২০২৪ সালের আগস্ট মাসে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন কেবল একটি দেশের রাজনীতির মোড়ই ঘুরিয়ে দেয়নি, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি অংশের নিরাপত্তা কাঠামোকেও পুরোপুরি গুড়িয়ে দিয়েছে। গত ১৫ বছর ধরে ভারতের নিকট-প্রতিবেশী অঞ্চলে তাদের পররাষ্ট্রনীতি একটি অটল নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছিল: হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে ভারতের পূর্বাঞ্চলকে নিরাপদ রাখা।
আজ সেই কৌশলটিই ভারতের জন্য এক বড়
সংকটের জন্ম দিয়েছে। হাসিনা
এখন ভারতের মাটিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে,
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী
দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে একটি নতুন সরকার
ঢাকা শাসন করছে। বাংলাদেশের
আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হাসিনাকে দোষী
সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে
এবং ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে
ফেরত পাঠানোর (প্রত্যর্পণ) জন্য নয়াদিল্লির কাছে দাবি জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতি নয়াদিল্লির জন্য একটি জটিল
চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা
‘হাসিনা সংকট’ হিসেবে পরিচিত। এটি এমন একটি
সমস্যা যার সমাধান কেবল
কোনো এক পক্ষ বেছে
নেওয়ার মাধ্যমে সম্ভব নয়। বরং এটি,
একটি বড় শক্তিধর দেশকে
ব্যক্তিগত কূটনীতি কীভাবে ফাঁদে ফেলতে পারে তার একটি
প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই আঞ্চলিক সংকট
সামলাতে গিয়ে ভারতকে এখন কঠিন সব
যুক্তি ও পরিস্থিতির মধ্যে
ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।
ভারতের
এই সংকটের মূলে রয়েছে রাষ্ট্র
পরিচালনার একটি মৌলিক বিষয়:
বিশ্বাসযোগ্যতা। এক দশকেরও বেশি
সময় ধরে, ভারতের জাতীয়
নিরাপত্তার মূল দাবিগুলো পূরণ
করতে গিয়ে হাসিনা নিজের
দেশের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছেন। তাঁর
সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ভারত-বিরোধী বিদ্রোহী
গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল।
তাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করে নয়াদিল্লির হাতে
তুলে দিয়েছিল। তিনি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট
রুট বা চলাচলের পথ
খুলে দিয়েছিলেন। যার ফলে ভারতের
পণ্যবাহী জাহাজ ও ট্রাক বাংলাদেশের
মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে
ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল।
ভারত
যদি ঢাকার দাবিতে নতি স্বীকার করে
এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য হাসিনাকে
ফেরত পাঠায়, তবে তা ভুটান,
নেপাল ও শ্রীলঙ্কার মতো
অন্যান্য প্রতিবেশীদের কাছে একটি বিপজ্জনক
বার্তা যাবে: রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে ভারত তার
ঘনিষ্ঠতম মিত্রদেরও পরিত্যাগ করতে পারে। অন্যদিকে, হাসিনাকে
সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিও ভারতের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এটি বাংলাদেশের সুশীল
সমাজের মধ্যে ভারত-বিরোধী মনোভাবকে
ক্রমাগত উসকে দিচ্ছে। ভারত
যতদিন তাকে ঢাল হিসেবে
রক্ষা করবে, বিএনপি সরকারের পক্ষে নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা ততই সহজ
হবে। এই ক্ষোভের ফলে
ভারতের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও ট্রানজিট রুটগুলো
বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি
তৈরি হচ্ছে। কারণ ক্ষুব্ধ জনতা যেকোনো সময়
এগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।
উভয়
দেশের সম্পর্কের টানাপড়েন এখন আর কেবল
পর্দার আড়ালের বিষয় নয়; এটি
এখন প্রকাশ্য কূটনৈতিক বয়কটের রূপ নিয়েছে। নয়াদিল্লিতে
অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার
বিষয়ে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এই পরিবর্তনের একটি
স্পষ্ট উদাহরণ।
ঢাকা
এই সম্মেলন-আমন্ত্রণকে—ভারতের পক্ষ থেকে একটি
ইচ্ছাকৃত কূটনৈতিক অবজ্ঞা হিসেবে বিবেচনা করে। যেখানে তাকে সরাসরি সরকারপ্রধান
হিসেবে নয়, বরং একটি
আঞ্চলিক জোটের (বিমসটেক) প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। জবাবে তারেক রহমান নয়াদিল্লি সফরকেই পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেন।
পরিবর্তে,
তিনি তার কূটনৈতিক মনোযোগ
অন্য দিকে সরিয়ে নেন:
তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এক উচ্চ-পর্যায়ের
সফরে যান এবং সেখানে
পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে পার্শ্ব-বৈঠক করেন। একই
সময়ে, বড় ধরনের অবকাঠামো
ঋণের বিষয়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করে তার প্রশাসন।
নয়াদিল্লিতে
একক বা দ্বিপাক্ষিক সফর
প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে রহমান একটি স্পষ্ট বার্তা
দিয়েছেন: ভারতের
পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বয়ংক্রিয়ভাবে একাত্ম হওয়ার দিন শেষ। ঢাকা বুঝিয়ে
দিচ্ছে যে, ভারতের প্রভাবের
ভারসাম্য রক্ষায় তারা নিজেদের কৌশলগত
ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগাতে পুরোপুরি
প্রস্তুত। ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের সঙ্গে
ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে তারা এমন এক
হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে যা প্রমাণ
করে যে, বাংলাদেশ আর
নয়াদিল্লির অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
'হাসিনা-সংক্রান্ত এই জটিল পরিস্থিতি'
বিশ্বজুড়ে পররাষ্ট্রনীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি কাঠামোগত
সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে: কখনোই
কোনো একজন রাজনৈতিক নেতাকে
পুরো দেশের সমার্থক বলে ভুল করা
উচিত নয়।
দীর্ঘ
১৫ বছর ধরে ভারতের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ধারণার ওপর
ভিত্তি করে কাজ করেছে
যে, হাসিনাকে খুশি রাখা মানেই
বাংলাদেশকে স্থিতিশীল রাখা। বাংলাদেশে পরপর অনুষ্ঠিত অত্যন্ত
বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর সময় নয়াদিল্লি বিষয়টি
এড়িয়ে গেছে এবং তার
সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ক্রমবর্ধমান
অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের চেয়ে তাৎক্ষণিক সীমান্ত
নিরাপত্তাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
নিজের জাতীয়
স্বার্থকে একজন ব্যক্তির সাথে এতটা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ফেলার কারণে, বাংলাদেশের বিরোধী
দল, ছাত্র আন্দোলন এবং বৃহত্তর সুশীল সমাজের সাথে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে
ভারত ব্যর্থ হয়েছে।
হাসিনার পতনের
পর, এই নীতির জন্য ভারতকে এখন বড় ধরনের মাশুল দিতে হচ্ছে। ঢাকার নতুন নেতৃত্ব সীমান্ত
ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ গ্রিড ভাগাভাগির মতো সাধারণ ও কারিগরি দ্বিপাক্ষিক
বিষয়গুলোকেও গভীর সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভারতের বৃহত্তর রাজনৈতিক
পরিসরের সাথে যোগাযোগ না রাখার ফলে, এখন তাদের একটি সন্দিগ্ধ প্রশাসনের সাথে নতুন করে
কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হচ্ছে এবং একই সাথে ক্ষমতাচ্যুত নেত্রীকে আশ্রয় দেওয়ার
কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক দায়ভারও সামলাতে হচ্ছে।
তবে, ভারত ও
বাংলাদেশের সম্পর্ক চিরকাল এই রক্ষণশীল বা সতর্ক অবস্থানে আটকে থাকতে পারে না। নিত্যপ্রয়োজনীয়
খাদ্য আমদানি, চিকিৎসা-ভ্রমণ এবং বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো যাতে বিচ্ছিন্ন বা নিরাপত্তা ঝুঁকির
মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে ঢাকার সহযোগিতা ভারতের জন্য অপরিহার্য।
এর বাস্তবসম্মত
সমঝোতার লক্ষণও ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। সম্পর্কের সম্পূর্ণ অবনতির ঝুঁকি অনুধাবন করে
ভারতের কূটনীতিকরা একটি সংযত ও সুশৃঙ্খল কৌশল গ্রহণ করেছেন এবং নতুন সরকারের সাথে
"গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্ক" গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ
করছেন। মনে হয়, এই পর্দার আড়ালের কূটনীতি সম্পর্কের প্রাথমিক স্থবিরতা কাটাতে সফল হয়েছে
এবং ২০২৬ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বরের শেষের দিকে নয়াদিল্লিতে রহমানের সরকারি সফরের
পথ প্রশস্ত করছে।
আসন্ন এই সফরকে
সফল করতে হলে উভয় দেশকেই একটি নীরব ও দ্বিমুখী কৌশলের ভিত্তিতে সহযোগিতা করতে হবে।
প্রথমত, এমন
একটি তৃতীয় দেশ খুঁজে বের করতে হবে যারা শেখ হাসিনাকে স্থায়ী আশ্রয় দিতে ইচ্ছুক। দক্ষিণ
এশিয়ার বাইরে—যেমন মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো অংশে—হাসিনাকে
নিরাপদ কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ভারতকে নীরবে কাজ করতে হবে। এই পদক্ষেপ ঢাকাকে
দেশের ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক বিজয় দাবি করার সুযোগ করে দেবে এবং একই সাথে সরাসরি প্রত্যর্পণের
ফলে ভারতের যে চরম ভাবমূর্তি-সংকট তৈরি হতো, তা থেকেও রক্ষা করবে।
দ্বিতীয়ত, ভারত
ও বাংলাদেশকে 'লেনদেন-ভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিকতা'র দিকে সরে আসতে হবে। উভয় দেশের রাজধানীকেই
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে—যেমন ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি
বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি—আবেগঘন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে না দেখে
কারিগরি ও অপরিহার্য অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করতে সম্মত হতে হবে।
'হাসিনা সঙ্কট’
প্রমাণ করে যে, আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে গতকালকের স্থিতিশীলতা সহজেই আগামীকাল সবচেয়ে বড়
কৌশলগত ফাঁদে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সম্ভবত আর কখনোই গত দশকের সেই
ঘনিষ্ঠ ও ব্যক্তিগত মৈত্রীর পর্যায়ে ফিরে যাবে না। বরং এই সম্পর্ক স্থায়ীভাবে এক শীতল
ও লেনদেন-ভিত্তিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
তা সত্ত্বেও,
নয়াদিল্লি ও ঢাকা—উভয় পক্ষই যদি তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক
বাগাড়ম্বরকে অভিন্ন ভৌগোলিক বাস্তবতার ঊর্ধ্বে রাখতে পারে, তবে তারা কেবল একজন ক্ষমতাচ্যুত
নেতার কারণে সৃষ্ট কূটনৈতিক সংকটকে দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়া থেকে আটকাতে
পারবে।
দ্য ডিপ্লোম্যাট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ