আধুনিক অস্ত্র পরীক্ষা বা বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। কারণ এর জন্য কোনো দেশকে তার সামরিক বাহিনীকে যুদ্ধে পাঠাতে হয়। তবে চীনের ৪.৫-প্রজন্মের জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে বিদেশে রপ্তানির জন্য একটি ভিন্ন পথ খুলে গেছে।
২০২৫
সালের মে মাসে ভারতের
সাথে চার দিনের সংঘাতের
সময় পাকিস্তান এই বিমানটির প্রথম
বড় ধরনের যুদ্ধ-পরীক্ষার সুযোগ করে দেয়। সে
সময় আকাশপথে লড়াইয়ে ইসলামাবাদ জে-১০সিই বিমানগুলো
ব্যবহার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে
জানিয়েছেন যে, এতে অন্তত
দুটি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত হয়—যার মধ্যে
ফ্রান্সের তৈরি রাফাল বিমানও
ছিল। অবশ্য ভারতের ঠিক কী পরিমাণ
ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, কী অস্ত্র ব্যবহৃত
হয়েছিল এবং পরিস্থিতি কী
ছিল—তা নিয়ে বিতর্ক
রয়েছে।
যুদ্ধের
ময়দানে এই কার্যকারিতা প্রমাণের
বিষয়টি বিমানটির রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিদেশে এর
আরও ব্যাপক উপস্থিতির পথ প্রশস্ত করেছে।
রপ্তানি
চুক্তিগুলো বাস্তবায়িত হওয়ার সাথে সাথে, প্রতিটি
নতুন ব্যবহারকারী দেশ বিমানটিকে এমন
সব ভিন্ন জলবায়ু, ঘাঁটি বা পরিচালনার পরিবেশ,
যুদ্ধকৌশল এবং সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের
মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতিতে নিয়ে যাবে—যা
মূলত পূর্ব এশিয়ার পরিবেশের জন্য তৈরি এই
বিমানটির জন্য সম্পূর্ণ নতুন।
ফলে, নিজস্ব সামরিক বাহিনী মোতায়েন না করেই চীন
বিমানটির কার্যকারিতা সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান ও গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা
অর্জনের সুযোগ পাবে।
এই যুদ্ধবিমানটির বৈদেশিক পরিধি ইতিমধ্যেই বিস্তৃত হচ্ছে। উজবেকিস্তান এর দ্বিতীয় নিশ্চিত
গন্তব্য; এর মাধ্যমে মধ্য এশিয়ার একটি
বিমানবাহিনীতে জে-১০সিই যুক্ত
হচ্ছে, যারা এতদিন মূলত
সোভিয়েত-নকশার বিমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
পাশাপাশি, বাংলাদেশও এটি কেনার পরিকল্পনা
নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সরকারি
অনুমোদনের জন্য একটি খসড়া
প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
চীনের
নিজস্ব বিমানবাহিনীর জন্য একটি আধুনিক
যুদ্ধবিমান তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে যার যাত্রা শুরু
হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে
অল্প সংখ্যক কিন্তু ক্রমবর্ধমান বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য একটি উন্নতমানের
বিকল্প হয়ে উঠছে।
জে-১০সিই-এর উৎস চীনের
জে-১০ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে
নিহিত, যার সূচনা হয়েছিল
১৯৮০-র দশকের শেষের
দিকে। বিমানটি তৈরি করে চেংদু
এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন (সিএসি), যা রাষ্ট্রায়ত্ত বিশাল
অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠান ‘এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন অফ চায়না’র
(এভিআইসি) অংশ। ১৯৯৮ সালে
এর প্রথম উড্ডয়ন করে। শুরুর দিকের জে-১০এ মডেলগুলোতে
রাশিয়ার তৈরি এএল-৩১এফএন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হতো। তবে
পরবর্তী সংস্করণগুলোতে বিমানটির সেন্সর, এভিওনিক্স, অস্ত্র এবং প্রপালশন বা
চালিকাশক্তি পর্যায়ক্রমে উন্নত করা হয়েছে।
জে-১০বি মডেলে নতুন
নকশার এয়ার ইনটেক (বায়ু
প্রবেশের পথ), ইনফ্রারেড সার্চ-অ্যান্ড-ট্র্যাক সেন্সর এবং উন্নত এভিওনিক্স
ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে
জে-১০সি মডেলে দেশীয়
প্রযুক্তিতে তৈরি 'অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিকলি স্ক্যানড অ্যারে' (এইএসএ) রাডার, উন্নত নেটওয়ার্কিং ও ইলেকট্রনিক সিস্টেম,
অত্যাধুনিক পিএল-১০ ও পিএল-১৫ আকাশ-থেকে-আকাশে
নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং সবশেষে চীনের
নিজস্ব ডব্লিউএস-১০বি ইঞ্জিন যুক্ত করা হয়।
এই সংযোজনগুলোই জে-১০সিই-এর
ভিত্তি তৈরি করে, যা
ছিল মূলত রপ্তানির উদ্দেশ্যে
বিশেষভাবে নকশা করা জে-১০ সিরিজের প্রথম
সংস্করণ।
এভিআইসি-এর চেংদু এয়ারক্রাফট
ডিজাইন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান আর্কিট্যাক্ট লি জুন জানিয়েছেন যে,
ঐচ্ছিক 'পেলোড প্যাকেজ' বা অস্ত্র ও
সরঞ্জামের বিন্যাস ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিচালন পরিবেশ ও অভিযানের প্রয়োজন
অনুযায়ী এই যুদ্ধবিমানটিকে কাস্টমাইজ
বা বিশেষায়িত করা সম্ভব।
এই নমনীয়তা বা অভিযোজনযোগ্যতার সুবিধাটি
বিমানটির সামগ্রিক সহায়তা প্যাকেজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চীন এই যুদ্ধবিমানের
সাথে নিজস্ব অস্ত্রশস্ত্র, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তাও
প্রদান করে। এছাড়া দেশীয়ভাবে
উৎপাদিত ডব্লিউএস-১০বি ইঞ্জিন ব্যবহারের ফলে একটি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের জন্য রাশিয়ার সরবরাহকারীদের
ওপর নির্ভরতাও কমেছে।
২০২২
সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান জে-১০সিই-এর প্রথম বিদেশি
ব্যবহারকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তারা তাদের
বিমানবহরে এটি যুক্ত করে,
যা আগে থেকেই মূলত
চীনের সাথে যৌথভাবে তৈরি
হালকা ও কম খরচের
জেএফ-১৭ বিমানের ওপর ভিত্তি করে
গড়ে উঠেছিল।
ভারত
'রাফাল' যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার ফলে আঞ্চলিক
আকাশ-শক্তির ভারসাম্যে যে পরিবর্তন এসেছিল,
তার জবাবে পাকিস্তান এই বিমানগুলো সংগ্রহ
করেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন যে,
জে-১০সিই উপমহাদেশের "নিরাপত্তা ভারসাম্যহীনতা" দূর করতে সহায়তা
করবে।
পেন্টাগনের
তথ্যমতে, পাকিস্তান ৩৬টি জে-১০সিই
বিমানের অর্ডার দিয়েছিল এবং ২০২৫ সালের
মে মাসের মধ্যে ২০টি বিমান সরবরাহ
করা হয়। 'ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট
ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ' এই সরবরাহ প্রক্রিয়াকে
চীনা যুদ্ধবিমান রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি "যুগান্তকারী পরিবর্তন" হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এটি পুরোনো
নকশার বিমান—যা পশ্চিমা বা
রুশ বিমানের তুলনায় খুব একটা সুবিধাজনক
অবস্থানে ছিল না—সেখান
থেকে সরে এসে অত্যাধুনিক
সেন্সর ও অস্ত্রে সজ্জিত
একটি আধুনিক যুদ্ধবিমানের দিকে চীনের অগ্রযাত্রাকে
নির্দেশ করে।
'রয়্যাল
ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট'-এর জন্য ২০২০
সালে করা এক মূল্যায়নে
আকাশ-শক্তি বিশেষজ্ঞ জাস্টিন ব্রঙ্ক জে-১০-কে
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ এবং
সুইডেনের 'গ্রিপেন'-এর "মোটামুটি সমতুল্য" বলে উল্লেখ করেছিলেন।
তিনি জানান, এটি অধিকাংশ এক-ইঞ্জিনবিশিষ্ট যুদ্ধবিমানের সমকক্ষ হলেও কেনার ক্ষেত্রে
এটি "উল্লেখযোগ্য রকম" সস্তা। যদিও ব্রঙ্ক উল্লেখ
করেছেন যে বড় আকারের
দুই-ইঞ্জিনবিশিষ্ট জেটের তুলনায় এর পাল্লা ও
উচ্চ উচ্চতায় কার্যক্ষমতা কিছুটা কম, তবুও এটি
সস্তা হওয়ায় এমন সব
দেশের কাছে আকর্ষণীয় হতে
পারে যারা পশ্চিমা সরবরাহকারীদের
সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই কার্যকর যুদ্ধবিমান পেতে চায়।
তবে এই যুদ্ধবিমাটির
আকর্ষণ কেবল এর দামের ওপর নির্ভর করছে না। এর রাডার লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ করতে
সক্ষম; পাশাপাশি ডেটা লিঙ্কের মাধ্যমে এটি অন্যান্য বিমান ও সহায়ক প্ল্যাটফর্মের সাথে
লক্ষ্যবস্তু সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে। এর ফলে পিএল-১৫ই-এর মতো দূরপাল্লার
অস্ত্রগুলো আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
পিএল-১৫ই ক্ষেপণাস্ত্রের
পাল্লা সম্পর্কে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা রয়েছে। ২০২১ সালের ঝুহাই এয়ার শো-তে
প্রদর্শিত তথ্যে এর পাল্লা ১৪৫ কিলোমিটার (৯০ মাইল) উল্লেখ করা হয়েছিল। অথচ জানুয়ারি
মাসে প্রকাশিত সিনহুয়ার একটি সামরিক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, পিএল-১৫ই-এর সর্বোচ্চ পাল্লা
২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আলাদাভাবে রয়টার্সের
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি কর্মকর্তারা মনে করেন যে ২০২৫ সালের মে মাসে রাফাল
বিমানের সাথে যে সংঘাত হয়েছিল, তা ২০০ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে
ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে দূরত্বটি ছিল আরও বেশি। ভারতীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, তাদের
পাইলটদের ধারণা ছিল যে রপ্তানিযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা ১৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি।
প্রকৃত যুদ্ধকালীন
পাল্লা বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে—যেমন
উৎক্ষেপণের উচ্চতা, বিমানের গতি এবং লক্ষ্যবস্তুর কৌশলগত নড়াচড়া বা ম্যানুভার।
ব্যাপক অর্থে
বলতে গেলে, ভারতের সাথে সেই সংঘাতটি জে-১০সিই-এর সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি আংশিক পরীক্ষা
ছিল মাত্র। জানুয়ারি মাসে করা একটি পৃথক মূল্যায়নে আরইউএসআই উল্লেখ করে যে, ওই ঘটনা
চীনা এভিয়েশন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পর্কে "দরকারি, তবে অসম্পূর্ণ" ধারণা
প্রদান করেছে। যুদ্ধবিমানটির কার্যকারিতা এর স্পষ্ট অপারেশনাল নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণ
করেছে। তবে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করেছিল একটি বৃহত্তর 'কিল চেইন'-এর ওপর—অর্থাৎ
শত্রু বিমান শনাক্তকরণ, অনুসরণ, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং আক্রমণের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার
ওপর।
বেইজিংয়ের জন্য
এই ঘটনাটি এমন এক বিরল বাস্তব অভিজ্ঞতা বা প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে যা দেখায় যে, চীনা
সেন্সর, অস্ত্র ও ডেটা লিঙ্কের সমন্বয়ে গঠিত একটি রপ্তানিযোগ্য প্যাকেজ কীভাবে আধুনিক
পশ্চিমা নকশার যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে তীব্র সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করতে পারে।
যুদ্ধক্ষেত্রে
অর্জিত এই নির্ভরযোগ্যতা জে-১০সিই-এর বাণিজ্যিক আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। কারণ
এটি চীনের বিদ্যমান সুবিধাজনক ক্রয়শর্তের পাশাপাশি এর অপারেশনাল নির্ভরযোগ্যতাকেও প্রতিষ্ঠিত
করেছে।
২০২৫ সালের
পেন্টাগনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেইজিং উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে
"পশ্চিমা ব্যবস্থার তুলনায় কম খরচে" অস্ত্র বিক্রি করতে পারে এবং এর সাথে
আর্থিক প্রণোদনা ও নমনীয় মূল্য পরিশোধের সুবিধাও প্রদান করতে পারে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনূদিত