মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা ইরান সংঘাত ‘আরেকটি ব্যর্থ যুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন প্যানেটা। এমন এক সময়ে তিনি এ কথা বললেন যখন এই সংঘাত থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক
সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া
এক সাক্ষাৎকারে প্যানেটা বলেন, ছয় মাসের বেশি
সময় আগে ট্রাম্প ইরানের
বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু
করেছেন, তা মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি
‘চিরস্থায়ী যুদ্ধে’ রূপ নেওয়ার ঝুঁকিও
রয়েছে। যুদ্ধের শেষ কোথায়, তারও
কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না।
বারাক
ওবামা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্যানেটা।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যে
ভয়াবহ অচলাবস্থায় আটকে গেছে, তা
কোনো রহস্য নয়। এই যুদ্ধের
অবসান ঘটানোর মতো বিকল্প এখন
সত্যিই খুব কম।’
সংঘাতটি
ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো
মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরেকটি ব্যর্থ যুদ্ধে’ পরিণত হওয়ার পথে রয়েছে বলে
মনে করেন প্যানেটা। তিনি
বলেন, ‘আমার মনে হয়,
সমাধান হওয়া ছাড়াই এই
যুদ্ধের আরও ছয় মাস
চলার সম্ভাবনাই বেশি।’
সম্প্রতি
মার্কিন সেনাবাহিনীর বেসামরিক প্রধান (আর্মি সেক্রেটারি) ড্যান ড্রিসকল পদত্যাগ করেছেন। এর কয়েক দিন
পর গার্ডিয়ানকে সাক্ষাৎকার দেন প্যানেটা। একাধিক
কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী
পিট হেগসেথের সঙ্গে মতবিরোধের খবরের মধ্যে ড্রিসকল দায়িত্ব ছাড়েন।
২০১১
থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্যানেটা
বলেন, ‘এমন এক সময়ে
মার্কিন সেনাসদস্যরা যুদ্ধে যাচ্ছেন, যখন পেন্টাগনে, কমান্ড
কাঠামোয় ব্যাপক অস্থিরতা চলছে। এতে এমন একটা
ধারণা তৈরি হচ্ছে যে
আসলে কেউই দায়িত্বে নেই।’
প্যানেটা
বলেন, ‘ইরান হোক কিংবা
আমাদের অন্য প্রতিপক্ষ, তারা
এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে দৃষ্টি রাখছে।
তারা দেখছে, নিজেদের রক্ষায় সামরিক শক্তি কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতার
দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল
হয়ে পড়েছে।’
সাবেক
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো,
আমরা অত্যন্ত বিপজ্জনক এক বিশ্বে বাস
করছি। চীন, রাশিয়া, উত্তর
কোরিয়া ও সন্ত্রাসবাদের দিক
থেকে আমাদের জন্য বড় ধরনের
হুমকি রয়েছে। ইরানও এর মধ্যে রয়েছে।
কিন্তু আমরা আমাদের প্রধান
প্রতিপক্ষদের কাছে দুর্বলতার বার্তা
পাঠাচ্ছি, এ বিষয়টি নিয়ে
আমি উদ্বিগ্ন।’
‘তারা
যে অক্ষ গড়ে তুলেছে,
সেটার আওতায় তারা পরস্পরের সঙ্গে
বৈঠক করছে এবং একে
অন্যকে সমর্থন দিচ্ছে। আমার মনে হয়,
এই মুহূর্তে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বেশ
দুর্বল হিসেবেই দেখছে। আর আমরা যখন
এ ধরনের হুমকির মুখে আছি, তখন
এমন (দুর্বলতার) বার্তা পাঠানো খুবই ভয়াবহ।’
এক বিবৃতিতে পেন্টাগন সম্প্রতি বলেছে, হেগসেথের নেতৃত্বে তারা ‘পুরোদমে কাজ করছে’।
পেন্টাগনের
প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেন,
‘প্রতিরক্ষা বিভাগে বিশৃঙ্খলা চলছে, এ ধারণার কোনো
ভিত্তিই নেই। প্রতিদিন দেশের
প্রতিরক্ষায় কাজ করতে আসা
এই দপ্তরের প্রতিটি নিবেদিতপ্রাণ পেশাজীবী ও সেনাসদস্যের জন্য
এ ধরনের মন্তব্য অপমানজনক। বরং যে পরিবর্তনগুলোকে
বিশৃঙ্খলা মনে হচ্ছে, সেগুলো
আমাদের সংস্কারেরই অংশ।’
এ বিষয়ে মতামত জানতে গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে হোয়াইট
হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো
জবাব পাওয়া যায়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র
ও ইসরায়েল একযোগে ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর তিন সপ্তাহ পর
প্যানেটা গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ
ও প্রভাবের সুযোগ শেষ করতে যুদ্ধ
আরও বাড়াবেন কি না, নাকি
‘শুধু সরে গিয়ে বিজয়
ঘোষণা করবেন’—এই দুই বিকল্পের
মধ্যে ট্রাম্প ‘উভয়সংকটে’ পড়েছেন। তবে যুদ্ধ থেকে
সরে গেলে ট্রাম্প ব্যর্থ
হয়েছেন, এমন ধারণা তৈরি
হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
চলতি
সপ্তাহের শুরুতে প্যানেটা বলেন, তিনি ‘পুরোপুরি’ বিশ্বাস করেন, ট্রাম্প এখনো সেই একই
সংকটময় অবস্থায় আটকে আছেন। তাঁর
ভাষ্যমতে, ‘ট্রাম্প নিজেই তাঁর বের হওয়ার
পথ কঠিন করে ফেলেছেন।’
প্যানেটার
মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন তিনটি বিকল্প
রয়েছে। প্রথমটি হলো, সরে গিয়ে
‘স্বীকার করা যে এটি
একটি ব্যর্থ যুদ্ধ’। তবে ট্রাম্পকে
এমনটা করতে দেখাটা কঠিন
বলে মনে করেন প্যানেটা।
দ্বিতীয়টি
হলো বর্তমান ‘অচলাবস্থা’ আরও দীর্ঘায়িত করা।
এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষই ‘পাল্টাপাল্টি
হামলা’ চালিয়ে যাবে এবং ‘আরও
ভয়ংকর যুদ্ধ শুরু হওয়া এড়ানোর’
চেষ্টা করবে। তবে কেউই আলোচনায়
বসবে না বা আত্মসমর্পণ
করবে না।
প্যানেটার
বিশ্বাস, এ পথে এগোলে
‘সব পক্ষ যে বিষয়টি
নিয়ে আশঙ্কা করেছিল’, সেটিই ঘটবে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হবে।
তৃতীয়
বিকল্প হিসেবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের ‘সবচেয়ে
বিপজ্জনক হাতিয়ার’ তথা বিশ্ববাণিজ্যের এই
গুরুত্বপূর্ণ পথে চলাচল বন্ধ
বা ব্যাহত করার সক্ষমতা কেড়ে
নেওয়া সম্ভব হবে।
প্যানেটা
বলেন, ‘তাই প্রেসিডেন্টকে হয়তো
এগিয়ে এসে হরমুজ প্রণালি
খুলে দিতে যা যা
করা প্রয়োজন, তা করতে হবে।
নয়তো যেমনটা আমি বলেছি, তিনি
এই খেলাই চালিয়ে যাবেন, অচলাবস্থার মধ্যে তিনি কোনোভাবে জিতছেন,
এমন ভান করবেন। অথচ
বাস্তবতা হলো, তিনি জিতছেন
না।’
যুক্তরাষ্ট্রের
জন্য এই যুদ্ধ ‘জেতা
সম্ভব’ কি না, জানতে
চাইলে প্যানেটা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন এলেই কেবল এই
যুদ্ধ জেতা সম্ভব। আর
সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে, এই
মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ও প্রধান
লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি
আবার খুলে দেওয়া।’
ট্রাম্প
বারবার ভুলভাবে দাবি করেছেন, যুদ্ধ
শেষ করার চুক্তি শিগগিরই
হতে যাচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালি
খোলা রয়েছে। প্যানেটা বলেন, এর মাধ্যমে ট্রাম্প
নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করেছেন।
প্যানেটা
বলেন, ‘তাহলে আসল প্রশ্ন হলো,
তিনি (ট্রাম্প) কি সত্যিই এমন
কিছু করার সিদ্ধান্ত নেবেন?’
সিআইএর
সাবেক এই পরিচালক বলেন,
‘অনেক কারণেই তিনি (ট্রাম্প) এখন সবচেয়ে খারাপ
পরিস্থিতির মধ্যে আটকে আছেন। শুধু
তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাই নেই তা নয়,
তিনি যেসব হুমকি দিচ্ছেন,
সেগুলোও পুরোপুরি উপেক্ষা করা হচ্ছে।’
চলতি
সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি
ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক সংঘাতকে তিনি ‘যুদ্ধ’ বলতে রাজি নন।
আগামী
নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই সংঘাত
শেষ হবে কি না,
এমন প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, এর উত্তর
আমার জানা নেই। বিষয়টি
আপনাকে ইরানিদেরকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে।’
প্যানেটা
গার্ডিয়ানকে বলেন, অনেক মার্কিন নাগরিক
ট্রাম্পের ‘এই যুদ্ধ সামলানোর
সক্ষমতার’ ওপর আস্থা হারিয়েছেন।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপের কথা
উল্লেখ করে তিনি বলেন,
ওই জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ
আমেরিকান মনে করেন ইরানের
সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল
এবং তাঁরা এই সংঘাতের বিরুদ্ধে।
প্যানেটা
আরও বলেন, বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে অত্যন্ত দীর্ঘ সময় মোতায়েন রাখার
ঘটনা থেকে পেন্টাগন ও
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তাদের শিক্ষা
নেওয়া উচিত। রেকর্ড সময়ের ওই মোতায়েন শেষে
জাহাজটি চলতি সপ্তাহে থাইল্যান্ডে
পৌঁছেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানকে সহায়তা করতে জাহাজটি ২৬০
দিনের বেশি সময় কোনো
বন্দরে না থেমে মোতায়েন
ছিল। এ সময়ে জাহাজটিতে
জীবনযাত্রার পরিস্থিতি ও সেনাসদস্যদের মানসিক
স্বাস্থ্যের অবনতির খবর ছড়িয়েছে।
প্যানেটা
বলেন, ‘মূল কথা হলো,
সেনাসদস্যদের কোনো ধরনের পালাবদলের
পরিকল্পনা ছাড়া আপনি অনির্দিষ্টকাল
যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন রাখতে পারেন না।’
সাবেক
এই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘যুদ্ধ খারাপভাবে চলছে শুধু তা-ই নয়। একই
সঙ্গে জীবন বাজি রেখে
দায়িত্ব পালন করা আমাদের
নারী ও পুরুষ সেনাসদস্যদের
সামরিক বাহিনী যথাযথভাবে সহায়তা করছে কি না,
তা নিয়েও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।’
দ্য
গার্ডিয়ান