আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর নামে পরিচিত পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে দুই মাস ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পরিস্থিতি চরমে ওঠে এবং বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে তা প্রাণঘাতী রূপ নেয়। এই উত্তেজনা বৃদ্ধি স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে, যা তিন ধাপে ২৭শে জুলাই থেকে ১০ই আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এই সংকট কতটা
গভীর তা কিছুদিন আগেও ঠিক বুঝা যাচ্ছিল না। জুন মাসে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়,
যার ফলে তথ্যের ঘাটতি দেখা দেয় এবং যারা এই শূন্যস্থান পূরণে আগ্রহী তারা এর সুযোগ নেয়। সংকটকে অতিরঞ্জিত করে দেখাতে সরকারি বিরোধীরা কাশ্মীরের রাস্তায় গণহত্যার ভুয়া ভিডিও পোস্ট করে।
অস্থিরতা নিয়ে সংবাদ পরিবেশনের জন্য হুমকির সম্মুখীন হওয়ায় পাকিস্তানি গণমাধ্যমগুলো তাদের প্রতিবেদন মূলত নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে। তবে, এই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক সংবাদদাতারা এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছেন এবং বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছেন। খবরটি ভালো নয়—এবং এটি পাকিস্তান জুড়ে সরকারের প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জাক)। ২০২৩ সালে গঠিত এই কমিটি প্রথমদিকে খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে সোচ্চার হয়। এরপর কমিটি তাদের কার্যক্রমের পরিধি বাড়িয়েছে এবং এই বছর তারা একটি সাংবিধানিক ধারা বাতিলের আহ্বান জানাতে শুরু করেছে। ওই
ধারায় বলা হয়েছে যে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের আইনসভার ১২টি আসন ভারত-শাসিত কাশ্মীরের শরণার্থীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।
জাক-এর যুক্তি হলো, যেহেতু এই শরণার্থীরা আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে বাস করে না,
তাই পাকিস্তানি রাজনীতিবিদরা নিজেদের স্বার্থে এই আসনগুলোকে ব্যবহার করছেন। অঞ্চলের সরকার এবং সর্বোচ্চ আদালত উভয়েই জাক -এর দাবি প্রত্যাখ্যান করার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
জুনের শুরুতে জাক রাজধানী মুজাফফারাবাদ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ পদযাত্রার ঘোষণা দেয়। তখন
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এর কিছু নেতাকে গ্রেপ্তার করে এবং দলটিকে নিষিদ্ধ করে। এরপর জাক সদস্যরা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং দলটি সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় অঞ্চলটির বেশিরভাগ অংশ স্থবির হয়ে পড়ে।
জুন মাস জুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল এবং গত সপ্তাহে নির্বাচনের সময় তা আবার শুরু হয়। মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। তবে
বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী জুন মাস থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। এই সপ্তাহে,
বিবিসি এমন কিছু পরিবারের সাথে কথা বলেছে যারা জানিয়েছে যে বিক্ষোভ করার সময় তাদের প্রিয়জনদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জোর দিয়ে বলছে যে জাক একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং শুধুমাত্র সহিংস বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধেই শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
পাকিস্তানে দুর্বল শাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সর্বশেষ কেন্দ্রবিন্দু হলো কাশ্মীর। গত কয়েক বছরে, বেলুচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে মানুষ রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। দেশের বিভিন্ন অংশে বিক্ষোভকারীরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কারাবাসের নিন্দা জানিয়েছে এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে তাদের দৃষ্টিতে কারচুপিপূর্ণ বলে নিন্দা করেছে।
এখন, পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে,
জাক এবং অন্যান্য বিক্ষোভকারীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। তারা জোর দিয়ে বলেছে যে,
তাদের এই লড়াই শুধু সাংবিধানিক সংস্কার নয়,
বরং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং সস্তা বিদ্যুতের মতো বৃহত্তর দাবির জন্য।
যদি এই বিচ্ছিন্ন আন্দোলনগুলো একত্রিত হতে পারে, তবে পাকিস্তানই হতে পারে পরবর্তী দক্ষিণ এশীয় দেশ যেখানে পরিবর্তনের জন্য একটি ব্যাপক প্রতিবাদ আন্দোলন সংঘটিত হবে। কিন্তু এর সামাজিক বিভাজন এবং দমনমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে এমনটা ঘটার সম্ভাবনা কম,
কারণ এই পরিবেশ গণসংহতির সক্ষমতাকে সীমিত করে।
তবুও, কাশ্মীরের সংকট দ্রুত সমাধান করার জন্য পাকিস্তানের জাতীয় নেতৃত্বের একটি শক্তিশালী প্রেরণা রয়েছে। তারা চায় বিশ্ব যেন কাশ্মীরে ইসলামাবাদের কঠোর কৌশলের দিকে নয়,
বরং ইরান যুদ্ধে দেশটির মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার দিকে মনোযোগ দেয়। কাশ্মীরের মর্যাদা নিয়ে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বিরোধের কারণে,
এটি পাকিস্তানের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল সম্পদও বটে। এর নেতারা প্রায়শই একে দেশের
“জুগুলার ভেইন” বলে থাকেন।
শান্তিপূর্ণভাবে সংকটের অবসান ঘটাতে সংলাপের প্রয়োজন হবে—কিন্তু যেহেতু আবেগ এখন তুঙ্গে,
তাই আপাতত তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।
ফরেন পলিসি থেকে অনুদিত