সামরিক সরঞ্জাম আমদানির নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের দিকে মনযোগ দেওয়ার অংশ হিসেবে, ড্রোন তৈরির মাধ্যমে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে তুরস্ক ও চীনের সাথে অংশীদারিত্বের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।
ড্রোন
উৎপাদনের এই প্রচেষ্টায় নেতৃত্বদানকারী
বাংলাদেশ বিমান বাহিনী উত্তরাঞ্চলীয় শহর বগুড়ায় একটি
প্রস্তাবিত বিমান ঘাঁটির পাশাপাশি একটি ‘আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকেল’ (ইউএভি) বা ড্রোন উৎপাদন
কারখানা স্থাপনের জন্য একটি তুর্কি
প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে
তুলেছে।
গত জুলাই
মাসে এই যৌথ উদ্যোগের
ঘোষণা দেওয়া হলেও, বাংলাদেশ এ বিষয়ে খুব
কম তথ্যই প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—অংশীদার প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, বিনিয়োগের পরিমাণ, মালিকানা কাঠামো, উৎপাদন সক্ষমতা, বাস্তবায়নের সময়সীমা কিংবা কী ধরনের ড্রোন
তৈরি করা হবে—এর
কোনোটিই বিস্তারিত জানানো হয়নি।
বাংলাদেশ
সশস্ত্র বাহিনী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তুরস্ক দূতাবাসকে
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এই যৌথ উদ্যোগের ঘোষণার
আগে, গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশ
বিমান বাহিনী এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত
প্রতিষ্ঠান ‘সিইটিসি ইন্টারন্যাশনাল’-এর মধ্যে বগুড়াতেই
একটি ড্রোন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা
স্থাপনের বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে এই প্রকল্পের লক্ষ্য
হলো বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে ‘মিডিয়াম অল্টিটিউড লং এনডিউরেন্স’ (মাঝারি
উচ্চতায় দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম)
এবং ‘ভার্টিক্যাল টেক-অফ অ্যান্ড
ল্যান্ডিং’ (উল্লম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণকারী) ড্রোন
তৈরি ও সংযোজনে সক্ষম করে তোলা। এই প্রকল্পের
ফলে বিমান বাহিনী ভবিষ্যতে নিজস্ব ড্রোন উদ্ভাবন ও উৎপাদন করতে
সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
সে সময় এক বিবৃতিতে
বিমান বাহিনী জানায় যে এর আওতায় প্রযুক্তি হস্তান্তর, সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্প-দক্ষতা উন্নয়ন এবং যৌথ কারিগরি
সহযোগিতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা ড্রোন উৎপাদনে
দীর্ঘমেয়াদী স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়তা করবে।
সামগ্রিকভাবে
এই দুটি উদ্যোগ ইঙ্গিত
দেয় যে, বাংলাদেশ বিচ্ছিন্নভাবে
কোনো সরঞ্জাম কেনার প্রকল্পের পরিবর্তে একটি নিজস্ব ড্রোন
শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করছে। এছাড়া এগুলো ৮৬০ বিলিয়ন টাকার
(৬.৯ বিলিয়ন ডলার)
বিশাল সামরিক আধুনিকায়ন প্রকল্পের অংশ, যা গত
জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক
রহমান ঘোষণা করেছিলেন। এই প্রকল্পের আওতায়
রয়েছে জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্প নীতি, প্রতিরক্ষা শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সামরিক বাহিনী,
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে
নিবিড় সহযোগিতা। এতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের
জন্য ড্রোন প্রযুক্তি, সেন্সর, ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য উন্নত
প্রতিরক্ষা সরঞ্জামকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল
ক্রাইসিস গ্রুপের বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিষয়ক
পরামর্শক টমাস কিন বলেন,
চীন ও তুরস্ক—উভয়
দেশের সাথেই এই সহযোগিতা কোনো
বিস্ময়কর বিষয় নয়। কারণ,
বাংলাদেশের বৃহত্তম অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের ভূমিকা রয়েছে এবং প্রতিরক্ষা বাজারে,
বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তির
ক্ষেত্রে আঙ্কারার উপস্থিতি ক্রমশ বাড়ছে।
কিন
বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, বাংলাদেশ কেবল
পুরো সিস্টেম আমদানির গণ্ডি পেরিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প-ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা
করছে।”
তিনি
উল্লেখ করেন যে, তুরস্কের
প্রস্তাবের তুলনায় চীনের প্রকল্পটি অধিকতর উন্নত বলে মনে হলেও,
উভয় উদ্যোগই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর ইচ্ছার প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের
মতে, ড্রোন উৎপাদনের প্রতি বাংলাদেশের আগ্রহ যুদ্ধের বিবর্তিত রূপকেই তুলে ধরে। কারণ
ইউক্রেন ও মিয়ানমার থেকে
শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত
বিভিন্ন সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তুলনামূলক কম খরচের আনম্যানড
সিস্টেম (চালকবিহীন আকাশযান) ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কিন
বলেন, “যেমন: যুদ্ধবিমানের তুলনায় ড্রোন তৈরি করা অনেক
সস্তা, তাই নিজস্ব প্রযুক্তিতে উৎপাদনের (লোকালাইজেশন) ক্ষেত্রে এটি বাংলাদেশের জন্য
একটি স্বাভাবিক ও উপযুক্ত ক্ষেত্র।”
তিনি
আরও যোগ করেন যে,
যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও ড্রোন সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সমুদ্রসীমা পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অনুসন্ধান ও
উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করতে পারে।
প্রতিরক্ষা
বিশ্লেষক ও লিবিয়ায় নিযুক্ত
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো.
শহীদুল হক বলেন, এই
প্রকল্পগুলোকে পররাষ্ট্রনীতির কোনো পরিবর্তন হিসেবে
না দেখে বরং বাংলাদেশের
সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবেই দেখা
উচিত। আপনি যদি লিবিয়া, এরপর
ইউক্রেন এবং বর্তমানের মধ্যপ্রাচ্যের
সংঘাতগুলোর দিকে তাকান, তবে
একটি প্রধান প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে ড্রোন ও ইউএভি-এর
ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টিই স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
বিশ্লেষকদের
মতে, এই অংশীদারিত্ব থেকে
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কতটা
উপকৃত হবে, তা মূলত
নির্ভর করবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের
মাত্রার ওপর। তারেক রহমান শুধু
এটুকু বলেছেন যে, জাতীয় প্রতিরক্ষা
সক্ষমতা জোরদার করা, বিদেশি সরবরাহকারীদের
ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বনির্ভরতা
অর্জনের লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে সরকার
"বিভিন্ন উদ্যোগ" গ্রহণ করেছে।
কিন
বলেন, এই প্রকল্পগুলো তখনই
দীর্ঘস্থায়ী সুফল বয়ে আনবে
যদি বাংলাদেশ এমন উৎপাদন-সংক্রান্ত
কারিগরি জ্ঞান অর্জন করতে পারে যা
সামরিক ও বেসামরিক—উভয়
খাতেই কাজে লাগানো সম্ভব।
তা নাহলে, এমন ঝুঁকি থেকে
যায় যে দেশটি কেবল
বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রাংশ
জোড়া লাগানোর (অ্যাসেম্বল করার) কাজই করে যাবে,
অথচ মূল প্রযুক্তি ও
মেধাস্বত্ব বিদেশের হাতেই থেকে যাবে।
তিনি
বলেন, "সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সুফল অনেক
সীমিত হবে।"
শহীদুল
হক এই দুটি প্রকল্পকে
প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম আমদানির পরিবর্তে তা দেশীয়ভাবে উৎপাদনের
দিকে সরে আসার একটি
বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, যদিও নতুন সক্ষমতা
কাজে লাগিয়ে নিজেদের সামরিক চাহিদা মেটানোই হওয়া উচিত বাংলাদেশের
তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার, তবে চূড়ান্ত সাফল্য
নির্ভর করবে বিদেশি বাজারের
জন্য প্রতিযোগিতামূলক পণ্য তৈরির সক্ষমতার
ওপর।
তার মতে,
"আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর চাহিদার চেয়ে বেশি উৎপাদন
করলে আমাদের তা রপ্তানি করতে
হবে। অন্যথায়, উৎপাদন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে
পড়বে।"
নিক্কেই
এশিয়া থেকে অনূদিত