অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে, ভারত অরুণাচল প্রদেশে আড়াই হাজারেরও বেশি নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করেছে। পূর্ব হিমালয়ের এই রাজ্যটি চীনের সীমান্তে অবস্থিত এবং বেইজিং এখানকার প্রায় ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের বলে দাবি করে।
এর ঠিক আগেই ভারত-চীন সীমান্ত পাহারায়
নিয়োজিত ‘ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশ’-এর একজন শীর্ষ
কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন যে, অরুণাচল প্রদেশের
বেশ কয়েকটি স্থানে ভারতীয় ও চীনা বাহিনীর
মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান বা উত্তেজনা চলছে
এবং তা এখনো অব্যাহত
রয়েছে।
তবে
অরুণাচলে এই বাড়তি সেনা
মোতায়েনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার কোনো সম্পর্ক নেই।
ভারতীয়
ভূখণ্ডে চীনের কথিত অনুপ্রবেশের ঘটনাগুলো
বেশ কয়েক মাস ধরেই
অরুণাচলের সুশীল সমাজের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এর পাশাপাশি, চীনের
সীমান্তবর্তী রাজ্যের আরেকটি অংশে স্থানীয়দের বিরোধিতার
কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সেখানে
একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন
স্থানীয়রা; অথচ ভারত মনে
করে, একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত
নদীর ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ
মোকাবিলায় এই প্রকল্পটি অত্যন্ত
জরুরি।
সিয়াং
নদীর ওপর বিশাল বাঁধ
নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আদি ও গালো
উপজাতির মানুষ ২৩ অক্টোবর শান্তিপূর্ণ
ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিলেন।
তবে
পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস
ব্যবহার করলে বেশ কয়েকটি
জায়গায় বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। এ
সময় একটি থানা, কিছু
সরকারি কার্যালয় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র
মোদির দল ভারতীয় জনতা
পার্টির (বিজেপি)—যারা কেন্দ্র ও
অরুণাচল প্রদেশ—উভয় জায়গাতেই জোট
সরকারের নেতৃত্বে রয়েছে—এমন কয়েকজন নেতার
বাসভবনে ভাঙচুর চালানো হয়। কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভের
মূল আয়োজকদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা
দায়ের করেছে।
চলমান
এই বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘আপার সিয়াং মাল্টিপারপাস
স্টোরেজ প্রজেক্ট’। এটি ১১
হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার
একটি জলবিদ্যুৎ ও পানি সংরক্ষণ
প্রকল্প, যা ভারত অরুণাচল
প্রদেশের আপার সিয়াং জেলায়
সিয়াং নদীর ওপর নির্মাণের
পরিকল্পনা করেছে।
সিয়াং
নদীটি চীনের তিব্বত অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়েছে,
যেখানে এটি ‘ইয়ারলুং সাংপো’
নামে পরিচিত। বেইজিং এই নদীর ওপরই—অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশের ঠিক আগে—মেদোগ
নামক স্থানে ৬০ হাজার মেগাওয়াট
ক্ষমতার একটি বিশাল জলবিদ্যুৎ
প্রকল্প নির্মাণ করছে। অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশের পর এই নদীটিই
‘সিয়াং’ নামে পরিচিত। এরপর
নদীটি ব্রহ্মপুত্র নামে আসামের মধ্য
দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ
করে এবং শেষ পর্যন্ত
বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে।
সিয়াং
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে অরুণাচলবাসীর প্রতিরোধ নতুন কিছু নয়;
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে
এই প্রকল্পের বিরোধিতা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক
মাসগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং বিজেপি নেতারা
বারবার এই প্রকল্পটিকে জাতীয়
স্বার্থসংশ্লিষ্ট বলে তুলে ধরেছেন,
কারণ এটি সিয়াং নদীর
জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে।
অথচ,
এমন এক সময়ে এই
প্রতিবাদ নতুন করে তীব্র
হয়ে উঠেছে, যখন চীনা বাহিনীর
সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের কারণে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর ফলে ভারতের একেবারে
পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশ বহুমুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ভারতীয়
কর্তৃপক্ষ সিয়াং প্রকল্পটিকে কেবল জল ও
জ্বালানি নিরাপত্তা কিংবা বন্যা নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং চীনের
উজানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর বিপরীতে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ
হিসেবেও উপস্থাপন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা
হয়েছে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পরই কেবল চূড়ান্ত
সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে
স্থানীয় আদি জনগোষ্ঠীর মানুষ
এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন; তাদের আশঙ্কা, এর ফলে তাদের
পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি তলিয়ে যেতে পারে, মানুষ
বাস্তুচ্যুত হতে পারে এবং
পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
হিমবাহ হ্রদের বিস্ফোরণজনিত বন্যার কারণে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার
ঘটনা—যেমন ২০২৩ সালে
সিকিমে ঘটেছিল এবং যা বিপর্যয়কর
প্রভাব ফেলেছিল—তাদের এই উদ্বেগকে আরও
বাড়িয়ে দিয়েছে।
সর্বশেষ
‘প্রি-ফিজিিবলিটি রিপোর্ট’ বা প্রাক-সম্ভাব্যতা
প্রতিবেদনের জন্য জরিপ কাজ
শুরু হওয়াটা এই প্রতিবাদের নতুন
কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর
মাসে অরুণাচল প্রদেশ মন্ত্রিসভা জরিপ সংক্রান্ত কার্যক্রম
সমন্বয় করতে এবং স্থানীয়
বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনার সুবিধার্থে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি
গঠনের অনুমোদন দেয়। গ্রামীণ উন্নয়ন
মন্ত্রী ওজিং তাসিং-এর
নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে
স্থানীয় দুই বিজেপি বিধায়ক—আলো লিবাং এবং
ওনি পান্যাং—অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
এই প্রাক-সম্ভাব্যতা জরিপে কারিগরি উপযোগিতা, জলবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব এবং সামগ্রিক প্রভাবগুলো
মূল্যায়ন করা হয়। যদি
প্রতিবেদনে প্রকল্পটি বাস্তবায়নযোগ্য বলে বিবেচিত হয়,
তবে সরকারকে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (DPR) তৈরি, পরিবেশ ও বন বিষয়ক
ছাড়পত্র সংগ্রহ, সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং গণশুনানির আয়োজন
করতে হবে।
‘সিয়াং
ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরাম’ এবং অন্যান্য স্থানীয়
সংগঠনগুলো প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কার্যক্রম—যার মধ্যে খননকাজও
অন্তর্ভুক্ত—তার বিরোধিতা করেছে।
তাদের দাবি, যেকোনো ধরনের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম শুরুর আগেই স্থানীয় বাসিন্দাদের
কাছ থেকে তাদের পূর্ব-সম্মতি নিতে হবে। তাদের
হিসাব অনুযায়ী, বাঁধটি নির্মিত হলে ২৭টি গ্রাম
পুরোপুরি তলিয়ে যেতে পারে এবং
বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন।
আদি
উপজাতি গোষ্ঠীর মানুষের কাছে তাদের পৈতৃক
ভূমি, কৃষিকাজ, নদীর ওপর নির্ভরশীল
জীবন-জীবিকা এবং সিয়াং নদীর
সঙ্গে তাদের ঐতিহ্যগত সম্পর্ক—সবই অবিচ্ছেদ্য। আর
এ কারণেই তারা নিজেদের পৈতৃক
ভূমি ছেড়ে অন্যত্র সরে
যেতে রাজি নন। তাদের
মতে, এমনকি তাদের বিশ্বতত্ত্ব এবং বিশ্বাস ব্যবস্থাও
তাদের ভূমি, বন ও নদীর
সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। একটি বিশাল
বাঁধ তাদের ভূ-প্রকৃতি, অর্থনীতি
এবং সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাকে এমনভাবে বদলে দেবে, যা
আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে
আনা সম্ভব হবে না। এছাড়া,
এই অঞ্চলটি পরিবেশগত ও ভূতাত্ত্বিক দিক
থেকেও অত্যন্ত নাজুক।
আদি
সম্প্রদায়ের আইনজীবী এবং এই আন্দোলনের
অন্যতম প্রধান মুখ ইবো মিলি
অভিযোগ করেন, “সমীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিরাপত্তা বাহিনী
মোতায়েন করাটা উদ্বেগের নিরসন করার পরিবর্তে বরং
অবিশ্বাসের মাত্রাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”
পুলিশ তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের
সঙ্গে সম্পর্কিত সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে
একাধিক মামলা দায়ের করেছে।
১৩ অক্টোবর, আন্দোলনকারীরা প্রশাসনের কাছে একটি স্মারকলিপি
ও আল্টিমেটাম জমা দেন। এতে
প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত গ্রামবাসীদের ওপর প্রশাসন ও
পুলিশের বাড়াবাড়ি বা নির্যাতনের বিষয়ে
উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
প্রশাসনের
দেওয়া জবাবে সন্তুষ্ট হতে না পেরে
‘আদি বানে কেবাং ইউনাইটেড’,
‘সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মার্স ফোরাম’-এর যুব শাখা,
‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট
অ্যাফেক্টেড এরিয়া ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশন’ এবং
‘আদি গালো ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’-সহ বেশ কয়েকটি
সংগঠন ২৩ অক্টোবর সিয়াং,
আপার সিয়াং ও ইস্ট সিয়াং
জেলায় ১২ ঘণ্টার ধর্মঘটের
ডাক দেয়। ওই দিন
বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় বিধায়ক
ওনি পানইয়াং-এর বাসভবনে ভাঙচুর
চালানো হয়; এছাড়া পুলিশের
কয়েকটি গাড়ি ও সরকারি
দপ্তরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর
আরও অনেকগুলো পুলিশি মামলা দায়ের করা হয় এবং
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার
করা হয়। ৩০ অক্টোবর
পর্যন্ত বাঁধ নির্মাণের সম্ভাব্য
এলাকাটির আশপাশের গ্রামগুলোতে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
এই প্রকল্পটি চীনের বাঁধের বিপরীতে একটি উপযুক্ত পদক্ষেপ
কি না, তা নিয়ে
বিতর্ক সম্ভবত চলতেই থাকবে। তবে স্থানীয়দের অনেকেই
কোনো বাঁধই চান না। তারা
চায় সিয়াং নদীটি যেন অক্ষত থাকে।
তাদের মতে, চীনা প্রকল্পটি
সিয়াং নদীর জলপ্রবাহে খুব
একটা ব্যাঘাত ঘটাবে না, কারণ নদীটির
জলের প্রধান উৎস প্রস্তাবিত চীনা
বাঁধের ভাটির দিকে অবস্থিত।
তবে
আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে: জাতীয়
নিরাপত্তার যুক্তিতে যে প্রকল্পের কিছুটা
যৌক্তিকতা খোঁজা হচ্ছে, তা কি সেই
জনগোষ্ঠীর আস্থা ও অর্থবহ অংশগ্রহণ
ছাড়া এগিয়ে নেওয়া যাবে—যাদের ওপর
এই প্রকল্পের বোঝা পড়ার আশঙ্কা
রয়েছে?
দ্য ডিপ্লোম্যাট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ