প্রথম দর্শনে বিষয়টি খুব একটা জটিল মনে হয় না।
প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কংগ্রেসে রিপাবলিকানরা
২০২৪ সালের নভেম্বরে নির্বাচিত হয়েছিলেন অর্থনীতিকে ঠিক করার প্রতিশ্রুতি
নিয়ে। এখন ২০২৬ সালের
নভেম্বর—আর আমেরিকানরা দুই
বছর আগের তুলনায় অর্থনীতির
বর্তমান অবস্থা নিয়ে আরও বেশি
হতাশ।
সুতরাং,
আসল কারণটা অর্থনীতিই—বোকার মতো অন্য কিছু
খোঁজার দরকার নেই!
তবে
জেমস কারভিলের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, বিষয়টি আসলে ততটা সরল
নয়।
আমেরিকার
অর্থনীতি আশ্চর্যজনকভাবে বেশ ভালো অবস্থায়
রয়েছে। বেকারত্বের হার অত্যন্ত কম—এতটাই কম যে অর্থনীতিবিদরা
মার্কিন অর্থনীতিকে ‘পূর্ণ কর্মসংস্থান’ পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করেন।
সামগ্রিক ভোক্তা ব্যয়, যা মার্কিন অর্থনীতির
ভিত্তি, তা মোটামুটি স্থিতিশীল
রয়েছে। এছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) বিপ্লব
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এমন গতি দিয়েছে
যে, এটি আধুনিক মার্কিন
ইতিহাসের বৃহত্তম ব্যয়-উচ্ছ্বাসে পরিণত
হতে পারে বলে ধারণা
করা হচ্ছে।
অর্থনীতি
যদি এতই শক্তিশালী হয়,
তবে রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় আনার মাত্র দুই
বছরের মধ্যেই আমেরিকানরা কেন তাদের ওপর
বিরক্ত হয়ে উঠল?
মূল্যস্ফীতি
ফিরে এসেছে, আর ভোটাররা ট্রাম্পের
প্রধান নীতিগুলোর সাথে তাদের আর্থিক
উদ্বেগের সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। যেমন—শুল্ক নীতি,
এআই-এর ক্ষেত্রে শিথিল
নিয়ন্ত্রণ, কঠোর অভিবাসন নীতি
এবং বিশেষ করে ইরানের সাথে
যুদ্ধ।
নেভি
ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়নের প্রধান অর্থনীতিবিদ হেদার লং বলেন, “ইরানে
যুদ্ধ না থাকলে, এই
মধ্যবর্তী নির্বাচনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত।”
জীবনযাত্রার
ব্যয়
২০২১
সাল থেকে প্রায় সবকিছুর
দাম যে হারে বেড়েছে,
তার সাথে আমেরিকানরা এখনও
মানিয়ে উঠতে পারেনি।
জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরে মূল্যস্ফীতি
কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল, কিন্তু তা ভোটারদের ২০২৪
সালে ডেমোক্র্যাটদের আরেকটি সুযোগ দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল
না। আর জীবনযাত্রার উচ্চ
ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট সেই ক্ষোভ ট্রাম্পের
পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পুরো সময়জুড়ে আরও
তীব্র হয়েছে।
তবুও,
এই বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প এবং
রিপাবলিকানদের কাছে তুলে ধরার
মতো বেশ জোরালো অর্থনৈতিক
বয়ান ছিল।
•
জানুয়ারি
মাসে মার্কিন অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল ২০২৪
সালের পর সর্বোচ্চ।
•
১৪
মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো উৎপাদন খাতে
কর্মসংস্থান ইতিবাচক ধারায় ফিরে এসেছিল।
•
রিপাবলিকানদের
পাস করা ‘ওয়ান বিগ
বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’-এর
আওতায় বড় অঙ্কের কর
ফেরত মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হতে শুরু
করেছিল।
•
তিন
বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মর্টগেজ বা
গৃহঋণের সুদের হার ৬ শতাংশের
নিচে নেমে এসেছিল।
•
কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক শেয়ারগুলোর
কল্যাণে শেয়ারবাজার বারবার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছিল।
•
ভোক্তা
পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি, যা ২০২৫ সালের
এপ্রিলে চার বছরের সর্বনিম্ন
পর্যায়ে নেমেছিল, ২০২৬ সালের জানুয়ারি
ও ফেব্রুয়ারি মাসে আবারও সেই
নিম্নসীমার কাছাকাছি ফিরে আসে।
এরপরই
আমেরিকা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং সবকিছু
বদলে যায়।
তেলের
দাম বেড়ে চার বছরের
সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ডিজেলের দাম রেকর্ড গড়ে।
নির্বাচনের দিন জ্বালানি তেলের
দাম এর আগে কখনো
এত বেশি ছিল না।
আমেরিকানরা
হয়তো মূল্যস্ফীতি অপছন্দ করে, কিন্তু জ্বালানি
তেলের উচ্চমূল্য তাদের চরম ক্ষুব্ধ করে
তোলে। শহরের সর্বত্র বড় বড় বিলবোর্ডে
জ্বালানির দাম প্রদর্শিত থাকে;
আর গাড়ির ট্যাঙ্কে তেল ভরার সময়
তারা প্রতি সপ্তাহে বুঝতে পারে যে, তাদের
পকেট থেকে কতটা বাড়তি
অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরুর
পর থেকে কেবল জ্বালানি
তেলের উচ্চমূল্যের কারণেই প্রতিটি মার্কিন পরিবারের ওপর গড়ে ১,১৫০ ডলারের বাড়তি
খরচের বোঝা চেপেছে।
জ্বালানির
দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার
হার বেড়ে যায়, সেই
সঙ্গে বাড়তে থাকে মর্টগেজ ঋণের
সুদের হার—যা সাম্প্রতিক
সময়ে গত তিন বছরের
মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
টানা
তিন বছর ধরে মানুষের
আয় বৃদ্ধির হার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির
হারের চেয়ে বেশি ছিল,
কিন্তু মার্চ মাস থেকে সেই
ধারা উল্টে যায়। মূল্যস্ফীতি পুনরায়
বেড়ে যাওয়ায় তা শ্রমিকদের প্রকৃত
আয়ের ওপর আঘাত হানছে—ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে
সাধারণ আমেরিকানদের প্রকৃত আয় কমে গেছে।
ট্রাম্পকেই
দায়ী করছেন আমেরিকানরা
ট্রাম্পের
প্রথম মেয়াদে অর্থনীতি নিয়ে আমেরিকানদের মনে
ভালো স্মৃতি থাকাটা আশ্চর্যজনক নয়। ট্রাম্পের প্রথম
মেয়াদে (ট্রাম্প ১.০) আমেরিকানদের
কষ্টার্জিত ডলারের ক্রয়ক্ষমতা পণ্যের দামের তুলনায় বেশি ছিল—অর্থাৎ,
তাঁর প্রথম চার বছরের শাসনামলে
মানুষের আয়ের প্রবৃদ্ধির হার
মুদ্রাস্ফীতির হারের প্রায় দ্বিগুণ ছিল।
এ কারণেই ২০২৪ সালের অক্টোবরে
সিএনএন-এর জরিপে অংশ
নেওয়া আমেরিকানরা অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা
হ্যারিসের চেয়ে ট্রাম্পকে ১৫
শতাংশ পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে রেখেছিলেন। এতে অবাক হওয়ার
কিছু নেই; কারণ, বাইডেন
নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে
দাঁড়ানোর আগে সিএনএন-এর
সর্বশেষ জরিপে অর্থনীতি নিয়ে তাঁর নিট
অনুমোদনের হার ছিল -৩১
পয়েন্ট।
বর্তমানে
ট্রাম্পের অবস্থা বাইডেনের চেয়েও খারাপ। অক্টোবরে সিএনএন-এর জরিপ অনুযায়ী,
অর্থনীতি নিয়ে ট্রাম্পের নিট
অনুমোদনের হার -৪৬ পয়েন্ট,
যা বাইডেনের তুলনায় অনেক কম।
ট্রাম্পের
দ্বিতীয় মেয়াদ (ট্রাম্প ২.০) তাঁর
প্রথম মেয়াদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন
এক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। অনেক
আমেরিকান মনে করছেন, জীবনযাত্রার
ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং
‘আমেরিকান ড্রিম’ বা কাঙ্ক্ষিত জীবন
অর্জন করা এখন অসম্ভব
হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প
প্রশাসন এবং কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা
বর্তমানের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী
করছেন। তবে ট্রাম্পের কিছু
নীতি—বিশেষ করে তাঁর বিতর্কিত
পদক্ষেপগুলো—আমেরিকানদের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
শুধু
জ্বালানি তেলের দামই নয়—যার
কারণে মানুষের মাসিক ব্যয় প্রায় ৭৫
ডলার বেড়েছে—এর বাইরেও এমন
অনেক খরচ রয়েছে যা
ভোটাররা ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের সঙ্গে
যুক্ত বলে মনে করেন।
এর ফলে অনেকের মাসিক
খরচের বোঝা কয়েকশ ডলার
পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
যেমন:
•
‘অ্যাফোর্ডেবল
কেয়ার অ্যাক্ট’-এর আওতায় বর্ধিত
ভর্তুকি ২০২৫ সালের জন্য
অব্যাহত রাখতে রিপাবলিকানরা ব্যর্থ হওয়ায়, এ বছর ‘ওবামাকেয়ার’
-এর মাসিক প্রিমিয়াম গড়ে ৫৮ শতাংশ
বেড়েছে।
•
ট্রাম্পের
দ্বিতীয় মেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ ৮.৭
শতাংশ বেড়েছে। ট্রাম্প কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (এআই)-এর অবাধ প্রসারের
অন্যতম বড় সমর্থক।
•
ট্রাম্পের
অভিবাসন নীতি এবং শুল্ক
আরোপের কারণে গাড়ি মেরামতের খরচ
বেড়েছে; ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই
ব্যয় ১২.৩ শতাংশ
বৃদ্ধি পেয়েছে।
•
এছাড়া,
বাড়ি নির্মাণের খরচও ১৩.৩
শতাংশ বেড়ে গেছে।
•
ট্যাক্স
ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের
আরোপ করা শুল্কের কারণে
এ বছর গড় আমেরিকান
পরিবারের ওপর ৮২০ ডলারের
বাড়তি করের বোঝা চেপেছে।
ইউনিভার্সিটি
অফ শিকাগোর অর্থনীতিবিদ স্টিভেন ডারলাউফ, যিনি সম্পদের অসমতা
ও সামাজিক সচলতা (সোশ্যাল মোবিলিটি) নিয়ে গবেষণা করেন,
তিনি বলেন, “তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই
যে বাইডেন সবকিছু পুরোপুরি ভণ্ডুল করে দিয়েছেন, তবুও
তার মানে এই নয়
যে ট্রাম্প দায়মুক্ত হয়ে যান। ট্রাম্পের
আমলে মুদ্রাস্ফীতি অত্যন্ত বাজেভাবে সামলানো হয়েছে। ভোটারদের অবশ্যই এই পরিস্থিতির জন্য
প্রশাসনের নীতিগুলোকেই দায়ী করতে হবে।”
সব তথ্য-প্রমাণই ইঙ্গিত
দিচ্ছে যে ভোটাররা ঠিক
তা-ই করছেন। আর
এটিই একটি বড় কারণ,
যার ফলে মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী
নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় ধরনের বিপর্যয়ের
মুখে পড়েছে।
বিকল্পের
অভাব
মুদ্রাস্ফীতি
কেবল গল্পের একটি অংশ মাত্র।
অনেক আমেরিকানই মনে করেন যে
অর্থনীতি তাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গেছে।
এর পেছনে ‘কে-শেপড’বা
অসম অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি ভূমিকা রয়েছে:
যেসব আমেরিকান ধনী—যাদের শেয়ার
বাজারে বিনিয়োগ আছে বা যাদের
নিজস্ব বাড়ি রয়েছে—তারা
ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রভাব থেকে অনেকটাই সুরক্ষিত।
অন্যদিকে, যারা তুলনামূলক কম
স্বচ্ছল এবং যাদের জীবন
চলে কেবল মাসিক বেতনের
ওপর নির্ভর করে, তারা এই
ব্যয়ের চাপে ক্রমশ কোণঠাসা
হয়ে পড়ছেন।
সমস্যার
একটি বড় দিক হলো
‘আমেরিকান ড্রিম’ বা কাঙ্ক্ষিত জীবন
অর্জনের সুযোগের অভাব। শিশুযত্ন (চাইল্ডকেয়ার) সুবিধা এবং আবাসনের তীব্র
সংকট অনেক মানুষকে ক্রয়ক্ষমতার
বাইরে ঠেলে দিয়েছে, এমনকি
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেকে
প্রয়োজনীয় সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ডারলাউফ
বলেন, “মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রার আদর্শটি এখন ক্রমশ নাগালের
বাইরে চলে যাচ্ছে।”
চাকরির
বাজারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
যদিও বাজারটি এখনো মোটামুটি শক্তিশালী,
তবে মহামারি-পরবর্তী শুরুর বছরগুলোর মতো এখানে এখন
আর তেমন জোরালো গতি
নেই। যদিও ঢালাওভাবে কর্মী
ছাঁটাই এখনো নিয়মিত ঘটনা
হয়ে ওঠেনি, তবুও যাদের চাকরি
নেই, তাদের কাছে মনে হচ্ছে
যেন তারা শূন্যে আবেদন
পাঠিয়ে চলেছেন—যার কোনো সাড়া
পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
লং বলেন, “যে চাকরির বাজারে
কর্মী নিয়োগও কম, আবার ছাঁটাইও
কম—সেটিকে আসলে ‘সুযোগের অভাবযুক্ত’ চাকরির বাজার বলাই ভালো।”
বর্তমান
অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে অনেক আমেরিকানই যেন
এক জায়গায় আটকে পড়েছেন বলে
মনে করছেন।
সিএনএন