ভারতের সীমান্তবর্তী নেপালের তরাই-মধেশ অঞ্চলে ধর্মীয় সংঘাতের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মতো ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নেপালের মাটিতে ক্রমাগত বাড়তে থাকায়, দেশটিতে হিন্দু-মুসলিম উত্তেজনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। উত্তর ভারতে এই ধরনের ঘটনা সাধারণ হলেও, কিছুদিন আগে পর্যন্ত নেপালে তা বিরল ছিল।
আগস্ট
মাসের শুরুতে নেপালের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কোশি
প্রদেশে পুলিশের
সাথে সংঘর্ষে চারজন নেপালি যুবক নিহত হন।
এই ঘটনার তাৎক্ষণিক কারণ ছিল সুনসারি
জেলার দেওয়ানগঞ্জ দিয়ে উচ্চস্বরে গান বাজাতে বাজাতে
যাওয়া একটি হিন্দু মিছিল।
স্থানীয় মুসলমানরা এর প্রতিবাদ জানায়।
এরপর সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ
হস্তক্ষেপ করে এবং তিনজন
যুবক নিহত হন। সংশ্লিষ্ট
বিক্ষোভের জেরে চতুর্থ একজন নিহত হন
অন্য একটি জেলায়। স্থানীয় বিবরণ থেকে জানা যায়,
এলাকার হিন্দুরা আগে থেকেই ক্ষুব্ধ
ছিলেন। কারণ ইসলামি নতুন বছরের সূচনা মাস মহররম উপলক্ষে আয়োজিত উৎসবের
জন্য টানানো কিছু সবুজ
পতাকা তখনও সরান হয়নি।
একটি
সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, গত আট বছরে
তরাই অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম উত্তেজনার এমন অন্তত ১৭টি
ঘটনা ঘটেছে।
আগে,
নেপালি হিন্দুরা প্রকাশ্যে তাদের ধর্মীয় পরিচয় জাহির করার প্রয়োজন খুব
কমই অনুভব করতেন। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের
শুরু থেকে ভারতে হিন্দু
শক্তিগুলো যখন মুসলিম-বিরোধী
কার্যকলাপের বেশ নির্লজ্জ প্রদর্শন
শুরু করে—যার মধ্যে
সবচেয়ে কুখ্যাত ছিল ১৯৯২ সালে
অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংস—তখন নেপালেও হিন্দু
উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান
পালনে পরিবর্তন আসতে শুরু করে।
২০২৪
সালের জানুয়ারিতে ভারতের অযোধ্যায় রাম মন্দিরের উদ্বোধনের
সময় নাগাদ তরাই-মধেশের হিন্দু
বাড়িগুলোতে ছাদে গেরুয়া পতাকা
একটি সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠেছিল। ধর্মীয়
পরিচয় যখন প্রকাশ্যে আরও
বেশি রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু
করে, তখন মুসলিম পরিবারগুলোতে
গেরুয়া পতাকার জবাবে ক্রমবর্ধমানভাবে সবুজ পতাকা দেখা
যেতে থাকে। আবারও সীমান্তের ওপার থেকে আসা
প্রথার অনুকরণে, উচ্চস্বরের সঙ্গীতসহ বিস্তৃত ধর্মীয় শোভাযাত্রাও নেপালি হিন্দু ও মুসলিম উভয়ের
মধ্যেই সাধারণ হয়ে ওঠে।
বিজেপির
বক্তব্য - সমস্ত মুসলিম মূলত হিন্দু-বিরোধী
এবং তাই তাদের প্রতিরোধ
করতে হবে – এটা নেপালে সক্রিয় হিন্দু-পন্থী, বিজেপি-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সোচ্চার সমর্থনের কারণেও শেকড় গেড়েছে। তারা প্রায়শই তাদের
কার্যকলাপকে ন্যায্যতা দিতে এই অঞ্চলের
মাদ্রাসাগুলোতে ক্রমবর্ধমান উগ্রপন্থা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের
প্রবেশের কথা বলে। বিশেষ করে বিজেপির শাসনাধীন ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো
এই গোষ্ঠীগুলোকে মদত দিচ্ছে।
মাওবাদী
বিদ্রোহের অবসানের পর ২০০৭ সালে
নেপালে জারি করা অন্তর্বর্তীকালীন
সংবিধান দেশটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র
হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু ২০১৫
সাল নাগাদ, একটি হিন্দু রাষ্ট্রের
দাবি আবারও জোরালো হতে শুরু করে।
২০১৫ সালে নতুন সংবিধান
জারির সময় নেপালের উপর
ভারতের মাসব্যাপী অবরোধ আরোপের একটি কারণ ছিল
এই যে, নেপালের রাজনৈতিক
মহল বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের এই ইচ্ছাকে উপেক্ষা
করেছিল যে নতুন সংবিধানটি
নেপালকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র
হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে।
২০২৬
সালে এসে, নেপালে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ধর্মের ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। দেশটির সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ। কিন্তু একদিকে হিন্দু এবং অন্যদিকে মুসলিমদের
(এমনকি খ্রিস্টানদেরও) মধ্যে মেরুকরণ যদি বাড়তে থাকে,
তাহলে বড় দলগুলো প্রকাশ্যে হিন্দুধর্মকে আরও বেশি করে
গ্রহণ করার জন্য বৃহত্তর
নির্বাচনী চাপের সম্মুখীন হতে পারে। নেপালিদের
৮১ শতাংশই হিন্দু। নেপালের সমস্ত প্রধান দলের মধ্যেই ইতোমধ্যে
উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিন্দু রাষ্ট্রপন্থী ভোটার রয়েছে।
২০১৫
সালের সংবিধান দেশটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র
হিসেবে ঘোষণা করার পাশাপাশি এই
শর্তটিও যুক্ত করে যে, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো “অনাদিকাল
থেকে চলে আসা ধর্ম
ও সংস্কৃতির সুরক্ষা”। যেহেতু এই
বাক্যাংশটি সাধারণত প্রধানত হিন্দু ঐতিহ্যকেই নির্দেশ করে বলে মনে
করা হয়, তাই এই
বিধানটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মকে একটি অন্তর্নিহিত সাংবিধানিক
সুবিধা প্রদান করে।
ধর্মনিরপেক্ষতার
এই সংজ্ঞা ছিল হিন্দুপন্থী এবং ধর্মনিরপেক্ষ উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার জন্য একটি আপোস।
তবুও এই ধরনের অস্পষ্টতা কোনো সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য সাধনে সহায়ক বলে মনে হচ্ছে না।
হিন্দুদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ একটি আইনসম্মত হিন্দু রাষ্ট্র চায়। অন্যদিকে, ক্রমশ
প্রান্তিক হয়ে পড়া জনসংখ্যার পাঁচ শতাংশের কিছু বেশি মুসলিমসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা
ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি নেপালি রাষ্ট্রের নিঃশর্ত
অঙ্গীকার চায়।
ঝুঁকিটি
হলো, এই বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষগুলো একসময় আরো বড় আকার নেবে এবং কাঠমান্ডুর পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ
করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। সাম্প্রতিক উত্তেজনা মোকাবেলায় বলেন্দ্র শাহ সরকারের ভূমিকা
ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক । শুরুতে, সুনসারির ঘটনাটিকে একটি আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে
দেখা হয়েছিল এবং নেপাল পুলিশ দাঙ্গাকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি
ব্যবহার করেছিল। এতে বিস্ময়করভাবে উত্তেজনা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
তরাই-মধেশ
অঞ্চল জুড়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়তে থাকলেও প্রধানমন্ত্রী শাহ জাতির উদ্দেশে
ভাষণ দিতে এবং শান্ত থাকার আবেদন জানাতে অস্বীকার করেন। সুনসারিতে পুলিশের গোলাগুলির
পঞ্চম দিনে যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে
চলে যাওয়ার উপক্রম হয় তখনই শাহ অবশেষে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এর পরের দিন থেকেই
উত্তেজনা কমতে শুরু করে।
কিন্তু
স্থায়ী ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং নেপালের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা করতে
হলে, ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা রাখার পক্ষে একটি ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকা আবশ্যক। এর
মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে ধর্মীয় ভিত্তিতে প্রচার
না চালানোর সুস্পষ্ট অঙ্গীকার এবং স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশি ব্যবস্থায় সংখ্যালঘুদের
বৃহত্তর প্রতিনিধিত্ব।
ভারতের
বিপরীতে, নেপালের রাজনৈতিক দলগুলোর সংকটের সময়ে জাতীয় স্বার্থে নিজেদের মতপার্থক্য
দূরে সরিয়ে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার একটি নজির রয়েছে। এবারও সব প্রধান দল সাম্প্রদায়িক
সম্প্রীতির আবেদন জানাতে এক হয়েছিল।
তবুও,
যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ধর্মকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তখন আপোস করা অনেক বেশি
কঠিন হয়ে পড়ে। ভারতের উদাহরণ যেমনটা ইঙ্গিত দেয়, দলগুলো নীতি ও ক্ষমতা নিয়ে দর
কষাকষি করতে পারলেও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে সেটা পারে না।
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুদিত