মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে কবে নাগাদ ফেরা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এমন অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পাঠানো মার্কিন যুদ্ধজাহাজইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর নাবিক সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাবিকদের পরিবার সহকর্মীরা।

সম্প্রতি উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সান ডিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এবং অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে তাঁরা ক্ষোভ উগরে দেন। সভায় উপস্থিত দুই নাবিকের স্ত্রী তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সান ডিয়েগোর ওই সভায় আনুমানিক ২০০ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অংশ নেওয়া এক নাবিকের স্ত্রীর ভাষ্য, সভার দিনই তিনি তাঁর স্বামীর কাছ থেকে একটি বার্তা পান। অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি কর্মকর্তাদের জানান, তাঁর স্বামী তাঁকে লিখেছেন যেতিনি আশা করেন আগামীকাল যেন তাঁর আর ঘুম না ভাঙে।

ওই নারী আরও জানান, সভায় উপস্থিত নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই সুনির্দিষ্ট বা আবেগঘন বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি। তবে জাহাজে থাকা নাবিকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক) এবং চিকিৎসকদের পর্যাপ্ত সুবিধা রয়েছে বলে আশ্বস্ত করেন তাঁরা।

একই সঙ্গে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুদ্ধজাহাজটিতে আরও বেশি মানসিক স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ পাঠানোর কাজ চলছে বলে জানান নৌবাহিনীর সেই কর্মকর্তারা।

টানা ২৫০ দিন সমুদ্রে: চরম ক্লান্তি হতাশায় মার্কিন নাবিকেরা

গত সপ্তাহের সভায় যে উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় নাবিক তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে সামরিক সংবাদমাধ্যমস্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’-এর কাছে ব্যক্ত করা মতামতের হুবহু মিল রয়েছে।

বর্তমানে কর্মরত নাবিক তাঁদের পরিবারের সাক্ষাৎকার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রু সদস্যদের ডজনখানেক মন্তব্য পোস্ট থেকে সংকটের গভীরতা স্পষ্ট। তাঁদের বিবরণ অনুযায়ী, চরম ক্লান্তি মনোবল ভেঙে পড়ায় নাবিকেরা প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন। এর মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তার মতো গুরুতর বিষয় যেমন রয়েছে, তেমনি অন্তত একজন ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখার ঘটনাও ঘটেছে।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অস্বাভাবিক অত্যন্ত কঠিন এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন যুদ্ধজাহাজের নাবিকেরা। মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অধীন ৪০ দিন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাভিযানে অংশ নিতে হয়েছে তাঁদের। সব মিলিয়ে সমুদ্রে টানা ২৫০ দিন পার করার এক নজিরবিহীন ধকল সামলাচ্ছেন তাঁরা।

গত নভেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে বিমানবাহী রণতরি সান ডিয়েগো ত্যাগ করেছিল। তবে পরে সেটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে কোনো ধরনের বন্দরবিরতি বা যাত্রাবিরতি ছাড়াই সমুদ্রে রেকর্ডসংখ্যক দিন পার করে আট মাসের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে যুদ্ধজাহাজটি।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান সফল করতেই ক্রুদের দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত মে মাসে মিশন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বাড়ানো হয়েছে। তবে কবে নাগাদ তাঁরা ফিরতে পারবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ প্রকাশ করেনি মার্কিন প্রশাসন।

সভায় মানসিক স্বাস্থ্য আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

খাদ্য-পানির সংকট, বাড়ি ফিরতে চান হাজার সেনা

মার্কিন নৌবাহিনী গত সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘নাবিকদের মানসিক সুস্থতা পর্যবেক্ষণ বজায় রাখার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রতিনিয়ত মূল্যায়ন বা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে যাচ্ছে।

এদিকে প্রতিশোধ বা আইনি জটিলতার আশঙ্কায় প্রতিবেদনের জন্য সাক্ষাৎকার দেওয়া নাবিকদের স্ত্রী, পরিবারের অন্য সদস্য কর্তব্যরত নাবিকদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করা হয়েছিল।স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসসেই অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়েছে।

পরিবারের সদস্য নাবিকদের অভিযোগ, আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে থাকা প্রায় হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগ মেলাই ভার।

সাধারণত সাগরে থাকাকালীন নাবিকদের একঘেয়েমি ক্লান্তি দূর করতে নিয়মিত বিরতিতে বন্দরে যাত্রাবিরতি বাপোর্ট কলদেওয়া হয়। তবে মোতায়েনের দীর্ঘ সময়ে আব্রাহাম লিংকনের ক্রুরা এমন কোনো স্বাভাবিক সুযোগ পাননি বললেই চলে।

মার্কিন নৌবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ী, রসদ সংগ্রহ, জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ক্রুদের বিশ্রামের জন্য সাধারণত প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বিমানবাহী রণতরিগুলো কোনো না কোনো বন্দরে নোঙর করতে হয়।

যুদ্ধজাহাজটিতে থাকা এক নাবিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পুরো মোতায়েনজুড়ে আমরা কোনো বিরতি ছাড়াই জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করে গেছি।অথচ মোতায়েনের শুরুতে বিভিন্ন বন্দরে যাওয়া এবং বিশ্রামের আশায় সবার মনোবল বেশ চাঙা ছিল বলে তাঁর মন্তব্য।

বর্তমানে ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তাঁরা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরার স্বার্থে যেকোনো বিরতি ত্যাগ করতে তাঁরা রাজি। সেই নাবিকের আকুতি, ‘এই মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।

জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা: নাবিকের করুণ আকুতি

নাবিক তাঁদের পরিবারের সদস্যরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করা সামরিক জীবনেরই অংশ। তবে সেটি তাঁরা মেনে নিলেও অনেকেরই অভিযোগ, শারীরিক মানসিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা না করেই যুদ্ধজাহাজের ক্রুদের অস্বাভাবিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে টানা যুদ্ধাভিযান চালাতে বাধ্য করা হচ্ছে।

গত জুলাই মাসে এক চিন্তিত অভিভাবকস্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’–কে দেওয়া এক চিঠিতে লেখেন, ‘আমার ছেলে বর্তমানে ওই যুদ্ধজাহাজে আছে। সে এবং তার সহকর্মীরা একটু স্বস্তি পেতে প্রতিনিয়ত জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার কথা ভাবছে, এটি শোনা একজন বাবার জন্য অত্যন্ত কষ্টের।

নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে এই অভিভাবক আরও বলেন, ‘আমরা রাতে ঘরের নরম বিছানায় আরামে ঘুমাই, অথচ আমাদের প্রিয়জনেরা ওখানে যুদ্ধ করছে। তারা আসলে কিসের জন্য জীবন বাজি রাখছে, সেটিও তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

জাহাজে থাকা একাধিক নাবিক জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে এক ক্রু সদস্যকে জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। এক নাবিকের ভাষ্য, ‘আমাদের এখানে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে দায়িত্বরত প্রহরীদের এক নাবিককে সাগরে লাফ দেওয়া থেকে আটকাতে হয়েছিল।ঘটনাটি পুরো জাহাজের লাউডস্পিকারে ঘোষণার মাধ্যমে সব ক্রুকে জানানো হয়েছিল বলে তাঁদের দাবি।

তবে এই সুনির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও মার্কিন নৌবাহিনী সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সাধারণ প্রশ্নের উত্তরে বাহিনী জানিয়েছে, ‘কর্তৃপক্ষ সব সময়ই পরিবারগুলোর কথা শুনতে, সেনাসদস্যদের পাশে দাঁড়াতে এবং আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপের লক্ষ্য নিরাপদে সফলভাবে বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

নাবিক, তাঁদের স্ত্রী পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন, এর আগে আব্রাহাম লিংকন যুদ্ধজাহাজে খাবার রেশন করে দেওয়া, তীব্র পানির সংকট এবং টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কাপড় লন্ড্রি করতে না পারার মতো বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে এখন সেসব সমস্যার বড় অংশই সমাধান হয়েছে এবং চিঠি বা ডাক যোগাযোগের ব্যবস্থাও ক্রমান্বয়ে উন্নত হচ্ছে বলে তাঁদের মত।

মানসিক ভাঙন তীব্র হতাশা, তা মিলছে না ফেরার তারিখ

গত জুলাইয়ের শুরুতে ওমানের একটি বন্দরে সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতির কারণে যুদ্ধজাহাজটিতে নতুন করে রসদ সরবরাহের সুযোগ হয়। ফলে দীর্ঘ কয়েক মাস পর ক্রুরা তাজা ফলমূল শাকসবজি পান বলে জানান এক নাবিক। তবে সে সময় অনেক নাবিককে জাহাজ থেকে নামার অনুমতি দেওয়া হলেও তাঁদের বন্দর এলাকার একটি সুরক্ষিত সীমানার মধ্যেই আটকে রাখা হয়েছিল।

এর আগে গত ডিসেম্বরেওআব্রাহাম লিংকনগুয়াম দ্বীপে একটি সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছিল। কিন্তু জাহাজে থাকা অনেক নাবিকই সেই সময় তীরে নামার সুযোগ পাননি বলে জানান তাঁদের স্ত্রীরা।

সেনাসদস্যদের জন্য নিয়মিত বন্দরবিরতির অভাব, ডাক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি নিয়ে এক নাবিকের স্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘নিজের মানুষের (নাবিক) এই অবস্থা দেখাটা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি চোখের সামনে আমার স্বামীকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখছি। মনে হচ্ছে, তারা যেন সব আশাই হারিয়ে ফেলছে।

নৌবাহিনী অবশ্য তাদের জবাবে উল্লেখ করেছে যে লিংকন যুদ্ধজাহাজটি বর্তমানে অত্যন্ত বৈরী যুদ্ধসংক্ষুব্ধ এক পরিবেশে দায়িত্ব পালন করছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী রসদ সরবরাহ কেন্দ্রগুলো সামরিক সংঘাতের কারণে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন বাহিনী রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে মিশনের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়গুলো অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর তালিকায় প্রথমে খাবার, তারপর স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী সবশেষে চিঠি বা ডাকের স্থান। নৌবাহিনীর দাবি, যুদ্ধজাহাজ থেকে আসা সাম্প্রতিক প্রতিবেদন নিশ্চিত করছে যে সেখানে পরিষ্কার পানি, সচল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রতিবেলার খাবারে দুটি আমিষের ব্যবস্থা রয়েছে। রসদ সরবরাহের প্রবাহ দিন দিন আরও উন্নত হচ্ছে।

গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত দুটি সভার (একটি সশরীর অন্যটি অনলাইনে) একটিতে নেভাল এয়ারফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল ডগলাস ভেরিসিমো, নেভাল সারফেস ফোর্সেসের কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জোসেফ কাহিলসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ভারপ্রাপ্ত নৌ সেক্রেটারি হাং কাও সশরীর উপস্থিত থাকলেও ভিডিও কলে যুক্ত ছিলেন না।

সভায় অংশ নেওয়া এক নারী কাও, ভেরিসিমো কাহিলকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনারা আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার বিশ্বাসের জায়গাটি সম্পূর্ণ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।

সামরিক সংবাদমাধ্যমইউএসএনআই নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ১৬২ দিনের একটি মোতায়েন শেষে ঘরে ফেরার এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সান ডিয়েগোর নিজস্ব বন্দর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েনের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল লিংকন। কিন্তু এর পরপরই রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয় এবং গত জানুয়ারি মাসে সেটি সেখানে পৌঁছায়। সেই থেকে আজ অবধি যুদ্ধজাহাজটি আরব সাগরেই অবস্থান করছে।

সামরিক নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা আব্রাহাম লিংকন কবে দেশে ফিরবে সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে জানান নাবিকদের স্ত্রীরা।

বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, লিংকন যুদ্ধজাহাজের নাবিক এবং তাঁদের পরিবারের বর্ণনা করা পরিস্থিতিগুলো সমুদ্রে থাকা সেনাসদস্যদের জন্য তীব্র মানসিক চাপের অন্যতম প্রধান কারণ।

একাডেমিক জার্নালমিলিটারি মেডিসিন’- ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মোতায়েনকালে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশ্রাম নিতে না পারা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগই নাবিকদের সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।

বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার এবং উভচর যুদ্ধজাহাজে কর্মরত ৯৫৬ জন নাবিকের ওপর পরিচালিত সমীক্ষায় আরও উঠে আসে যে পরিবার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে জটিলতা এবং মানসিক চাপ কমানোর সুযোগের অভাবও তাঁদের বড় উদ্বেগের কারণ।

নৌবাহিনীতে দীর্ঘ ২০ বছর দায়িত্ব পালন করা চারবার মোতায়েন হওয়া অবসরপ্রাপ্ত চিফ পেটি অফিসার থমাস নাটজম্যান জানান, একটি মোতায়েন কবে শেষ হবে, তা না জানাটা নাবিকদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে নাটজম্যান বলেন, ‘সেখানে কোনো সোম, মঙ্গল বা বুধবার নেই; প্রতিটি দিনই যেন একটি দিন। আপনি আপনার সাধ্যমতো ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করেন।

সংকটের জায়গাটি উল্লেখ করে নাটজম্যান বলেন, ‘সমস্যা হলো, আপনি যখন অনেক লম্বা সময় সমুদ্রে থাকবেন, তখন মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা একটা সময় এসে থমকে যাবেআর ঠিক সেখান থেকেই মানসিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করবে।
সূত্র: প্রথম আলো