লাডলি খাতুন একটি হলুদ ব্যাগ থেকে একের পর এক নথিপত্র বের করছিলেন। তাঁর একটাই আশা—এর মধ্যে কোনো একটি হয়তো ভারতের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হবে।
বিশ্বের
বৃহত্তম এই গণতন্ত্র যখন
তাদের ভোটার তালিকা নতুন করে সাজাচ্ছে,
তখন খাতুনের মতো লাখ লাখ
মানুষ—যাঁরা অতীতে ভোট দিয়েছেন—তাঁদের
নাগরিকত্বের প্রমাণ নতুন করে জোগাড়
করতে হিমশিম খাচ্ছেন। সমালোচক ও বিরোধী দলগুলোর
মতে, এই প্রক্রিয়ার ফলে
বহু মানুষ ভোটাধিকার হারাতে পারেন। আর যাঁদের নাম
তালিকা থেকে বাদ দেওয়া
হচ্ছে, তাঁরা আশঙ্কা করছেন যে এর ফলে
তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়েই বড় ধরনের সংকট
তৈরি হতে পারে।
ভারতীয়
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং বিরোধী দলগুলোর
আদালতে জমা দেওয়া নথির
তথ্য অনুযায়ী, ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি
৩০ লাখের বেশি নাম বাদ
দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে মৃত
হিসেবে তালিকাভুক্ত মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৮০
লাখ।
নয়াদিল্লিতে
চলছে বিক্ষোভ। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছেন। তাঁদের
অভিযোগ, ভোটার তালিকা পুনর্গঠনের এই পুরো প্রক্রিয়াটি
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা
পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। ভারতের
নির্বাচন কমিশন—একটি সাংবিধানিক সংস্থা—কোনো ধরনের অনিয়মের
অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে যে,
এই সংশোধন প্রক্রিয়া আইন মেনেই করা
হচ্ছে।
এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের প্রমাণ করতে হচ্ছে যে,
তাঁরা—সরাসরি অথবা তাঁদের বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদি/নানা-নানির
মাধ্যমে—২০০২-০৩ সালের
ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। উল্লেখ্য, এর আগে সর্বশেষ
২০০২-০৩ সালেই এমন
কঠোর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল।
৩৯ বছর বয়সী খাতুনের
বয়স তখন ভোট দেওয়ার
মতো ছিল না। তাই
এখন তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে,
তাঁর বাবা-মা অথবা
দাদা-দাদি/নানা-নানির
মধ্যে অন্তত একজনের নাম সেই তালিকায়
ছিল। দিল্লির একটি বস্তিতে বসবাসকারী
খাতুন বলেন, “আমি যখন খুব
ছোট, তখনই আমার বাবা-মা মারা যান।
তাঁরা ছিলেন গরিব ও নিরক্ষর
মানুষ; কোনো নথিপত্রই রেখে
যাননি।”
খাতুনের
মতো অনেকেই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি
হয়েছেন। স্বচ্ছতা বিষয়ক কর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ বলেন, “এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে
বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, প্রান্তিক মানুষ এবং অতি দরিদ্ররা।
কারণ, তাঁদের পক্ষে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন।”
এর আগে ভারতের নির্বাচন
কমিশন বাড়ি বাড়ি গিয়ে
যোগ্য ভোটারদের তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
তাদের মূলমন্ত্র ছিল: “কোনো ভোটারই যেন
বাদ না পড়েন।” সমালোচকদের
মতে, এই প্রক্রিয়ার ফলে
“প্রমাণের দায়ভার” ভোটারদের ওপরই বর্তায়।
প্রাক্তন
নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা বলেন,
“এতদিন পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি গিয়ে
সরেজমিনে যাচাই করার পদ্ধতিই অনুসরণ
করা হতো। নির্ধারিত আইনি
প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার
পর, কাউকে নতুন করে আবার
নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে বলা—এমনটা
আগে কখনো ঘটেনি।”
সুরজমুখী—যিনি ৩০ বছর
ধরে যে বস্তিতে থাকতেন,
উচ্ছেদ অভিযানের ফলে সেটি ভেঙে
ফেলায় তিনি গৃহহীন হয়ে
পড়েছেন—তাঁর নাম দিল্লির
খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া
হয়েছে এবং তাঁকে ‘খুঁজে
পাওয়া যাচ্ছে না’ (untraceable) বলে চিহ্নিত করা
হয়েছে।
নিজের
ভেঙে পড়া ঘরের ধ্বংসস্তূপের
সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “২০০২
সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার মতো কোনো
নথিপত্র আমার কাছে নেই;
কারণ তখন আমি ভোটার
হিসেবে নিবন্ধিত ছিলাম না, আর আমার
বাবা-মাও অনেক আগেই
মারা গেছেন। অথচ এরপর আমি
বহুবার ভোট দিয়েছি—নির্বাচন
কমিশনের কর্মীরাই আমাদের বাড়িতে এসে আমাদের ভোটার
হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন। তাহলে হঠাৎ কী এমন
বদলে গেল?”
মাঠপর্যায়ে
কর্মরত কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন যে, এই প্রক্রিয়ার
কারণে দরিদ্র ভোটাররা নানা অসুবিধার সম্মুখীন
হচ্ছেন।
দিল্লির
উপকণ্ঠের একটি এলাকায় বুথ-পর্যায়ের কর্মকর্তা মুকেশ খান্না—যেখানে শ্রমজীবী অভিবাসীদের বড় একটি অংশ
বাস করে—বলেন, “যাঁরা
শিক্ষিত নন বা প্রযুক্তি
ব্যবহারে দক্ষ নন, তাঁদের
পক্ষে ২০০২ সালের ভোটার
তালিকার সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে দেখা মোটেও সহজ
কাজ নয়।”
ভোটারদের
সহায়তার জন্য বিশেষ ক্যাম্প
স্থাপন করা হয়েছে, তবুও
অনেকেই এই জটিল প্রক্রিয়াটি
সম্পন্ন করতে গিয়ে হিমশিম
খাচ্ছেন।
‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’
নির্বাচন কমিশন
স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ব্যবহার করে তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’—যেমন
নামের অমিল বা পারিবারিক তথ্যের অসামঞ্জস্য—শনাক্ত করার পর, লক্ষ লক্ষ মানুষের তথ্য
পুনরায় যাচাইয়ের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্বাধীন বিশ্লেষণে
দেখা গেছে, এর ফলে মুসলমানরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
দিল্লিতে ‘দ্য
হিন্দু’ পত্রিকার এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিহ্নিত ভোটারদের মধ্যে
প্রায় ২০ শতাংশই মুসলমান, অথচ মোট ভোটারের মধ্যে তাদের হার ১৩.৬ শতাংশ। কলকাতাভিত্তিক
নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবার ইনস্টিটিউট’-এর তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এই বৈষম্য
আরও প্রকট।
৪২ বছর বয়সী
পরিচ্ছন্নতাকর্মী শাহিদা একটি নোটিশ পেয়েছেন, কারণ তাঁর মায়ের সঙ্গে তাঁর বয়সের পার্থক্য
ছিল মাত্র ১৫ বছর—যেটিকে সফটওয়্যারটি ‘সন্দেহজনক’
হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তিনি বলেন,
“আমি এখন কী করব? অতীতে ফিরে গিয়ে আমার মৃত দাদা-দাদিকে জিজ্ঞেস করব, কেন তাঁরা আমার
মৃত মাকে এত অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন? বাস্তবতা হলো, সেই সময়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর
মধ্যে বাল্যবিবাহ একটি সাধারণ ঘটনা ছিল।”
জাতীয় পর্যায়ের
রাগবি খেলোয়াড় ও অভিনেতা আসলাম (২৪)—যিনি কেবল একটি নামই ব্যবহার করেন—জানান,
তাঁর ভোটার নিবন্ধনকে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ তাঁর
মৃত বাবার সঙ্গে আরও ছয় ব্যক্তির নাম যুক্ত ছিল।
ছয় ভাই-বোনের
পরিবারের সদস্য ও মুসলিম ধর্মাবলম্বী আসলাম বলেন, “এটি স্পষ্টতই এমন ভোটারদের লক্ষ্য
করে করা হয়েছে, যারা বিজেপিকে ভোট দেন না। মনে হচ্ছে, এর উদ্দেশ্য হলো এক শ্রেণির
‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’ তৈরি করা।”
মোদি নেতৃত্বাধীন
হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি, যারা ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়াটিকে জোরালো সমর্থন
দেয়, তারা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা নথিপত্রহীন
অভিবাসীরা—বিশেষ করে মুসলমানরা—কারসাজির মাধ্যমে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত
হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট
জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার অর্থই এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক।
তবে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে ভোটার
তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বাংলাদেশের নথিপত্রহীন অভিবাসী হিসেবে অভিযুক্ত করা
হয়েছে, তাদের আটক করা হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সীমান্ত পার করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
খাতুনের ক্ষেত্রে,
এমনিতেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এখন এমন পরিণতির আশঙ্কাও তাঁর ওপর
ভর করেছে।
তিনি বলেন,
“আমার কাছে যা কিছু নথিপত্র ছিল, তার সবই আমি জমা দিয়েছি। কিন্তু এরপরও যদি তারা আমাদের
দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলে, তবে কী হবে?”
এএফপি