যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি আলোচনা অচলাবস্থার মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোতে “অনির্দিষ্টকালের” নৌ অবরোধ এবং ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছে।
তবে,
বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের ভেতরে ভয়াবহ পরিস্থিতির খবর পাওয়ার পর
এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেনভ লিঙ্কনের নাবিকদের জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়ার
চেষ্টার বিবরণও পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এছাড়া,
হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের “পূর্ণ
নিয়ন্ত্রণ” রয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ
জলপথটি যুদ্ধ শুরুর পরপরই মার্চের শুরুতে ইরান বন্ধ করে
দিয়েছিল—এই সপ্তাহে মাত্র
কয়েকটি জাহাজ তা দিয়ে যেতে
পেরেছে।
ইরানের
পারস্য উপসাগরীয় প্রণালী কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ) বুধবার এক্স-এ পোস্ট
করেছে, “মার্কিন কর্মকর্তাদের এই দাবি এবং
বারবার করা পোস্ট যে
হরমুজ প্রণালী আর অবরুদ্ধ নয়,
তা বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে না।”
“হরমুজ
প্রণালী অবরুদ্ধ রয়েছে এবং ইরানের শর্তগুলো
মেনে না নেওয়া পর্যন্ত
এটি পুনরায় খোলা হবে না,”
এতে আরও বলা হয়েছে।
মার্কিন
নৌবাহিনী কি দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারবে?
ট্রাম্প
প্রশাসন দাবি করেছে যে,
উপসাগরে তাদের নৌবাহিনীর ওপর চাপ কমাতে
তারা পর্যায়ক্রমে জাহাজ আনা-নেওয়া করবে।
জানা গেছে, বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরে থাকা বিমানবাহী রণতরী
ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের
দিকে যাত্রা শুরু করেছে।
কিন্তু
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসাগরে অবস্থানরত জাহাজগুলো বিরতি ছাড়াই ইতোমধ্যেই সেখানে অনেক দীর্ঘ সময়
ধরে রয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন নৌ কর্মকর্তা এবং
কৌশলগত উপদেষ্টা সংস্থা ‘দ্য কিলওয়েন গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান হারলান
উলম্যান বলেছেন, ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন কতটা জটিল ও
উন্নত একটি জাহাজ, তা
বিবেচনা করে বন্দরে এর
নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন।
উলম্যান
আল জাজিরাকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উন্নত
প্রযুক্তি সচল রাখতে জাহাজগুলোর
স্থলে পরিচর্যা প্রয়োজন। উলম্যান বলেন, “জাহাজগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তিচালিত
রণতরীর মতো অত্যন্ত জটিল
ও উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থাযুক্ত জাহাজগুলোর। এমন কিছু বিষয়
আছে যা সমুদ্রে থাকাকালীন
রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব নয়।”
“সমুদ্রে
অনেক কিছুই করা যায়, কিন্তু
তার চেয়েও অনেক বেশি কাজ
আছে যা শুধুমাত্র বন্দরেই
করা সম্ভব,” তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি
বলেন যে, ইউএসএস আব্রাহাম
লিঙ্কনের নয় মাসের মতো
দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েন “জাহাজটি যত বেশি দিন
সমুদ্রে থাকে, ততই এর প্রস্তুতি
ও সক্ষমতা হ্রাস করে এবং এর
মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের মেয়াদ
বাড়ানোর ক্ষমতা কমে যায়”।
তিনি
আরও বলেন যে, ট্রাম্প
প্রশাসনকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে নৌ-প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার
দিতে হবে। তিনি বলেন,
“এটি একটি জাতীয় বিষয়,
স্থানীয় নয়; এবং প্রশাসনের
এতটা রক্ষণাত্মক হওয়া উচিত নয়। তাদের
বলা উচিত, ‘ঠিক আছে, আমরা
দেখব কী ঘটছে, এবং
তারপর যদি কোনো সমস্যা
দেখা দেয়, আমরা তার সমাধান
করব’।”
ইরান
কি তার বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ সহ্য করতে পারবে?
যুক্তরাষ্ট্র
তার নৌ-অবরোধ বহাল
রেখে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার আশা
করছে।
ট্রাম্প
ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সামরিক অভিযানে
ফেরার চেয়ে তেহরানের অর্থনীতিকে চাপের মুখে ফেলাই তার
কাছে শ্রেয়। এমন খবরও প্রকাশিত
হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক
অস্ত্রশস্ত্র কমে আসছে, যদিও
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এই বিষয়টি অস্বীকার
করেছেন।
ইরানের
বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল প্রসঙ্গে ৯ই
আগস্ট সংবাদ ওয়েবসাইট অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প
বলেন, “আমরা বিষয়টি হালকাভাবে
নিচ্ছি।”
পরের
দিন, ট্রাম্প দাবি করেন যে
ইরান আর্থিকভাবে “খুবই খারাপ অবস্থায়”
আছে। তিনি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি
এবং সৈন্যদের বেতন দিতে অসুবিধার
কথা উল্লেখ করেন এবং এর
জন্য চলমান মার্কিন নৌ অবরোধকে কৃতিত্ব
দেন।
এই মার্কিন অবরোধ তেহরানের আয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস—অপরিশোধিত তেলকে—সংকুচিত করেছে। ১৩ই এপ্রিল এই
অবরোধ শুরু হওয়ার পর
থেকে ইরান তেল রাজস্ব
বাবদ ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৬ বিলিয়ন ডলার
হারিয়েছে বলে জানা গেছে।
তেহরান এই অবরোধকে “জলদস্যুতার
কাজ” বলে অভিহিত করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবির চেয়ে ইরান যে আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তার একাধিক
কারণ আছে।
ইন্টারন্যাশনাল
ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলের ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর আলী
ভায়েজ বলেছেন: “ইরান মার্কিন নৌ সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করে অথবা [ইয়েমেনের] হুথিদের
আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির ওপর চাপ বাড়াতে উসকানি দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে
তুলতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “তেহরানের হিসাব হলো, ওয়াশিংটনের সঙ্গে
প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় যুক্তরাষ্ট্রই প্রথমে সরে গেছে – এবং এবারও যে ভিন্ন কিছু
ঘটবে, এমনটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ তারা দেখছে না।”
পর্যবেক্ষকরা
উল্লেখ করেছেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে
ট্রাম্প বেশ কয়েকবার তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েও শেষ মুহূর্তে
পিছু হটেছেন।
বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, উপরন্তু, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ একটি বড় দর কষাকষির হাতিয়ার।
ইরান বারবার বলেছে যে, মার্কিন নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের সম্পদ অবমুক্ত
না করা পর্যন্ত তারা এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পুনরায় খুলবে না।
বৃহস্পতিবার,
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর নেভির কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী আজমায়ী
বলেছেন: “আমাদের সম্পূর্ণ এবং সকল গতিবিধির উপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ। তাসনিম সংবাদ
সংস্থার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই প্রণালীতে আইআরজিসি নৌবাহিনীর যোদ্ধাদের চোখ এড়ায়
না কোনো গতিবিধি।”
তেহরানের ইউনিভার্সিটি
অফ অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম বলেছেন, ইরান
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাচ্ছে বলে মনে
করে।
খোশচেশম আল
জাজিরাকে বলেন, “ইরান জানে যে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে হলে অপ্রতিসম যুদ্ধ করতে
হবে, এবং এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে হরমুজ প্রণালী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
অধ্যাপক আরও
বলেন, ইরান এও আশা করছে যে যুক্তরাষ্ট্র কেবল “পরাজয় স্বীকার করে এই অঞ্চল ছেড়ে চলে
যাবে”।
আরেকটি দিক
হলো, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন সামরিক সম্পদ, অবকাঠামো এবং জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে
হামলা চালিয়ে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে।
কাতারের জর্জটাউন
ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা এই সপ্তাহে আল জাজিরাকে বলেন:
“আমরা যা দেখেছি তা হলো, ইরানিরা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে।”
আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং কুয়েতের
মতো দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা, যাতে তারাও পাল্টাভাবে ইরানের সাথে আলোচনার জন্য
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।”
কামরাভা আরও
বলেন যে, ইরানের ওপর মার্কিন অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর হবে কিনা সে বিষয়ে তিনি সন্দিহান,
বিশেষ করে যেহেতু ইরানের নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের মতো একই ধরনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক
চাপের মধ্যে নেই।
“তেহরান প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আছে, কিন্তু আমাদের
মনে রাখতে হবে যে ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আদতে খুবই দমনমূলক। যারা সরাসরি সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করেন, তারা মধ্যবিত্তদের দুর্দশার বিষয়ে চিন্তা করেন না,” তিনি বলেন।
“তারা ক্ষমতায় থাকতে চায়,” তিনি যোগ করেন। “তাই এই মুহূর্তে
এই কৌশলটি কাজ করবে কিনা সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।”
আল-জাজিরা