ভারতের সামরিক আধুনিকায়ন প্রচেষ্টায় একটি বড় সমস্যা রয়েছে। একদিকে কর্মকর্তারা নতুন নতুন অস্ত্রের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অনুমোদন দিয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে দেশটির অ্যারোস্পেস বা বিমানশিল্প খাত বহু বছর আগে অর্ডার করা বিমানগুলো সরবরাহ করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

এই ঘাটতি দেশটির শিল্প সক্ষমতা, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা চাপের মুখে সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে নানা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

গত ২৬ অক্টোবর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সভাপতিত্বে ভারতের ‘ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল’ (প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদ) সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রায় ২.১২ ট্রিলিয়ন রুপি (২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) মূল্যের বিভিন্ন প্রস্তাবের বিপরীতে ‘প্রয়োজনীয়তার অনুমোদন’ দিয়েছে।

এই প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে হেলিকপ্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র এবং নজরদারি সরঞ্জাম। প্রস্তাবিত সংগ্রহের প্রায় ৮২ শতাংশই ভারতীয় শিল্প খাত থেকে আসার কথা রয়েছে।

এগুলো মূলত নীতিগত অনুমোদন; কোনো চূড়ান্ত চুক্তি বা ইতিমধ্যে ব্যয় করা অর্থ নয়। এছাড়া, দেশীয় সংগ্রহের এই লক্ষ্যের মধ্যে প্রতিটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ঠিক কী পরিমাণ উপাদান প্রকৃতপক্ষে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই।

এই ঘোষণা ভারতের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণের দৃঢ় সংকল্পকে তুলে ধরলেও, এর আর্থিক মূল্য থেকে এটি স্পষ্ট নয় যে, এই সামরিক সরঞ্জামগুলো ঠিক কবে নাগাদ কার্যকরভাবে ব্যবহারের উপযোগী হবে। বিদ্যমান দুটি অ্যারোস্পেস কর্মসূচিই এর কারণ ব্যাখ্যা করে।

সি২৯৫ পরিবহন বিমান: উৎপাদন বিষয়ক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তব পরিস্থিতি

টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমস ও এয়ারবাসের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সি২৯৫ কর্মসূচিটি এমন একটি উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল সামরিক বিমান আমদানির পরিবর্তে ভারতে সেগুলো তৈরি করা।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত ২১,৯৩৫ কোটি রুপি (২.৩ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের এই চুক্তিতে ৫৬টি পরিবহন বিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি স্পেন থেকে সরবরাহ করা হয়েছে এবং বাকি ৪০টি ভারতে তৈরি ও সংযোজন করার কথা। ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ভদোদরায় উদ্বোধন করা চূড়ান্ত সংযোজন কেন্দ্রটি সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ভারতে সংযোজিত প্রথম বিমানটি এই বছরের মে মাসে কারখানার বাইরে আনা হয় এবং ১০ জুন এটি তার প্রথম উড্ডয়ন সম্পন্ন করে। তবে, উৎপাদনকালীন পরীক্ষার সময় কারিগরি সমস্যা দেখা দেওয়ায় সেপ্টেম্বর মাসে বিমানটি হস্তান্তরের যে পরিকল্পনা ছিল, তা পিছিয়ে যায়। এয়ার চিফ মার্শাল এ.পি. সিং অক্টোবরে জানান যে, এই সমস্যাগুলো সমাধান করতে আরও এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।

এই বাধা সত্ত্বেও, সি২৯৫ কর্মসূচির কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে দেশে বিমান সংযোজন লাইন তৈরি করা এবং সরবরাহকারীদের একটি ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। তবে একটি বিমান সম্পূর্ণ করা, তার প্রথম উড্ডয়ন সম্পন্ন করা, সামরিক বাহিনীর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করা এবং সেটিকে কার্যকরভাবে পরিষেবায় যুক্ত করা—এগুলো প্রতিটিই আলাদা আলাদা মাইলফলক।

চুক্তি স্বাক্ষরের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও, ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষ নাগাদ ভারতে সংযোজিত প্রথম সি২৯৫ বিমানটি ভারতীয় বিমান বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি।

তেজস যুদ্ধবিমানে ইন্টিগ্রেশন বা সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা

হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডের তেজস এমকে-১এ কর্মসূচির সীমাবদ্ধতাগুলো আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত প্রায় ৪৬,৮৯৮ কোটি রুপি (৪.৯৪ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ে ৮৩টি যুদ্ধবিমান—যার মধ্যে ৭৩টি একক আসনের যুদ্ধবিমান এবং ১০টি প্রশিক্ষণ বিমান—অর্ডার করেছিল। ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে এগুলোর সরবরাহ শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু এই বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ভারতীয় বিমান বাহিনী একটি বিমানও হাতে পায়নি।

এই বিলম্ব কেবল উৎপাদন প্রক্রিয়ার সমস্যাকেই নয়, বরং আরও গভীর কিছু জটিলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। জিই অ্যারোস্পেসের এফ৪০৪ ইঞ্জিন সরবরাহে দেরি হয়েছে; পাশাপাশি রাডার ইন্টিগ্রেশন, সফটওয়্যার যাচাইকরণ এবং অস্ত্রশস্ত্রের সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়াও থমকে আছে।

৭ অক্টোবর পর্যন্ত জিই মোট ১৪টি ইঞ্জিন সরবরাহ করেছে। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স জানিয়েছে যে, সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ ২৭টি এয়ারফ্রেম (বিমানের কাঠামো) প্রস্তুত ছিল, কিন্তু ইন্টিগ্রেশন ও পরীক্ষার অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর কারণে সেগুলো হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। এর আগে ৪০টি তেজস এমকে-১ বিমানের যে অর্ডার ছিল, তা সম্পন্ন হতে প্রায় এক দশক সময় লেগেছে—যা চুক্তিতে নির্ধারিত সময়সীমার চেয়ে অনেক বেশি।

সি২৯৫ কর্মসূচির সাথে এর পার্থক্যটি বেশ স্পষ্ট। সি২৯৫ কর্মসূচির মাধ্যমে মূলত এটি যাচাই করা হচ্ছে যে, ভারত লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে, সরবরাহকারীদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে এবং প্রয়োজনীয় সনদ সংগ্রহের কাজগুলো সম্পন্ন করতে সক্ষম কি না।

অন্যদিকে, তেজস কর্মসূচির ক্ষেত্রে একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানে ইঞ্জিন, সেন্সর, অস্ত্রশস্ত্র এবং সফটওয়্যারকে সমন্বিত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সুতরাং, কেবল দেশে বিমান সংযোজন করার সক্ষমতা থাকলেই যে প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা বা কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রস্তুতি অর্জিত হয়ে যায়, তা কিন্তু নয়।

এই বিলম্ব এমন এক সময়ে ঘটছে যখন পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটপূর্ণ। ভারতের যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কমে প্রায় ২৯ স্কোয়াড্রনে নেমে এসেছে, অথচ অনুমোদিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২.৫ স্কোয়াড্রন। চীনের ক্রমবর্ধমান মহাকাশ ও বিমান সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের ক্রমাগত যুদ্ধবিমান আধুনিকায়ন ভারতের বিমানশক্তি পরিকল্পনাকারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে—বিশেষ করে যখন পুরোনো বিমানগুলো অবসরের পথে রয়েছে।

কথা নয়, প্রয়োজন সরঞ্জাম

উভয় কর্মসূচিই উৎপাদন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা, বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং সরবরাহের সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।

ভারতের ‘কাবেরি’ ইঞ্জিন কর্মসূচিটি সমস্যার গভীরতা বুঝিয়ে দেয়। কয়েক দশকের গবেষণার ফলে প্রোটোটাইপ ইঞ্জিন তৈরি হয়েছে, উড্ডয়ন পরীক্ষার অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতিও হয়েছে; কিন্তু এখনো এমন কোনো ইঞ্জিন তৈরি হয়নি যা কার্যকর ‘তেজস’ বিমানবহরকে সচল রাখতে পারে।

এই পরিস্থিতির সমাধানে কেবল নতুন কেনাকাটার ঘোষণা যথেষ্ট নয়। চুক্তিতে যন্ত্রাংশ সরবরাহ, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, সনদপত্র অর্জন এবং সামরিক বাহিনীর কাছে গ্রহণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য মাইলফলক নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি, বিদেশি ইঞ্জিন সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তিতে কঠোর সরবরাহ প্রতিশ্রুতি, বাস্তবসম্মত সময়সূচি এবং কোনো বিঘ্ন ঘটলে বিকল্প পরিকল্পনার (ব্যাকআপ প্ল্যান) ব্যবস্থা থাকতে হবে।

নিয়মিত প্রকাশ্য প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত—কতগুলো বিমান সংযোজিত হয়েছে, কতগুলো পরীক্ষার পর্যায়ে আছে, কতগুলো বিমান বিমানবাহিনী গ্রহণ করেছে এবং কতগুলো প্রকৃতপক্ষে কার্যকর সেবায় নিয়োজিত রয়েছে। এতে নীতিনির্ধারকরা উৎপাদনের ঘোষণাকে প্রস্তুতির প্রমাণ হিসেবে না দেখে বরং কোথায় বাধা বা সমস্যা রয়েছে, তা শনাক্ত করতে পারবেন।

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, বিদেশি সরবরাহকারী, সনদ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ এবং সামরিক ব্যবহারকারীদের মধ্যে আরও নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন; কারণ কেবল জরিমানার ভয় দেখিয়ে প্রকৌশলগত বা সমন্বয়জনিত ত্রুটি দূর করা সম্ভব নয়।

ভারতের ক্রমবর্ধমান সরবরাহকারী ভিত্তি এবং মহাকাশ ও বিমান অবকাঠামো আত্মনির্ভরশীলতার পথে একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এর কৌশলগত গুরুত্ব নির্ভর করবে সনদপ্রাপ্ত বিমান এবং গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ নিয়মিতভাবে সরবরাহ করার সক্ষমতার ওপর।

২৬ অক্টোবরের অনুমোদনগুলো সামরিক বাহিনীর প্রকৃত চাহিদাকেই তুলে ধরে। তবে এগুলো শেষ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সক্ষমতায় রূপান্তরিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে ভারতের ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের শিল্পগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কতটা কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য সামরিক সক্ষমতায় রূপান্তর করতে পারে তার ওপর।

নয়াদিল্লির জন্য আত্মনির্ভরশীলতার প্রকৃত পরীক্ষাটি বিলিয়ন ডলারের চুক্তি অনুমোদন বা নতুন কারখানা উদ্বোধনের মাধ্যমে নয়, বরং ঠিক সময়ে কতগুলো কার্যকর বিমান সরবরাহ করা হলো—তার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

এশিয়া টাইমস, ইংরেজি থেকে অনুবাদ