জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে (৪ জুলাই) আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’-এ যোগ দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, “রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের স্মরণে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই কর্মসূচি শহীদদের প্রতি উৎসর্গীকৃত।” জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। এটি ছিল ৩৬ দিনব্যাপী গণবিক্ষোভ, যা প্রাথমিকভাবে সিভিল সার্ভিস কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এবং পরে দ্রুত একটি দেশব্যাপী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেয়। যার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির মাধ্যমে। সেদিনই তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
বেশ
কয়েকজন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, পুলিশ
কর্মকর্তা, হাইকোর্টের বিচারপতি, আমলা, সামরিক কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী আরো
অনেকে হয় বিদেশে পালিয়ে
যান অথবা দেশেই আত্মগোপন
করেন। জুলাই বিপ্লবের পর গত ২৪
মাসে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ও গণ-সহিংসতার
কারণে বাংলাদেশ ব্যাপক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে।
নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের
প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চলতি বছরের ১২
ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের
নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায়
আসে। বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী
প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ক্ষমতায় এসে
বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি
জানায়, যার মাধ্যমে তারা
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির গণভোটের ফলাফল কার্যকর করতে অস্বীকার করে।
গণভোটটি ছিল জুলাই জাতীয়
সনদের অনুমোদন সংক্রান্ত। প্রায় ৬৮ শতাংশ মানুষ
‘হ্যাঁ’ ভোট দেয়, যা
শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের রাজনৈতিক ম্যান্ডেট দেয় এবং সংসদকে
সংস্কার আইন প্রণয়নের জন্য
একটি গণপরিষদ হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা
প্রদান করে। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে তারা
গণভোটের ‘হ্যাঁ’ ভোট এবং আমূল
রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনকারীদের আকাঙ্ক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে।
জুলাই
বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষাগুলো ২০২৫ সালের জুলাই
জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ করা
হয়। এতে বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল
রাষ্ট্র সংস্কারের বেশ কয়েকটি নীতিতে
একমত হয়েছিল, যেমন প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ
১০ বছরে সীমাবদ্ধ করা,
বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের
স্বাধীনতা বজায় রাখা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং ১০০ সদস্যের
উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা। জুলাই আন্দোলনের তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা ও
ছাত্রনেতা মাহফুজ আলম বলেন, “জুলাই
ঘোষণাপত্রটি জুলাই অভ্যুত্থানের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব
করে এবং এই ঐতিহাসিক
আন্দোলনের একটি প্রামাণ্য দলিল
হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।” ইউনুস বলেন, “এটি একটি মহান
দিন। এটি নতুন বাংলাদেশের
সূচনা।”
২০২৫
সালের ১৭ অক্টোবর জুলাই
জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করার
পর জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের
আহ্বান জানায়। তাদের যুক্তি ছিল যে, সাংবিধানিক
সংস্কারের বিষয়গুলো কোনো একক রাজনৈতিক
দলের এজেন্ডা বা পছন্দের ওপর
ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। তবে,
জামায়াতের এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত
হয়নি। নির্বাচনের পর, বিএনপি এবং
জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট সংস্কারের বিষয়ে
ভিন্ন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। জামায়াত এবং
ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) গণভোটের অবিলম্বে বাস্তবায়ন চেয়েছিল, অন্যদিকে বিএনপি প্রক্রিয়াটি ধীর করতে চেয়েছিল।
বিএনপির
একজন বুদ্ধিজীবী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’কে বলেন যে
তার দল “বিএনপির ৩১-দফা রূপরেখা অনুযায়ী
সংবিধানে পরিবর্তন আনতে চায়, যার
সাথে জুলাই জাতীয় সনদের অনেক মিল রয়েছে।”
তবে, দলটি “এনসিপি এবং জামায়াতের প্রস্তাবিত
উপায়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনতে চায় না।”
অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে জুলাই জাতীয়
সনদ নিয়ে আলোচনার জন্য বিএনপির প্রধান
ব্যক্তি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদে বলেন যে জুলাই
জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশটি
একটি “অবৈধ আদেশ”।
তিনি বলেন, বিএনপি সে সময় “নির্বাচনের
স্বার্থে” তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করা থেকে বিরত
ছিল।
তিনি
স্বীকার করেন যে, বিএনপি
“সংস্কারের অজুহাতে যাতে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত
না হয়, সেজন্য অনেক
বিষয়ে আপস করে সনদে
স্বাক্ষর করেছিল।” ফলে, বিএনপি জুলাই
মাসের সংস্কার ও গণভোট নিয়ে
একটি রাজনৈতিক অস্পষ্টতা বজায় রেখেছিল, যার কারণে সমালোচকরা
উল্লেখ করেন যে, আমূল
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ে দলটি রাজনৈতিক রক্ষণশীলতা
বেছে নিয়েছিল। বিএনপি সঠিক পথ বেছে
নেয়, নাকি উদার গণতন্ত্রের
এক অত্যন্ত সংকীর্ণ পথ বেছে নেয়,
তা কেবল সময়ই বলতে
পারবে।
আমি
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনসিপি-র ছাত্র সংগঠন
জাতীয় ছাত্র শক্তি আয়োজিত একটি আলোচনা সভায়
উপস্থিত ছিলাম, যেখানে নাহিদ ইসলাম ও অন্যান্য ছাত্রনেতারা
উপস্থিত ছিলেন। আলোচকরা জুলাই বিপ্লবকে “অর্ধ-বিপ্লব”
আখ্যা দিয়ে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের কাঙ্ক্ষিত সকল পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দেন। মিলনায়তনটি
ছিল তারুণ্যের শক্তি, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আবহ এবং রাষ্ট্র কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনার
আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। অনেকেই পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব বাস্তবায়নের পথে বাধা হিসেবে কাজ করার
জন্য বিএনপিকে দায়ী করেন।
জামায়াতে ইসলামীর
পাশাপাশি সংসদীয় বিরোধী দলে থাকা সত্ত্বেও এনসিপির রাজপথে শক্তি ও নৈতিক কর্তৃত্ব
এখনও রয়েছে। তারা সহজে শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা জুলাই জাতীয় সনদকে স্থায়ীভাবে বাতিল বা
নিষ্ক্রিয় হতে দেবে না। জুলাই বিপ্লব ছিল এই ধারণার প্রত্যাখ্যান যে, নির্বাচনী বিজয়
মানেই নিরঙ্কুশ ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা। নতুন বিএনপি সরকার যদি তার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা
ব্যবহার করে জুলাই জাতীয় সনদের মূল চেতনাকে বাতিল করে দেয়, তবে তারা সেই জনগোষ্ঠীকেই
বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি নেবে, যারা তাদের ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব করেছিল।
মজার বিষয়
হলো, হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি একই অবস্থানে রয়েছে।
এনসিপি-র সদস্য
সম্পাদক আখতার হোসেন ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী
অপরাধে জড়িত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাসহ সকলকে দেশে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে
অবিলম্বে তাদের শাস্তি কার্যকর করা যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ বলেছেন, নির্বাহী
পদক্ষেপের মাধ্যমে নয়, বরং “সম্পূর্ণ আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে”
আওয়ামী লীগের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
শামা ওবায়েদ বলেন, “শেখ হাসিনা যেখানেই আত্মসমর্পণ করুন না কেন, ভারত বা বাংলাদেশে,
তাকে প্রথমে জেলে যেতে হবে।” জামায়াত আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি
অব্যাহত রেখেছে এবং হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকে একটি “অন্তর্নিহিত রহস্য ও ষড়যন্ত্র”
হিসেবে বর্ণনা করেছে। হাসিনা ও আওয়ামী লীগ বিষয়ে তাদের অবস্থানই বাংলাদেশের প্রধান
দলগুলোর মধ্যে একমাত্র অভিন্ন বিষয়।
হাসিনা সম্প্রতি
রয়টার্সকে বলেছেন যে তিনি এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা ডিসেম্বরের
মধ্যে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরবেন। এটি বিএনপি, এনসিপি এবং জামায়াতের মধ্যে একটি কৌশলগত
জোট গঠনে বাধ্য করতে পারে। এর ফলে তাদের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু সংস্কার থেকে নিরাপত্তার
দিকে সরে যাবে।
বাংলাদেশ সফলভাবে
শাসক পরিবর্তন করেছে কিন্তু জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পরেও স্বয়ং ব্যবস্থা পরিবর্তনের
ঐতিহাসিক কাজটি অসমাপ্ত রয়ে গেছে।
দ্য
ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ