সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হচ্ছে একের পর এক গোপন তথ্য। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা (এয়ার ডিফেন্স) ব্যবস্থায় অস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন ছেপে চলেছে আমেরিকার নামি-দামি গণমাধ্যম। আর তাতেই চটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাংবাদিকদের কাছে তথ্যফাঁসের নেপথ্যে ‘সর্ষের মধ্যেই ভূত’ রয়েছে, বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে তাঁর।

সেই তদন্তের অংশ হিসেবে মার্কিন সেনার সদস্যদের কয়েক জনকে সত্যতা যাচাইয়ের পরীক্ষার সামনে দাঁড় করানো হয়েছে বলে সূত্রের খবর। নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট স্টাফ পদমর্যাদার প্রায় ৫০ জন অফিসারকে পলিগ্রাফ পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে ইরান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাস্ত্রের ঘাটতির বিবরণও ছিল। ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং অস্ত্র ঘাটতির উদ্বেগজনক চিত্রও উঠে এসেছে প্রতিবেদনগুলিতে। মার্কিন অস্ত্রের ঘাটতির খবর সামনে আসায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প ও তাঁর পারিষদেরা।

ইরান যুদ্ধের মধ্যে অস্ত্রের ঘাটতির খবরের পর ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক বাহিনীর মধ্যে ‘বিশ্বাসঘাতকদের’ সন্ধান আরও জোরদার করেছে। ৫০ জন সামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পলিগ্রাফ পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁরা সাংবাদিকদের কাছে কোনও গোপনীয় তথ্য পাচার করেছেন কি না তা ধরার জন্য পলিগ্রাফ যন্ত্রের সামনে বসতে হয়েছে অর্ধশত সেনা আধিকারিককে।

সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হওয়া তথ্য ও বিভিন্ন মার্কিন কর্মকর্তার সূত্রে সারা দুনিয়া জেনে গিয়েছে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ উন্নত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ মজুত উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গিয়েছে বলে প্রতিবেদনগুলিতে দাবি করা হয়েছে।

বিশেষ করে ‘আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম’ বা এটিএসিএমএস। নতুন প্রজন্মের প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত প্রায় শেষের দিকে পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ও থাডে়র এর মতো প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও যুদ্ধের আগে তুলনায় অনেক কমেছে।

রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের টোম্যাহকের মজুতেরও উল্লেখযোগ্য অংশ ইরানকে করতে ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন কম্যান্ডারেরা। ইরান যুদ্ধে টমাহক ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষার ইন্টারসেপ্টর রকেট বিপুল পরিমাণে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর প্রতিটির আনুমানিক দাম ১০-৩০ লক্ষ ডলার। অন্যদিকে, মাত্র ৮-১০ লক্ষ ডলার খরচ করে এক একটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে ইরান।

মার্কিন সেনাকর্তাদের একাংশ মনে করেন, লড়াই না থামলে অচিরেই ইহুদি ও আমেরিকার অস্ত্রভাণ্ডারে টান পড়তে শুরু করবে। পেন্টাগনের অস্ত্রাগারের দশার খবর প্রকাশ্যে চলে আসায় সিঁদুরে মেঘ দেখছে ওয়াশিংটন। কারণ পশ্চিম এশিয়ার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমার খবর ছড়িয়ে পড়ার অর্থ চিন এবং রাশিয়ার মতো মহাশক্তিধর দেশগুলির পোয়াবারো।

ফাঁস হওয়া তথ্যের উৎস খুঁজে বার করতে সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন মার্কিন গোয়েন্দারা। সন্দেহভাজন সেনাকর্তারা গণমাধ্যমের কোনও সদস্যের সঙ্গে গোপন বা সংবেদনশীল তথ্য ভাগ করেছেন কি না তা জানতে চান তদন্তকারী কর্মকর্তারা। পাশাপাশি, ইরান যুদ্ধের জেরে মার্কিন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া সংক্রান্ত কোনও তথ্য তাঁরা প্রকাশ করেছেন কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন করা হয় তাঁদের।

জয়েন্ট স্টাফের সংশ্লিষ্ট দফতরের অধীনে বর্তমানে প্রায় দেড় থেকে ২ হাজার সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কারী কাঠামো হল জয়েন্ট স্টাফ। এই সংস্থার প্রধান কাজ হল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মোতায়েন মার্কিন সামরিক কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখা।

সামরিক অভিযান পরিচালনা, প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণ, সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির পরিকল্পনা এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে কৌশলগত সমন্বয়ে জয়েন্ট স্টাফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা, অস্ত্রের মজুত, যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং চলমান অভিযানের গোপন তথ্যের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এখান থেকে কোনও তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

এঁদের মধ্যে ৫০ জন কর্মকর্তাকে বেছে বেছে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেই তদন্ত সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, ‘‘এই বিভাগ অভ্যন্তরীণ কর্মী বা তদন্ত-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনও মন্তব্য করে না। তবে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক গোপনীয় তথ্য ফাঁস হওয়ার ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং সেই অনুযায়ী তদন্ত চালায়।”

তবে এই তদন্তের উদ্দেশ্য শুধু তথ্যফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা এমনটা নয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত প্রাক্তন সেনাকর্তাদের মতে, এর মাধ্যমে অন্যান্য সামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছেও একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। গোপনীয় সামরিক তথ্য ফাঁস করলে গুরুতর পরিণতির মুখোমুখি হতে পারেন সেনাসদস্যেরা।

ফাঁস হওয়া এ সব তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মজুত কমে যাওয়ার খবরকে গুরুত্ব না দেওয়ার চেষ্টা করলেও ঘটনাটি যে ঘটেছে তা স্বীকার করেছেন তিনি। ঘরে-বাইরে চাপের মুখে নির্দিষ্ট ধরনের অস্ত্রের মজুত সীমিত হয়ে পড়েছে এ কথা অস্বীকার করতে পারেনি মার্কিন সরকার।

এই পরিস্থিতিতে জয়েন্ট স্টাফের প্রায় ৫০ জন সদস্যকে পলিগ্রাফ বা তথাকথিত ‘লাই ডিটেক্টর’ পরীক্ষার আওতায় আনার সিদ্ধান্তকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন সামরিক বিশেষজ্ঞেরা। কারণ, এত বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের এ ভাবে তদন্তের আওতায় আনা সাধারণ ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই পদক্ষেপটি শুধু সম্ভাব্য তথ্য ফাঁসকারীকেই শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং সংবেদনশীল সামরিক তথ্য গণমাধ্যম বা অননুমোদিত ব্যক্তিদের কাছে প্রকাশের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তাও দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মোকাবিলায় ইরানি বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের কৌশল নিয়ে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তাঁদের মতে, তেহরানের সামরিক কৌশলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল তুলনামূলক ভাবে কম খরচের উদ্ভাবনী অস্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের অত্যন্ত ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জামকে লক্ষ্যবস্তু করা।

বিশ্লেষকদের দাবি, ‘কম খরচে বেশি ক্ষতি’ করার এই কৌশল পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রচলিত সামরিক হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে। কোটি কোটি ডলারের উন্নত অস্ত্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপেক্ষাকৃত সস্তা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য অসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে ইরান প্রতিপক্ষের উপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।