে।

তবে, চলমান এই বিক্ষোভকে মোদী সরকার কেবল উপেক্ষা করে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যাওয়ার আশা করতে পারে না। প্রথমত, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বেশ ভালো গতিবেগ রয়েছে। এদের অনেকেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র  সঙ্গে যুক্ত—যারা জুলাই মাসে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হওয়া আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল। সেটি ছিল মোদী সরকারের বিক্ষোভকারীদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করার একটি বিরল ঘটনা। এটি বিক্ষোভকারীদের আরও উজ্জীবিত করেছে, যারা বিশ্বাস করে যে এবারও তারা সফল হতে পারবে। বিক্ষোভ দমনে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ সম্ভবত তাদের পিছু হটার পরিবর্তে আরও দৃঢ়ভাবে আন্দোলনে টিকে থাকতে উৎসাহিত করবে। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার ব্যক্তিরা—যার মধ্যে সপ্তাহান্তে আটক হওয়া ‘ককরোচ’ আন্দোলনের নেতারাও রয়েছেন—তারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

বিক্ষোভকারীদের দৃষ্টিতে, এখানে অনেক কিছু ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাদের ভাষ্যমতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি (১৩০ মিলিয়ন) নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির বিরোধী ভোটগুলো—বিশেষ করে ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়ের ভোট—তালিকা থেকে মুছে যাওয়ায় বিজেপিই লাভবান হবে। এই পরিবর্তনগুলো এমন এক গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী মুহূর্তে এসেছে, যখন ২০২৭ সালে সাতটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এই রাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এবং নির্বাচনী দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য উত্তর প্রদেশ; পাশাপাশি রয়েছে গোয়া, উত্তরাখণ্ড, পাঞ্জাব, মণিপুর, হিমাচল প্রদেশ এবং মোদির নিজ রাজ্য গুজরাট। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের মোট ভোটার সংখ্যার তথ্য অনুযায়ী, এই রাজ্যগুলোর ভোটার সংখ্যা ভারতের মোট ভোটার তালিকার প্রায় ৩০ শতাংশ।

নয়াদিল্লির সামনে এখন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার চ্যালেঞ্জ। বিক্ষোভকারীদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করলে তারা আরও বেশি কিছু দাবি করার সাহস পেতে পারে। আবার মোদি সরকার যদি তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে বিক্ষোভকারীরা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে পারে—যার ফলে আন্দোলনটি আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।

ভোটার তালিকা নিয়ে চলমান এই বিক্ষোভ সরকারের ক্ষমতার ওপর সরাসরি কোনো হুমকি সৃষ্টি করছে না। তবে যদি এই আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে মোদিকে তার ক্ষমতা সুসংহত রাখার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এর শুরুটা হতে পারে জোটসঙ্গীদের আশ্বস্ত করার মাধ্যমে, যারা রাজপথের এই চাপের কারণে অস্বস্তিতে রয়েছেন।

ফরেন পলিসি, ইংরেজি থেকে অনুবাদ