নিয়ন্ত্রণহীন জ্বালানি সংকটের মুখে, ক্রমবর্ধমান মূল্যের প্রভাব থেকে জনগণকে রক্ষা করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রতি মাসে কয়েকশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থ ব্যয় করছে। আর, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে আসা এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় নতুন সরকারের সংস্কার পরিকল্পনাগুলো বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে। অথচ দেশের ভঙ্গুর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজানোর বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগের উপযোগী করে বিশাল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে—যারা বর্তমানে পুরোপুরি কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না—প্রশিক্ষিত তোলার মতো পর্যাপ্ত সময়ও সরকার এখনো পায়নি।
প্রধানমন্ত্রী
তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশকে এক
দশকের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নির্বাচিত
হয়েছেন।
২০২৪ সালে সাবেক
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পরবর্তী কঠিন মাসগুলোতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
দেশ পরিচালনা করেছিল। ১৫ বছরের দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অভিযোগে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন
গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
সমালোচকদের
মতে, ওই সময়ে হাসিনার ঘনিষ্ঠরা রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো থেকে অবাধে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে,
ব্যাংকগুলোকে মন্দ ঋণে জর্জরিত করেছে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে
ঠেলে দিয়েছে। একই সঙ্গে, দক্ষ প্রশাসকদের পরিবর্তে তার দল ‘আওয়ামী লীগ’-এর
অনুগত ব্যক্তিদের দিয়ে সরকারি প্রশাসনকে পূর্ণ করে ফেলা হয়েছিল।
তবে শেখ হাসিনার
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবারের সন্তান তারেক রহমান শপথ নেওয়ার মাত্র ১১ দিন পরই
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়, যার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়ে
ওঠে।
বাংলাদেশ গত
বছর তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ আমদানি করেছে। এই পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে
বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে, পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে এবং পরিবহন
থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য—সবকিছুরই ব্যয় বেড়ে গেছে।
ব্যাংককে অনুষ্ঠিত
আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সম্মেলনের ফাঁকে ‘দিস উইক ইন এশিয়া’-কে
দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমানের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “জ্বালানি
মানে কেবল তেল, গ্যাস বা সার কেনা নয়।”
তিনি আরও বলেন,
“এটি আমাদের নাগরিকদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি
মাসের শেষ থেকে এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হিসেবে আমরা প্রায় ৪ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন
ডলার খরচ করেছি।” বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ক্রমশ উত্তপ্ত
হতে থাকা বাংলাদেশে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির অভিঘাত কিছুটা হলেও কমানো
যেত।
তবে তিতুমীরের
মতে, “পূর্ববর্তী সরকার টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলেনি”;
এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিরই একটি উত্তরাধিকার।
বিশ্বব্যাংক
এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক—উভয়ই সরকারের জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা
কমাতে কয়েকশ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তা দিয়েছে।
প্রায় ১ ট্রিলিয়ন
মার্কিন ডলার ঋণ প্রদানের সক্ষমতা সম্পন্ন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৩
সাল থেকে বাংলাদেশকে প্রায় ৩.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান করেছে। এই ঋণের শর্তাবলি
নিয়ে বর্তমান সরকার এই সপ্তাহে ব্যাংককে নতুন করে আলোচনার আশা করছে।
তবে বাহ্যিক
চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল মঙ্গলবার ২০২৭ সালের জন্য বাংলাদেশের
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.২ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এর ফলে এশিয়ার
উন্নয়নশীল দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ এখন কম্বোডিয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে
ক্ষতিগ্রস্ত নেপালেরও পেছনে পড়ে গেছে।
সংস্থাটি ২০২৭
সালে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে, যা বর্তমানে
৮.৭ শতাংশ। তবে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যমতে, এই পূর্বাভাসগুলোতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান,
ঋণগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল হয়ে পড়া কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গৃহীত
কাঠামোগত সংস্কারের প্রভাব পুরোপুরি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
তিতুমীর বলেন,
“দুর্ভাগ্যবশত, পূর্ববর্তী শাসনামলের অপকর্মের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আমরা
ইতিমধ্যে পাঁচটি ব্যাংকের মালিকানা সরকারের অধীনে নিয়ে এসেছি... ব্যাংক থেকে আমানত
তুলে নেওয়ার (ব্যাংক রান) যে আশঙ্কা ছিল, তা এখন প্রশমিত হয়েছে। আমরা পুরো ব্যবস্থায়
শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চাই, যাতে পরবর্তীতে বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের জন্য অর্থায়ন করা
সম্ভব হয়।”
তিনি জানান,
ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি আসবে নতুন উৎপাদন শিল্প—যেমন ইলেকট্রনিক্স ও খেলনা—অবকাঠামো,
সৌরশক্তি, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নতুন বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের
মাধ্যমে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ বাংলাদেশের আনোয়ারায় অবস্থিত, চীনের অর্থায়নে ১.৩
বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি।
এছাড়া, বাংলাদেশের
রয়েছে তরুণ জনগোষ্ঠী এবং উৎপাদন শিল্পে—বিশেষ করে পোশাক শিল্পে—গভীর
অভিজ্ঞতা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় যেসব কোম্পানি অন্যত্র
সরে যেতে চাইছে, তাদের জন্য বাংলাদেশ একটি উপযুক্ত গন্তব্য হতে পারে, কারণ এখানে সুলভ
শ্রমশক্তি সহজলভ্য। তবে প্রশ্ন থেকেই যায় যে, এআই-এর বিপ্লব—যা
বর্তমানে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় চালিকাশক্তি—তাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি,
দক্ষতা ও অবকাঠামো বাংলাদেশ কীভাবে অর্জন করবে।
এই সপ্তাহে
ব্যাংককে আইএমএফ-এর দেওয়া বার্তায় বিশ্ব অর্থনীতির এক দ্বিমুখী চিত্র ফুটে উঠেছে: একদিকে
রয়েছে আকাশচুম্বী জ্বালানি মূল্যের চাপে জর্জরিত অর্থনীতি, আর অন্যদিকে রয়েছে এআই ও
এর সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন শিল্পখাতে—যেমন ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর এবং
প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড—ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ফলে গতিপ্রাপ্ত
অর্থনীতি।
বুধবার আইএমএফ-এর
ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, “সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা?
নিম্ন আয়ের দেশগুলো। বিশেষ করে সেই সব দেশ, যারা জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল অথবা
যারা প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সুফল থেকে বঞ্চিত।”
তিনি এশিয়াকে
‘বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন’ হিসেবে অভিহিত করলেও, জ্বালানি সংকটে
আক্রান্ত দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, রাজনৈতিক চাপে পড়ে ঢালাও ভর্তুকি দেওয়ার
প্রলোভন এড়িয়ে তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সাথে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা উচিত।
তিনি সরকারগুলোর
প্রতি পরামর্শ দিয়ে বলেন, “প্রথমে নিজেদের সুরক্ষা বলয় ও আর্থিক সক্ষমতা (ফিসকাল স্পেস)
বজায় রাখুন। সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য কেবল সাময়িক ও সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রদান
করুন।”
দক্ষিণ এশিয়ার
দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
ফেব্রুয়ারির
নির্বাচনে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে
রহমান নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে শেখ হাসিনার শাসনামলের ভয়াবহ
অভিজ্ঞতার পর, এখনকার জনগণ দ্রুত পরিবর্তনের প্রত্যাশায় অধীর হয়ে আছে।
দক্ষিণ এশিয়ার
এই দেশটির সংক্ষিপ্ত অথচ উত্তাল ইতিহাসের বড় একটি সময়জুড়ে ক্ষমতা আবর্তিত হয়েছে রহমান
পরিবার এবং হাসিনা পরিবারের মধ্যে।
৫৭ বছর বয়সী
তারেক রহমান দীর্ঘ সময় লন্ডনে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে এবারের নির্বাচনে
জয়লাভ করেন। এর আগে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন
সরকার দায়িত্ব পালন করে, যারা ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পতনের পরবর্তী বিশৃঙ্খল
ও সহিংস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কঠিন দায়িত্বটি পালন করেছিল। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও
পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা তিতুমীর যোগ করেন, “আমরা অতীতেও কাজ করে দেখিয়েছি।”
তিনি উল্লেখ করেন যে, রহমানের “রাজনৈতিক অনুমোদন” তাঁর প্রশাসনকে সংস্কারের জন্য একটি
স্পষ্ট ম্যান্ডেট বা জনরায় দিয়েছে।
তারেক রহমানের
মা খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন
করেছেন। স্বাধীনতার প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হাসিনার সঙ্গে কয়েক দশক ধরে চলা
ক্ষমতার লড়াইয়ের সময়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে বেশ কয়েকবার কারাবন্দি হতে
হয়েছিল।
খালেদা জিয়া
গত বছর মারা যান। তাঁর স্বামী, সাবেক সেনাপ্রধান ও যুদ্ধবীর জিয়াউর রহমান পাঁচ বছর
দেশ পরিচালনার পর ১৯৮১ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ