গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে আসছে। তবে মঙ্গলবারের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ায়, প্রশ্ন জাগছে—ইসলামাবাদ কি শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষগুলোর একটি হবে?

প্রথমত, ট্রাম্পের ব্যবসায়িক লেনদেনগুলোর ওপর নজরদারি নিশ্চিতভাবেই বাড়বে, যা বিদেশে নতুন কোনো চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে তাঁর প্রশাসনের সক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পাশাপাশি এই সপ্তাহে পাকিস্তানে আলোচনার একটি বড় বিষয় হলো—করাচির কাছে পোর্ট কাসিমে মার্কিন কোম্পানিগুলোর একটি কনসোর্টিয়ামের ৪.৪ বিলিয়ন ডলারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রকল্পের প্রস্তাব। এটি হবে পাকিস্তানের প্রথম এলএনজি সংরক্ষণ কেন্দ্র, যা দেশটিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা থেকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে।

এই প্রস্তাবের আওতায় রয়েছে একটি বড় আকারের সংরক্ষণ টার্মিনাল এবং পরবর্তীতে ৬৮০ মাইল দীর্ঘ সরবরাহ পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা। এই উদ্যোগটির পেছনে রয়েছে ইউএস ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি, ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশন এবং এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট ব্যাংক অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস।

প্রস্তাবিত এই এলএনজি প্রকল্পে ওয়াশিংটনের সমর্থন এটাই প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের কতটা পরিবর্তন ঘটেছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অনেকটা শীতল হয়ে পড়েছিল; এর বড় কারণ ছিল, ওয়াশিংটন দীর্ঘকাল ধরে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে আসছিল।

ট্রাম্প প্রশাসন এই দৃষ্টিভঙ্গিকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং ট্রাম্প প্রায়শই দেশটির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। যদিও সন্ত্রাসবাদ দমনের বিষয়টি এখনো সম্পর্কের একটি অংশ হিসেবে রয়েছে, তবে ওয়াশিংটন এখন ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলোর ওপর বেশি জোর দিচ্ছে।

বিশেষ করে, পাকিস্তান যেসব গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পদের অধিকারী, সেগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া, দেশটি যেন জ্বালানিসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্য আরও বেশি পরিমাণে আমদানি করে, সে বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র চাপ প্রয়োগ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পাকিস্তান প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপরিশোধিত তেলের চালান গ্রহণ করে। ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের সঙ্গে বাণিজ্যের পথে থাকা বাধাগুলো দূর করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে; এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রপ্তানির ওপর দুই বছর ধরে থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেও সফল হয়নি, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সম্পদের প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখানোয় তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। গত বছর ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসলামাবাদ ওয়াশিংটনকে আরব সাগরে একটি বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনার প্রস্তাবও দিয়েছিল। (পাকিস্তান অবশ্য প্রকাশ্যে এটি অস্বীকার করেছে।)

প্রস্তাবিত এলএনজি প্রকল্পটি পাকিস্তানে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম উচ্চাভিলাষী বাণিজ্যিক উদ্যোগ হতে পারে, যা সম্ভবত দেশটির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে আসা পরিবর্তনের একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে এই পরিবর্তন কতটা টেকসই হবে—বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষাপটে—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যিক মনোযোগ মূলত রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত খেয়াল এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অর্থনৈতিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। কিন্তু এই ধারা ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর (যা আর দুই বছর বাকি) আর টিকে থাকবে না। এছাড়া, জানুয়ারি থেকে কংগ্রেস ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে আসায় এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

এই সপ্তাহে পাকিস্তানের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলাপচারিতায় ট্রাম্প যুগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে এক ধরনের কৌতূহল ও উদ্বেগের মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে যেমন তারা বুঝতে চাইছে যে সম্পর্কটি এত দ্রুত কীভাবে উন্নত হলো, অন্যদিকে ট্রাম্পের অনিশ্চিত আচরণের কারণে এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না—তা নিয়েও তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের জয় এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

এই উদ্বেগগুলো যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জকেই সামনে নিয়ে আসে: কীভাবে এমন একটি শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা যায়, যা উভয় দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বাইরের যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে টিকে থাকতে পারবে?

এর আগে ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের বিষয়ে একটি নীতি ঘোষণা করেছিল। তখন দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক নতুন কৌশলের আওতায় ইসলামাবাদের প্রতি কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। এটি স্পষ্ট যে, যদিও অনানুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান বিষয়ক নীতি পুনর্বিবেচনা ও নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে, তবুও আনুষ্ঠানিকভাবে এই নীতি পর্যালোচনার সময় অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।

ফরেন পলিসি