বাংলাদেশ ও ভারত কয়েক মাস ধরে তাদের কূটনীতির কৌশল ‘রিসেট’ করার চেষ্টা করছে। এই শব্দ থেকে মনে হতে পারে আন্তর্জাতিক সম্পর্কটি যেন কোন ওয়াই-ফাই রাউটারের মতো - বন্ধ করে আবার চালু করলেই ঠিক হয়ে যায়।
রিসেট
করার মতো যথেষ্ট কারণও
ছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত
হয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছেন এবং নয়াদিল্লিকে সেই
ক্ষমতাচ্যুত শাসকের আশ্রয় দিয়েছে, যাকে কেন্দ্র করে
দেশটি তার বাংলাদেশ নীতির
অনেকটাই সাজিয়েছিল।
এরপর,
চলতি বছরের ৫ আগস্ট হাসিনা
দিল্লি থেকে কথা বলেন। একটি মিডিয়া অনুষ্ঠানে
তার সরাসরি অডিও উপস্থিতি ছিল
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে
ভেসে আসা একটি কণ্ঠস্বর।
কিন্তু এটি এক অসাধারণ
কার্যকর কূটনীতি হিসেবে প্রমাণিত হয়। হাসিনা তার
গোপন ডেরা থেকে বের না হয়েও, ফেব্রুয়ারির বিপুল
বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর আটকে
দিতে সক্ষম হন।
ভারত
২১ ও ২২ আগস্ট
একটি রাষ্ট্রীয় সফরের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং রহমানকে বিমসটেক
চেয়ারম্যান হিসেবে আগামী মাসের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। ঢাকা এমন একটি
দ্বিপাক্ষিক সফর আশা করে যেখানে তারেক
রহমান আঞ্চলিক সংস্থার পরিষেবা দরজা দিয়ে প্রবেশের
পরিবর্তে একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী
হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতার
মধ্য দিয়ে পদার্পন করবেন।
এখন
সেই সফর স্থগিত হয়েছে। ঢাকা
আগেই ভারতকে সতর্ক করেছিল যে, হাসিনাকে ভারতের
মাটি থেকে রাজনীতি করার
অনুমতি দিলে সম্পর্ক উন্নয়নের
প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভারত
সেই অনুষ্ঠান বন্ধ করেনি। পরে
নয়াদিল্লি জানায়, তারা এই উপস্থিতির
আয়োজনও করেনি এবং হাসিনার মন্তব্যকেও
সমর্থন করেনি। ভারতের এই অযুহাত কূটনৈতিকভাবে
পরিপাটি হলেও রাজনৈতিকভাবে
অকার্যকর।
বাংলাদেশের
অভিযোগ এই নয় যে
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্যক্তিগতভাবে কনফারেন্সটি
আয়োজন করেছিলেন।
অভিযোগটি হলো, ভারতকে সতর্ক
করা সত্ত্বেও তারা এর অনুমতি
দিয়েছে এবং ২০২৪ সালের
গণঅভ্যুত্থান দমনের জন্য মানবতাবিরোধী অপরাধে
দণ্ডিত একজন সাবেক শাসককে রাজনৈতিক
ক্ষেত্র জুগিয়েছে।
তারেক রহমানের
প্রতিক্রিয়াটি বিচক্ষণতাসুলভ,
কারণ এটি তুলনামূলক সাধারণ। বাংলাদেশ বাণিজ্য,
নিরাপত্তা সহযোগিতা বা জ্বালানি সংযোগ
স্থগিত করেনি। কর্মকর্তারা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকা কেবল এমন
একটি বিষয় আটকে রেখেছে যা
ভারত চায়: একটি মোদী-রহমান
শীর্ষ সম্মেলনের প্রতীকী তাৎপর্য।
অভ্যন্তরীণভাবে,
হিসাবটি আরও ভালো। বাংলাদেশের
রাজনীতিতে ভারতপ্রীতির মতো অভিযোগ দ্রুত জনরোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতির পর দিল্লিতে ছুটে
যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে রহমান বিদেশে একই সাথে যুক্তিসঙ্গত
এবং দেশে শক্তিশালী হিসেবে
নিজেকে উপস্থাপন করতে পেরেছেন: ভারতের সাথে কথা বলতে
ইচ্ছুক, কিন্তু দৃশ্যত ভারতের ফোনের জন্য টেলিফোনের পাশে
অপেক্ষা করছেন না।
এই নীতির একটি দুর্বলতাও আছে। এটি
প্রতিক্রিয়াশীল। হাসিনা ভারতে থাকেন, যার অর্থ হলো
তিনি কতটা রাজনৈতিক স্পেস
পাবেন, তা নয়াদিল্লি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই প্রতিটি
সাক্ষাৎকার বা ভাষণ ঢাকাকে
ক্ষোভ এবং পরিকল্পিত উদাসীনতার
মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বাধ্য
করতে পারে। বাংলাদেশ ভারতকে এবং পরোক্ষভাবে হাসিনাকে তার ভারত নীতির গতি
নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়ার
ঝুঁকি নিচ্ছে।
নয়াদিল্লির
জন্যও এই হিসাব সমানভাবে
অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে। ভারত
কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখতে পারে: হাসিনাকে প্রত্যর্পণ না করে আবার
আনুষ্ঠানিকভাবে আলিঙ্গন না করেও একজন
পুরোনো মিত্রকে অতিথি, বিমা নীতি এবং
কূটনৈতিক দর কষাকষির হাতিয়ারের
মাঝামাঝি কোথাও রাখতে পারে। অথবা এটি নীরবে
মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তার আশ্রয় ধরে
রাখতে পারে।
শেষোক্ত বিষয়টি
ক্রমশই অর্থবহ হয়ে উঠছে।
হাসিনা ভারতের
কাছে মূল্যবান ছিলেন কারণ তিনি ভারত যা চেয়েছিল তা পূরণ করেছিলেন…
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট, সংযোগ
এবং স্থিতিশীল সম্পর্ক। কিন্তু যখন কোনো মিত্র শাসন করা বন্ধ করে দেয়, তখন তার কৌশলগত
মূল্য নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
আগস্টে হাসিনার
বক্তব্য তার অবশিষ্ট প্রভাব এবং তার সীমাবদ্ধতা উভয়ই প্রদর্শন করেছিল। তিনি অল্প সময়ের
জন্য ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মেরামতের কাজে বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তবুও প্রতিটি
সফল বিঘ্ন সেই প্রশ্নটি উত্থাপন করে যা নয়াদিল্লি এড়াতে চায়: হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া
কি সেই সরকারের সাথে সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ দেওয়ার যোগ্য, যে সরকার প্রকৃতপক্ষে
বাংলাদেশ চালায়?
ভারত অনির্দিষ্টকালের
জন্য আনুগত্যকে কৌশলের সাথে গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি নিতে পারে না। বাংলাদেশ উত্তর-পূর্বের
বেশিরভাগ অংশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত এবং বাণিজ্য, ট্রানজিট, সন্ত্রাসবাদ দমন, বিদ্যুৎ
এবং বঙ্গোপসাগরের সংযোগের জন্য ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির
মেয়াদ এই বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে।
রাজনীতিবিদরা
জানেন, ভূগোলকে নির্বাসনে পাঠানো যায় না। এর মানে এই নয় যে ভারত হাসিনাকে পরিত্যাগ
করবে। তার এবং আওয়ামী লীগের সাথে দেশটির দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে প্রত্যর্পণে
আইনি জটিলতা রয়েছে। সম্ভাব্য সমঝোতাটি হলো মঞ্চবিহীন আশ্রয়: হাসিনা ভারতের অতিথি
হয়েই থাকতে পারেন, কিন্তু পরে তিনি আবিষ্কার করবেন যে আতিথেয়তার মধ্যে সম্প্রচারের
সুযোগ-সুবিধা থাকাটা আবশ্যক নয়।
ভারতীয় হাইকমিশনার
দীনেশ ত্রিবেদী এসব বিষয়ে অগ্রগতির প্রয়োজনীয়তার ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।
তিনি উভয় দেশকে "এগিয়ে যেতে" আহ্বান জানিয়েছেন এবং তারেক রহমান ভারত সফরে
এলে তাকে "সম্মানজনক অভ্যর্থনা" দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি এই সম্পর্ককে
"সমতার অংশীদারিত্ব" বলে অভিহিত করেছেন — এই ভাষাটি ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের
ভারত সম্পর্কিত প্রধান উদ্বেগের কথা মাথায় রেখে সতর্কতার সাথে তৈরি করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত দিল্লিতে যাবেন। হাসিনা বক্তৃতা দিলেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান
করার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ যেমন পুরোপুরি ভারত নীতি তৈরি করতে পারে না, ঠিক তেমনি
ভারতও এমন একজন নারীকে কেন্দ্র করে, যিনি আর দেশ শাসন করছেন না, বাংলাদেশ নীতি তৈরি
করতে পারে না।
তবে আপাতত,
ঢাকার এই ঝুঁকি নেওয়াটা বিচক্ষণতার পরিচায়ক। এতে খরচ সামান্য, এটি তারেক রহমানকে
রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে এবং ভারতকে জানিয়ে দিয়েছে যে সম্পর্কের শর্ত বদলে গেছে।
আবার হাসিনা
দেখিয়েছেন যে তিনি নির্বাসন থেকেও কূটনীতিতে বাধা দিতে পারেন।
হাসিনার সবচেয়ে
বড় সমস্যা হলো, তার প্রতিটি বাধা ভারতকে এর পরিণাম হিসাব কষতে উৎসাহিত করে। আর পুরোনো
বন্ধুত্বে পররাষ্ট্রনীতি আটকে থাকে না, শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থের হিসাব-নিকাশেই
এসে দাঁড়ায়।
এশিয়ান
টাইমস থেকে অনুদিত