পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে একটি নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ব্যবহার করে ইসলামাবাদ ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সঙ্গে বৃহত্তর নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তুলবে কিনা - নয়াদিল্লিতে বিশ্লেষকরা সেই প্রশ্ন তুলেছেন।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) স্বাক্ষরিতমক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি”তে বলা হয়েছে যে, এই তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সবগুলোর ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।

এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পর করা হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ শনিবার (৮ আগস্ট) এই চুক্তিকে ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর সামরিক জোটের সম্ভাব্য মডেল হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং এই ধরনের জোটকে ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

যদিও মুসরিম দেশগুলো ধর্মীয় সংহতির চেয়ে জাতীয় স্বার্থকে বেশি অগ্রাধিকার দেবে বলে মনে হয়। তবে, বিশ্লেষকরা বলছেন যে দিল্লিকে সতর্ক থাকতে হবে কারণ পাকিস্তান এই চুক্তিকে বৃহত্তর সহযোগিতার একটি সম্ভাব্য মঞ্চ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল যখন বাংলাদেশ তার সামরিক আধুনিকীকরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চীন পাকিস্তানের যৌথভাবে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

দুই দেশের মধ্যে বিমান বাহিনীর উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনা এবং একটি সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ সিমুলেটর হস্তান্তরের মতো পদক্ষেপের কথাও শোনা গেছে।

দিল্লি-ভিত্তিক ইন্ডিক রিসার্চার্স ফোরামের স্ট্র্যাটেজিক এনগেজমেন্টস অ্যান্ড পার্টনারশিপস-এর পরিচালক শ্রীনিবাসন বালাকৃষ্ণান বলেছেন, এই চুক্তি একটিবৃহত্তর আদর্শগত সামরিক জোটেপরিণত হতে পারে, যা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করবে। এই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ভারত প্রধান নিরাপত্তা প্রদানকারী হিসেবে কাজ করছে।

তিনি বলেন, “সুতরাং, আসল কৌশলগত প্রশ্নটি এই নয় যে আজ একটিইসলামিক ন্যাটোতৈরি হচ্ছে কি না। প্রশ্নটি হলো, প্রতিরক্ষা চুক্তি, সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অস্ত্র হস্তান্তরের মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে পারে কি না।

বাংলাদেশের ওপর কড়া নজর রাখতে ভারতকে পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতের অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেনবাংলাদেশের দিকে অবশ্যই নিবিড়ভাবে নজর রাখা উচিত। পাকিস্তান তুরস্ক উভয়ের সঙ্গেই দেশটির প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সম্প্রতি নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে।

পাকিস্তান তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে এবং ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য নতুন বাজার সক্রিয়ভাবে অন্বেষণ সম্প্রসারণ করছে।

বাংলাদেশের পক্ষে মক্কা চুক্তিতে যোগদান করা সম্ভব বলে মনে করেন উদয় চন্দ্র। তবে, তিনি মনে করেন যে এটি হবে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এক বিশাল পদক্ষেপ।

দুই বছর আগে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের একটি সময় পার হলে ভারত সম্পর্ক স্থিতিশীল করার পদক্ষেপ নিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করত।

দিল্লিতে অবস্থানরত হাসিনা গত আগস্ট একটি ভার্চুয়াল মিডিয়া আলাপচারিতায় অংশ নেওয়ার পর সম্প্রতি উত্তেজনা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত যে তার ভাষণ দেশের স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে।

বালাকৃষ্ণান উল্লেখ করেছেন যে, যদি কোনো দেশ পাকিস্তান-কেন্দ্রিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা কাঠামোর অধীনে কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক জোটে যোগ দেয়, তবে তা বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর ভারত মহাসাগরের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করবে।

তবে, ‍উদয় চন্দ্র বলেছেন যে, বাংলাদেশের তুলনায় মালদ্বীপের এই ধরনের চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনাকম কারণ, সম্প্রতি দেশটি ভারতীয় নেতৃত্বে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন একীকরণকে উৎসাহিতকারী সার্কের সদস্য দেশগুলো হলো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান এবং মালদ্বীপ। উরিতে সন্ত্রাসী হামলার পর ভারতের বয়কটের কারণে পাকিস্তানে একটি শীর্ষ সম্মেলন বাতিল হয়ে যাওয়ায় ২০১৬ সালে এটি স্থগিত হয়ে যায়।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, আসিফের প্রস্তাবিত ন্যাটো-ধাঁচের জোট থেকে মক্কা চুক্তি এখনও অনেক দূরে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যেও এর সম্প্রসারণকে সীমিত করতে পারে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক ভাইস-চিফ অফ দ্য স্টাফ সতিন্দর কুমার সাইনি বলেছেন, মক্কা চুক্তিটিপরস্পরের ভূখণ্ড রক্ষার প্রতিশ্রুতির চেয়ে রাজনৈতিক সংকেত দেওয়ার বিষয়েই বেশি

ইসলামাবাদের পারমাণবিক সক্ষমতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এই চুক্তির প্রভাব বেশি, কিন্তু সাইনি মনে করেন যে ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে সৌদি আরব এবং তুরস্কের সরাসরি যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কম।

তিনি বলেন, “ভারত ২০১৫ সাল থেকে সুনির্দিষ্ট যোগাযোগ, জ্বালানি চুক্তি এবং প্রবাসী কল্যাণের মাধ্যমে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সযত্নে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এই চুক্তিটি সেই ভারসাম্যকে জটিল করে তুলেছে। ভারতের উচিত সৌদিদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে প্রসারিত গভীর করা।

স্বাধীন বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেবসরকার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তি হিসেবে তার সুনামকে কাজে লাগাতে চাইছে। তবে মক্কা চুক্তি শিগগিরই বাংলাদেশের মতো দেশ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ইসলামাবাদ যুক্তরাষ্ট্রকে অসন্তুষ্ট করার বিষয়ে সতর্ক থাকবে।

তিনি বলেন, “আমেরিকানরা বিষয়টি কীভাবে নেবে, সেটাই দেখার বিষয়, কারণ এই বিকল্প জোট গঠনে আমেরিকানরা খুব একটা খুশি নাও হতে পারে।

দেবসরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মতো বহুপাক্ষিক সাহায্যের ওপর পাকিস্তানের নির্ভরশীলতার দিকে ইঙ্গিত করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তম দাতা। সার্বভৌম ঋণখেলাপ রোধ করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে পাকিস্তানের অর্থনীতি আইএমএফ-এর বেলআউটের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

তিনি বলেন, “পাকিস্তানকে তার চালগুলো সঠিকভাবে দেওয়ার ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনুদিত (কিছুটা সংক্ষিপ্ত)