প্রধানত নারী ও মেয়েদের প্রতি তাদের আচরণের কারণে তালেবানকে তর্কসাপেক্ষে বিশ্বের সবচেয়ে নৃশংস শাসনব্যবস্থা বলা যেতে পারে। এই গোষ্ঠী সন্ত্রাসীদেরও আশ্রয় দেয় এবং এর নেতারা নিষেধাজ্ঞার শিকার ও বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। শুধুমাত্র রাশিয়া এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২০২১
সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা
প্রত্যাহারের পর থেকে দেশের শাসক
হওয়ার চেয়ে যুদ্ধবাজ হিসেবে বেশি পরিচিত
তালেবানদের উপর এমন এক
দীর্ঘস্থায়ী দুর্বল অর্থনীতি পরিচালনার দায়িত্ব এসে পড়েছে যা
দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি সহায়তার
অভাবের মধ্যেও টিকে আছে।
তাই,
আজ তালেবান শাসনকে বিস্ময়করভাবে স্থিতিশীল হিসেবে গণ্য করা যেতে
পারে—যদিও তা নৃশংস
উপায়ে অর্জিত।
প্রথমত,
গোষ্ঠীটি তার রাজনৈতিক অস্তিত্বের
জন্য কোনো প্রকৃত হুমকির
সম্মুখীন হয়নি। এটা ঠিক যে,
ইসলামিক স্টেটের স্থানীয় শাখা ইসলামিক স্টেট-খোরাসান (আইএস-কে) বারবার
তালেবানকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। কিন্তু তাতে এই গোষ্ঠীর শক্তি কমেনি বরং এটি আরও
ভয়াবহ এক বিকল্পের চিত্র
তুলে ধরেছে।
কিছু
কিছু জরিপ থেকে ইংগিত পাওয়া যায়
যে নিরাপত্তার উন্নতি হয়েছে। ২০২১ সালের আগস্ট
থেকে আফগানিস্তানে আর যুদ্ধ নেই, যেমনটা
বিগত চার দশক ধরে
ছিল। আইএস-কে-র
বিরুদ্ধে তালেবানের অভিযানের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
সন্ত্রাসী হামলাও কমেছে। এর মানে এই
নয় যে আফগানিস্তান নিরাপদ—বিশেষ করে নারী, ধর্মীয়
সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী এবং যারা তালেবানের কাছ থেকে হুমকি পেয়েছে বা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। কিন্তু সংঘাত-বিধ্বস্ত অবস্থার চেয়ে এটি এখন বেশি
স্থিতিশীল।
উপরন্তু,
কয়েক দশকের সংঘাত, বৈচিত্র্যময় বেসরকারি খাতের অনুপস্থিতি, ব্যাপকভাবে হ্রাসপ্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তা, একাধিক মানবিক সংকট এবং বৈশ্বিক
অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে দুর্বল হয়ে পড়া আফগানিস্তানের অর্থনীতি—অনেক
পর্যবেক্ষকের মতে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফল করেছে।
বিশ্বব্যাংক চলতি বছরের শুরুতে
ভবিষ্যদ্বানী করেছিল যে
দেশটির প্রকৃত বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৫ শতাংশ হবে।
এর আংশিক কারণ হলো শুল্ক
ও কর আদায়ের মাধ্যমে
রাজস্ব আয়ে তালেবানের সাফল্য
এবং আফগানিস্তানের মধ্য এশীয় প্রতিবেশী
দেশগুলোর সাথে তাদের শক্তিশালী
বাণিজ্য।
তালেবান
হয়তো বিচ্ছিন্ন, কিন্তু দলটি ১৯৯০-এর
দশকের মতো বিশ্বের একঘরে
হয়ে পড়া কোন শক্তি
নয়। প্রায় ২০টি দেশ এখনও
কাবুলে কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বজায় রেখেছে এবং
তালেবান কূটনীতিকরা এশিয়ার অনেক রাজধানীতে স্থান পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা
সরকারগুলো পর্যায়ক্রমে দলটির সাথে বৈঠক করেছে।
আফগানিস্তানের অনেক প্রতিবেশীর সাথে
তালেবানের ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক
রয়েছে।
এমনকি
তালেবানকে ২০২৪ সালের জাতিসংঘ
জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনের মতো বড় বড়
বৈশ্বিক অনুষ্ঠানেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের
হয়তো তালেবান শাসনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই,
কিন্তু তারা তালেবান শাসনকে
একটি বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েছে।
এরপরও মনে হচ্ছে
যে আগামী পাঁচ বছর দলটির
জন্য ততটা সহজ হবে
না।
তালেবানের সাবেক
এক সামরিক কর্মকর্তা সামি সাদাত চলতি
আগস্ট মাসের শুরুতে
তার ‘আফগানিস্তান ইউনাইটেড ফ্রন্ট’র মাধ্যমে কাবুল সরকারের বিরুদ্ধে একটি নতুন সশস্ত্র
অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। বাহ্যিক পৃষ্ঠপোষকতা
ছাড়া সাদাতের আন্দোলনকে সংগ্রাম করতে হবে। কিন্তু
চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা জীবনযাত্রার মান আরও খারাপ
করে দিলে আফগানদের এই সংগঠনে যোগ দিতে উজ্জীবিত
করতে পারে।
আইএস-কে নির্মূল করা সহজ হচ্ছে না। প্রবল প্রতিকূল
পরিবেশে এর টিকে থাকার সুখ্যাতি আছে। এরা
এক সপ্তাহ আগে কাবুলের
একটি স্কুলের কাছে গ্রেনেড হামলা
করে। এলাকায় শিয়া সংখ্যালঘু
জনগোষ্ঠীর বাস। এতে মনে হয় আইএস-কে বা এর সহযোগীরা পুনরায়
মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।
তাছাড়া, তালেবানের
একসময়ের পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তানের সাথে উত্তেজনা প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ
নিতে পারে। পাকিস্তান তালেবানকে পাকিস্তান-বিরোধী জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করে
এবং গত এক বছরে আফগানিস্তানের
সীমান্ত অতিক্রম করে বেশ কয়েক
দফা হামলা চালিয়েছে।
ক্রমবর্ধমান
বাহ্যিক চ্যালেঞ্জগুলো তালেবানের ওপর অভ্যন্তরীণভাবে আরও
চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাঝেমধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উপদলগুলোর মধ্যকার
বিভেদকে আরও বাড়িয়ে তোলার
ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ফরেন পলিসি থেকে অনুদিত