দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা একটি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ তার প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ সংকট থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসা এই কেন্দ্রটি নিয়ে যেমন আশা রয়েছে, তেমনি এর পাশে বসবাসকারীদের মধ্যে রয়েছে উদ্বেগও।

২.৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি—যা বাস্তবায়নে এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছে এবং যার ব্যয় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (৫৩.১ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত)। এটা একসময়ের শান্ত ও অখ্যাত গ্রামটির চেহারা বদলে দিয়েছে; এখানে এসেছে রাশিয়ান কর্মী, নতুন ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ।

পুরোপুরি চালু হলে এর দুটি রিঅ্যাক্টর দক্ষিণ এশিয়ার ১৭ কোটি মানুষের এই দেশটির মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে দেশটি বর্তমানে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত।

রাষ্ট্র মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান 'নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাসানের কাছে এই বিশাল স্থাপনাটি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ আনার কয়েক দশকের পুরোনো স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন।

ঢাকা থেকে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মাইল) পশ্চিমে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত প্রকল্প এলাকায় হাসান জানান, এই বছরের শেষ নাগাদ কেন্দ্রটির প্রথম রিঅ্যাক্টর চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং দ্বিতীয় ইউনিটটি "এক বছরের মধ্যে চালু হবে"।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত মূলত জীবাশ্ম জ্বালানি—বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের—উপর নির্ভরশীল; বাকি চাহিদা কয়লা, তেল এবং নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে মেটানো হয়।

আমাকে বদলে দিয়েছে

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা 'রোসাটম'-এর সহায়তায় নির্মিত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশে রাশিয়ার এক ভিন্নধর্মী আবহের সৃষ্টি করেছে।

হাজার হাজার রাশিয়ান কর্মী বছরের পর বছর ধরে এর নির্মাণকাজ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ করেছেন; তাঁদের ঘিরে গড়ে উঠেছে আবাসিক কমপ্লেক্স, দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ।

দোকানগুলোর সাইনবোর্ড বাংলা, ইংরেজি ও রাশিয়ান ভাষায় লেখা; আবার কোনো কোনো রেস্তোরাঁয় স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি পরিবেশন করা হচ্ছে রাশিয়ান 'বর্শ্ট' স্যুপ।

রাশিয়ান ইনস্টলেশন টেকনিশিয়ান আলেকজান্ডার ভ্লাদিমিরোভিচ স্কভোরতসভ জানান, তাঁর সামনে তুরস্ক কিংবা বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ ছিল। তিনি রূপপুরকে বেছে নেন এবং ২০২৪ সালে সপরিবারে সেখানে চলে যান।

তিনি এএফপি-কে বলেন, “রূপপুরের নির্মাণকাজ শুরুর দিকে যখন আমি জায়গাটি দেখি, তখন বুঝতে পারি এই প্রকল্পে কতটা বিশাল কর্মযজ্ঞ অপেক্ষা করছে... সত্যি বলতে, রূপপুর আমাকে ও আমার জীবনকে বদলে দিয়েছে।”

এই প্রকল্প স্থানীয় অর্থনীতিতেও আমূল পরিবর্তন এনেছে।

২৮ বছর বয়সী মো. ইমন খান ঢাকার একটি পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে রূপপুরে ফিরে আসেন; বর্তমানে তিনি সেখানে শ্রমিকদের কাছে শাকসবজি ও ফল বিক্রি করেন।

তিনি বলেন, “আমি কিছুটা রুশ ভাষা বলতে পারি, আর তারাও বাংলা বলতে পারে।”

প্ল্যান্টের কর্মকর্তারা জানান, এখানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলা হয়েছে এবং অতীতের পারমাণবিক দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা এই প্রকল্পে কাজে লাগানো হয়েছে।

বিকিরণ পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও সতর্কীকরণ পোস্টের কাছে দাঁড়িয়ে ১৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ নাফিজ জানায়, ভয়ের মতো তেমন কিছু সে দেখছে না।

সে আরও বলে, “আমরা আনন্দিত যে রূপপুর এখন বিশ্বজুড়ে পরিচিত; আমার বন্ধুরা ও আমি আশা করছি, প্রকৌশল শিক্ষা শেষ করে আমরা এই প্ল্যান্টেই কাজ করব।”

তবে সবার মধ্যে এমন আস্থা নেই।

৮০ বছর বয়সী মো. ইউনুস আলী, যার বাড়ি এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে মাত্র ১৫ মিনিটের হাঁটাপথে, জানান যে ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের বিরোধিতা বহু পুরনো বিষয়।

কাগজ কলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী আলী বলেন, “কয়েক দিন আগে তারা বিকট শব্দে একটি কম্প্রেসার পরীক্ষা চালিয়েছিল... এমনকি ঘুমের মধ্যে থাকা শিশুরাও ভয়ে জেগে উঠেছিল।”

“আমি এখন বৃদ্ধ, নিজের জীবনের জন্য আমার কোনো ভয় নেই... কিন্তু আমার সন্তান ও নাতি-নাতনিরা আছে, এবং আমি তাদের নিরাপত্তা চাই।”

পূর্ণ সুফল

১৯৬০-এর দশক থেকেই রূপপুরে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।

স্বাধীনতার পর সৌদি আরব ও ফ্রান্সের সাথে যোগাযোগ এবং চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে আলোচনার মতো বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো চুক্তিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

অবশেষে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মস্কোর সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে; এতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের মূল ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থায়নের জন্য ঋণ প্রদানের প্রস্তাব দেয়।

২০১৭ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়।

এরপর থেকে প্রকল্পটি বিভিন্ন বিলম্বের মুখে পড়েছে—যার মধ্যে রয়েছে কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট বিঘ্ন এবং ইউক্রেন আক্রমণের জেরে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা, যা যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।

এছাড়া প্রকল্পটিকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে, যার মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তবে অধিকাংশ বাংলাদেশির কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রূপপুর থেকে কবে নাগাদ নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

৫৫ বছর বয়সী কৃষক বেলি বেগম ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে তাঁর জমিতে সেচ দিতে গিয়ে হিমশিম খান।

তিনি বলেন, “আমি চাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দ্রুত চালু হোক এবং আমরা এর পূর্ণ সুফল ভোগ করি।”

“যেহেতু বিদ্যুৎকেন্দ্রটি আমার বাড়ির কাছেই, তাই আশা করছি আমরা কোনো বাধা ছাড়াই ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাব।”

এএফপি