উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ দুই দিনের সফরে সৌদি আরবে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার
(৬ আগস্ট) রিয়াদগামী বিমানে ওঠার সময় শরীফের কার্যালয় থেকে দেওয়া বিবৃতিতে বলা
হয়, “এই সফর আঞ্চলিক পরিস্থিতির স্বল্পমেয়াদী প্রভাবের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে
এবং এটি দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক
বিষয়ে সমন্বয় ও অংশীদারিত্বকে আরও প্রসারিত করবে।”
উপ-প্রধানমন্ত্রী
ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার, সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য
শরীফের সঙ্গে রয়েছেন।
এই বছর সৌদি
আরবে এটা তাঁর তৃতীয় সফর। সফরকালে পাকিস্তানি নেতা সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের
সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সেখানে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী ভ্রাতৃত্বপূর্ণ
সম্পর্ক ও অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করা হবে এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে
বলে শরীফের কার্যালয় জানিয়েছে।
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত
হুথিদের জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা থেকে লোহিত সাগরের জলসীমা সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে গঠিত
নতুন সৌদি নেতৃত্বাধীন নৌ জোটে পাকিস্তানের যোগদানের এক সপ্তাহ পর এই সফর অনুষ্ঠিত
হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র
ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার আলোচনার মধ্যেই
শরীফের এই সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই দুই যুদ্ধরত দেশের মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম প্রধান
মধ্যস্থতাকারী।
শরীফের এই সফর
পাকিস্তান-সৌদি সম্পর্কের জন্য কী অর্থ বহন করে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এর তাৎপর্য
কী তা আল জাজিরা খতিয়ে দেখছে।
পাকিস্তান
কী চায়?
২০২৪ সালে ক্ষমতায়
আসার পর থেকে বেশ কয়েকবার সৌদি আরব সফরকারী শরীফ ধারাবাহিকভাবে রিয়াদের সঙ্গে সম্পর্কের
গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ একটি কৌশলগত পারস্পরিক
প্রতিরক্ষা চুক্তি (এসএমডিএ) স্বাক্ষর করেছে।
এই সাম্প্রতিক
সফরের দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে হচ্ছে: অর্থনৈতিক সহায়তা এবং কৌশলগত সমন্বয়।
কিং ফয়সাল
সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ (কেএফসিআরআইএস)-এর সহযোগী ফেলো উমর করিম
আল জাজিরাকে বলেন, “পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে সংকটে রয়েছে এবং চায় সৌদি আরব যেন অর্থায়ন
বাড়ায় এবং পাকিস্তানের অনুরোধে স্থগিত থাকা তেল সুবিধাও অনুমোদন করে।”
তিনি বলেন,
এর বিনিময়ে ইসলামাবাদ সৌদি আরবের প্রতি তার প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে
পারে।
এই সফর পাকিস্তানের
একাধিক কৌশলগত অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টাকেও প্রতিফলিত করে।
সিডনি ইউনিভার্সিটি
অফ টেকনোলজিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গবেষণারত ডক্টরাল প্রার্থী মুহাম্মদ
ফয়সাল বলেন, “পাকিস্তান বেশ কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী কৌশলগত ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য
রক্ষা করছে।”
তিনি রিয়াদের
সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী এবং লোহিত
সাগর ও হরমুজ প্রণালীর অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশ হিসেবে ইসলামাবাদের অবস্থানের
দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিনিধিদলে সেনাপ্রধান মুনিরের উপস্থিতি এই সফরের
নিরাপত্তা সংক্রান্ত দিকটিকে তুলে ধরেছে।
আলোচ্যসূচিতে
কী আছে?
এই সফরে তিনটি
বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে: বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা।
রিয়াদে স্বাক্ষরিত
এসএমডিএ চুক্তিটি প্রতিটি দেশকে একে অপরের উপর আক্রমণকে নিজের উপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য
করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে।
পাকিস্তান ইতোমধ্যে
এই চুক্তির অধীনে পদক্ষেপ নিয়েছে, একটি সৌদি বিমান ঘাঁটিতে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে,
যা এপ্রিলে নিশ্চিত করা হয়েছিল যখন ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি আলোচনার
আয়োজন করছিল।
আলাদাভাবে,
ইয়েমেনের হুথিরা অবরোধ ঘোষণা করে এবং সৌদি-সম্পর্কিত জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা
শুরু করার পর ৩০শে জুলাই ঘোষিত সৌদি নেতৃত্বাধীন লোহিত সাগর জোটের ১৪টি প্রতিষ্ঠাতা
সদস্যের মধ্যে পাকিস্তানও রয়েছে। রিয়াদ এই জোটের সদর দপ্তরের আয়োজন করবে।
ফয়সাল বলেন,
এই প্রতিরক্ষা চুক্তিটি উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তানের সামরিক অবস্থানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন
আনেনি, বরং এটি নতুন কোনো সেনা মোতায়েনের চালিকাশক্তি না হয়ে প্রতিরোধ এবং সংকটকালীন
সমন্বয়ের একটি ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে।
করিম আরও সতর্কতামূলক
একটি মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
তিনি বলেন,
“এই চুক্তিটি ইঙ্গিত ও সেনা মোতায়েনের একটি মিশ্রণ মাত্র।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, ইসলামাবাদ হুথিদের মতো অরাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর
অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি জোটবদ্ধ হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন
করা এড়ানোর চেষ্টা করেছে।
ইরান যুদ্ধ
এই সফরকে কীভাবে প্রভাবিত করছে?
এই সফর এমন
এক সময়ে হচ্ছে, যখন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ
নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন এবং দেশটির পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু
করা হয়। এই সংঘাত শুরু হওয়ার পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে।
পাকিস্তান এপ্রিলে
দুই সপ্তাহের একটি যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করে এবং জুনে একটি পরবর্তী সমঝোতা স্মারক
স্বাক্ষরে সহায়তা করে। জুলাই মাসে সেই চুক্তিটি ভেস্তে যায়, যখন ইরানি বাহিনী অনুমোদিত
নৌপথ এড়িয়ে চলা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে হামলা চালায় এবং এরপর ইরানজুড়ে মার্কিন হামলা
চালানো হয়।
ওয়াশিংটন পরবর্তীতে
ইরানের ওপর পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপ করে, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
হুমকি এবং একটি চুক্তির বিষয়ে নতুন করে আলোচনার মধ্যে দোদুল্যমান ছিলেন, যেখানে ওমান
হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনায় মধ্যস্থতা করছে।
এদিকে, হুথি
অবরোধ লোহিত সাগরে দ্বিতীয় একটি সামুদ্রিক ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে, যা জাহাজ চলাচল ব্যাহত
করছে এবং তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে,
ফয়সাল বলেছেন, এসএমডিএ “উপসাগর-কেন্দ্রিক সামরিক অবস্থানের দিকে স্থায়ী পরিবর্তনের
প্রয়োজন ছাড়াই একটি নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে পাকিস্তানের প্রাসঙ্গিকতা বাড়িয়ে
তোলে”।
উভয় পক্ষই
কী লাভবান হবে?
সৌদি আরবের
জন্য, এই সফর একটি বিশ্বস্ত নিরাপত্তা অংশীদারের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার সুযোগ করে
দেয়, কারণ দীর্ঘমেয়াদী মার্কিন সুরক্ষার উপর আস্থা কম নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে। এটি
নতুন সামুদ্রিক জোটে পাকিস্তানের ভূমিকাও শক্তিশালী করে।
ইসলামাবাদের
জন্য, রিয়াদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা আনতে পারে এবং এমন এক
সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা শক্তি হিসেবে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পারে, যখন তার অর্থনীতি
চাপের মধ্যে রয়েছে।
চ্যালেঞ্জটি
হলো পরস্পরবিরোধী সম্পর্কগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।
পাকিস্তানের
সাথে ইরানের ৯০০ কিলোমিটার (৫৫৯ মাইল) সীমান্ত রয়েছে, তেহরানের সাথে তার দীর্ঘস্থায়ী
সম্পর্ক রয়েছে এবং দেশটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিজেকে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী
হিসেবে উপস্থাপন করে চলেছে।
সৌদি আরবের
সাথে গভীরতর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এই ভারসাম্য রক্ষার কাজটিকে ক্রমশ কঠিন করে তুলতে
পারে।
“সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, ইরান ও তার মদদপুষ্ট শক্তিগুলো যদি
সৌদি আরবে হামলা অব্যাহত রাখে, তাহলে সৌদি আরবের মধ্যস্থতাকারী ও নিরাপত্তাদাতা হিসেবে
পাকিস্তানের বর্তমান ভারসাম্য রক্ষার কৌশলটি চাপের মুখে পড়বে,” করিম আল জাজিরাকে বলেন।
ফয়সাল বলেন,
পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে “কৌশলগত নমনীয়তা”
বজায় রেখেছে। এর মাধ্যমে তারা এমন কোনো দায়বদ্ধতা এড়িয়ে চলে যা পাকিস্তানকে সরাসরি
আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলবে, এবং একই সাথে রিয়াদ ও তেহরান উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক
রক্ষা করে।
ফয়সাল বলেন,
“সৌদি-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হলে তা ধীরে ধীরে এই সতর্কভাবে পরিকল্পিত ভারসাম্য
রক্ষার কৌশলকে ক্ষুণ্ণ করবে এবং পাকিস্তানকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব রক্ষা
ও বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মধ্যে কঠিন আপস করতে বাধ্য করবে।”
আল জাজিরা থেকে অনুদিত