পরিবর্তনশীল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এবং আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের কারণে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আপাতত তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরের পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন।
একজন বাংলাদেশি
প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফর বরাবরই দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ,
যা একইসাথে সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং চ্যালেঞ্জিংও বটে। ঢাকা ভারতের সাথে তার সম্পর্কের
মতো এত জটিল কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনা করে না, বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত পানি
বণ্টনের মতো অমীমাংসিত, কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের ক্ষেত্রে।
নয়া দিল্লি
যদিও প্রাথমিকভাবে ঘোষণা করেছিল যে তারে রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের
একটি নতুন অধ্যায় শুরু হবে, ভারত প্রশাসন সেই প্রকাশ্য আশ্বাসকে অন্তত ঢাকার নীতিনির্ধারকদের
দৃষ্টিকোণ থেকে বাস্তবে রূপ দিতে এখনো কোনো অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ
কাঠামোগত সময়সীমার কারণে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বহুল আলোচিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির
মেয়াদ এই ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। একটি পূর্ণাঙ্গ নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা না হওয়া
পর্যন্ত বিদ্যমান চুক্তিটি বলবৎ রাখার জন্য ঢাকার অনুরোধে নয়া দিল্লি সাড়া দেয়নি।
কূটনৈতিক সূত্র
বলছে, প্রধানমন্ত্রীর একটি উচ্চপর্যায়ের সফরের জন্য যে পারস্পরিক আস্থার প্রয়োজন,
তার অভাব রয়েছে। রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফরের প্রতি নয়া দিল্লির বৈরী প্রতিক্রিয়া
হিসেবে ঢাকা যা দেখছে, তার পাশাপাশি ভারত কথিত বিদেশীদের পুশ-ইন বা জোরপূর্বক বাংলাদেশে
ঠেলে দেয়ার মাধ্যমে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
উপরন্তু, প্রধানমন্ত্রীর
অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি দিল্লি বিমানবন্দরে দীর্ঘক্ষণ হয়রানির
শিকার হন। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে দিল্লির
নিরাপদ আশ্রয় থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনরায় প্রবেশের সুযোগ করে দিয়ে ভারত বাংলাদেশকে
অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এরই প্রেক্ষাপটে,
নয়াদিল্লি সফর সংক্রান্ত সমস্ত আলোচনা থমকে গেছে। উভয় রাজধানীর কূটনৈতিক সূত্র বলছে,
এ বছর এমন সফর হওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই বললেই চলে।
ঢাকার রাজনৈতিক
বিশ্লেষকরা এই পরিমিত দূরত্বকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং যুক্তি দিয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রী
সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা দাবি করেন যে, ভারত ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও হাসিনা
ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে বিশ্বাস করতে অস্বীকার করেছে। যদিও নতুন
সরকার ছয় মাসেরও কম সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছে, নয়াদিল্লি এরই মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছে।
বিশ্লেষকরা
যুক্তি দেন যে, ভারত যদি তার পৃষ্ঠপোষকতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি মৌলিকভাবে পরিবর্তন না করে,
তবে ঢাকার উচিত দূরত্ব বজায় রাখা। তারা জোর দিয়ে বলেন যে, সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত
করতে হবে যেন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত কৌশলগত ভিত্তি দুর্বল না হয়।
ভারতকে বাদ
দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখন জাপান ও সৌদি আরবে পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সফরের পাশাপাশি
নিউইয়র্কে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তারেক রহমানের অংশগ্রহণের ওপর মনোযোগ দিচ্ছে।
এই কূটনৈতিক
অচলাবস্থা একটি আশ্চর্যজনক অভ্যন্তরীণ ঘটনার সাথে মিলে গেছে। ঐতিহাসিক ছাত্র অভ্যুত্থানের
মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার প্রায় দুই বছর পর, হাসিনা এই ডিসেম্বরে দিল্লিতে
নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি রয়টার্সকে
দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে তিনি
তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার, মৃত্যুদণ্ড বা গুপ্তহত্যার সম্মুখীন হতে পারেন। তবুও তিনি জোর
দিয়ে বলেছেন যে তাঁর আর কোনো বিকল্প নেই, এবং ঘোষণা করেছেন যে তিনি সেই মাটিতেই মৃত্যুবরণ
করতে চান যেখানে তাঁর বাবা-মা সমাহিত আছেন।
সেই যাত্রা
বাস্তবে রূপ নেবে বলে অনেকেই মনে করেন না। কিন্তু এই ঘোষণার কারণে তাঁর রাজনৈতিক বিকল্পগুলো
নাটকীয়ভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ভারতে নির্বাসন তার কাছে আর টেকসই বলে মনে হচ্ছে না।
ঢাকার ক্রমবর্ধমান আইনি চাপ, ভারতের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা এবং
তাঁর দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ক্রমাগত পতন তাঁকে ভিন্ন কোন কৌশল গ্রহণের সুযোগ দিয়েছে
সামান্যই। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র বিক্ষোভের প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের সাথে
সম্পর্কিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
ঢাকা বারবার
ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠিয়েছে। অন্যদিকে নয়াদিল্লি কোনো প্রকাশ্য প্রতিশ্রুতি
দেওয়া থেকে সতর্কভাবে বিরত থেকেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে তাকে আশ্রয় দেওয়া সত্ত্বেও,
ভারত কখনও প্রকাশ্যে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়নি, কারণ তা করলে তাকে অনির্দিষ্টকালের
জন্য সুরক্ষা দেওয়ার একটি স্থায়ী প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে।
পরিবর্তে, তিনি
একজন অত্যন্ত সংবেদনশীল অতিথি হিসেবে রয়েছেন, যার উপস্থিতি বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের
সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের ভারতীয় প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলেছে। ভারতের জন্য এই উভয়সংকটটি
গভীর। ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে, নয়াদিল্লি হাসিনার প্রশাসনে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে,
যা দক্ষিণ এশিয়ায় তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠেছিল।
সেই মিত্রকে
পরিত্যাগ করলে এই অঞ্চলে ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, অথচ
গণহত্যার জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একজন নেতাকে সুরক্ষা দেওয়া অব্যাহত রাখলে তার কূটনৈতিক
মূল্য ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতিটি উন্নতি নয়াদিল্লির অনির্দিষ্টকালের
জন্য বিলম্ব করার সুযোগকে সংকুচিত করে।
এইসব চ্যালেঞ্জের
মুখে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক রদবদল সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বহু
বছর ধরে চলা একতরফা সদিচ্ছার পর ঢাকা তার বৃহত্তম প্রতিবেশীর সাথে কীভাবে আচরণ করতে
চায়, তা পুনর্বিবেচনা করছে। নয়াদিল্লিতে হাই কমিশনার এম রিয়াজ হামিদুল্লাহকে সরিয়ে
কর্মরত পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নিয়োগের সিদ্ধান্তটি কূটনৈতিক দর্শনে একটি
উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে।
পরিস্থিতি সম্পর্কে
অবগত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মতে, ঢাকার কাছে হামিদুল্লাহ
ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় মনোভাবের প্রতীক হয়ে উঠেছিল, যা সাংস্কৃতিক কূটনীতির
ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল, যদিও সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছিল।
এই পরিবর্তনের
মোড় আসে জাহেদ উর রহমানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যিনি নয়াদিল্লিতে অভিবাসন বিভাগে আটকে
পড়ার পর তাঁর ভারত সফর বাতিল করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাই
কমিশনারকে তলব করে এবং আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়।
সব মিলিয়ে,
প্রধানমন্ত্রীর সফর স্থগিত, নয়াদিল্লিতে কূটনৈতিক রদবদল, হাসিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রকাশ্য
বিতর্ক এবং বিকল্প কৌশলগত অংশীদারিত্বের ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বারোপ—এ
সব কিছুই ঢাকার বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাসের দিকে ইঙ্গিত করে। উভয় পক্ষের সুনির্দিষ্ট
পদক্ষেপের মাধ্যমে আস্থা পুনর্নির্মাণ না করা হলে, উভয় রাজধানী একসময় যে রাজনৈতিক
গতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার পরিবর্তে সম্পর্কটি ’সতর্কতা’ দ্বারাই সংজ্ঞায়িত হওয়ার
সম্ভাবনা বেশি।
এশিয়া টাইমস থেকে অনুবাদ