পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ভারতে শিক্ষার্থী ও তরুণেরা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ওই আন্দোলন শুরুর প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি বিরল সেলফি ভিডিও পোস্ট করেন।
পোস্টে
৭৫ বছর বয়সী এই
প্রধানমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের দুর্ভোগ দেখে কষ্ট পাচ্ছেন
জানিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু
গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গভীর রাতে সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ওই ভিডিও আন্দোলনকারীদের
সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
ইনস্টাগ্রামেই
গত মে মাসে জন্ম
হয় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি)। মাত্র কয়েক
দিনের মধ্যেই অনলাইনে দলটির অনুসারী সংখ্যা ২ কোটি ২০
লাখ ছাড়িয়ে যায়। অনুসারীদের বেশির
ভাগই বয়সে তরুণ, যারা
জেন–জি প্রজন্ম নামে
পরিচিত।
মেডিকেল
ভর্তি পরীক্ষা ‘ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট
(নিট-ইউজি)’–এর প্রশ্নপ্রত্র ফাঁস
এবং পরীক্ষা বাতিলের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে জুন মাস থেকে
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়।
২০ জুলাই শিক্ষার্থীরা যন্তর মন্তর থেকে ‘সংসদ চলো’ যাত্রা
শুরু করলে পুলিশ তাদের
বাধা দেয়, পরিস্থিতি সহিংস
রূপ নেয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের
লাঠিপেটা করে এবং টিয়ার
গ্যাসের শেল ছোড়ে। বেশ
কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
সেদিনের
ওই সহিংসতা ও পুলিশি দমন-পীড়নের পর আন্দোলন আরও
বেগবান হয়। সারা দেশ
থেকে লোকজন, বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীরা
বিক্ষোভে অংশ নিতে দিল্লিতে
আসেন। বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
আন্দোলনের
মুখে অবশেষে গতকাল শনিবার শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র পদত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি পূরণ হয়,
যা প্রধানমন্ত্রী মোদির জন্য একটি বিরল
রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ধর্মেন্দ্র
প্রধানের পদত্যাগ সিজেপির স্পষ্ট জয় হিসেবে দেখা
হচ্ছে। সিজেপির তরুণ সমর্থকেরা র্যাপ
সংগীত, প্ল্যাকার্ড ও দেয়াললিখনের মাধ্যমে
প্রকাশ্যেই মোদিকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ
করেছেন। কয়েক সপ্তাহ আগেও
এমন ঘটনা প্রায় অকল্পনীয়
ছিল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায়
আসার পর থেকে ভারতের
রাজনীতি প্রায় পুরোপুরি মোদিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল।
লন্ডনের
এসওএসএস বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সঞ্জয় শ্রীবাস্তব বলেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক
মানুষের মধ্যে আদতে হয়তো তাঁর
(মোদির) সমর্থকেরাও ছিলেন—এটি অতীতের অন্যান্য
বিক্ষোভ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন
একটি বিষয়।
এই অধ্যাপক আরও বলেন, ‘এটিকে
একটি জয় হিসেবে (জেন–জিদের) দেখাও যেতে পারে। যদি
তা–ই হয়, তবে
এখন অনেক বড় পরিসরের
মানুষ সরকারকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছে।
ক্ষমতাসীন দল দেশের জন্য
অবশ্যই ভালো—বড় একটি
জনগোষ্ঠী এমন ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ
করতে শুরু করেছে।’
বিশ্লেষকেরা
বলেন, বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায়। তবে এর পেছনে
আরও কিছু বিষয় কাজ
করেছে। তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব নিয়ে উদ্বেগ এবং
ভারতের পরিচিত আইটি খাতে কৃত্রিম
বুদ্ধিমত্তা (এআই) জোয়ার তাদের
চাকরি কেড়ে নিতে পারে,
এমন ভয়ও এ বিক্ষোভের
পেছনে কাজ করছে।
ভারতের
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিতাভ তিওয়ারি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস ছিল এ
আন্দোলনের একটি তাৎক্ষণিক উদ্দীপক।
এটি মূলত তরুণদের মধ্যে
থাকা উদ্বেগ, অস্থিরতা, অসন্তোষ, হতাশা ও ক্ষোভেরই প্রতিফলন।’
মোদির
মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্য রাজনাথ সিং বলেন, ‘সরকারের
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত
উদ্বেগগুলো বোঝা, দ্রুত সেগুলোর সমাধান করা এবং তাঁদের
এ আশ্বাস দেওয়া যে তাঁদের কথা
শোনা হচ্ছে।’
জেন-জি প্রজন্ম কী চায়, তা বুঝতে কি সরকার ব্যর্থ
তিওয়ারি
বলেন, ধারণা করা হয়, ভারতের
মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স
১৮ থেকে ৪০ বছরের
মধ্যে। কিন্তু লোকসভায় তাঁদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ। ১৯৫০-এর দশকে এ
হার এটির দ্বিগুণের বেশি
ছিল। বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার গড় বয়স ৬০
বছরের বেশি।
সিজেপি
কোনো রাজনৈতিক দল নয়। তবু
বিরোধী দলগুলো মোদিবিরোধী এ বিক্ষোভকে তাদের
সামনে বিরল রাজনৈতিক সুযোগ
হিসেবে দেখেছে এবং তা কাজে
লাগানোর চেষ্টা করেছে। শিক্ষার্থীদের দাবির পাশে দাঁড়িয়ে তারা
এ আন্দোলনকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চেয়েছে।
তরুণদের
এ ক্ষোভের পর মোদির দলের
প্রথম পরীক্ষা হতে পারে, আগামী
বছর ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব ও মোদির নিজ
রাজ্য গুজরাটের নির্বাচন। উত্তর প্রদেশ ও গুজরাট—দুই
রাজ্যই বিজেপিশাসিত।
আর যদি সিজেপি নিজেকে
একটি রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করে,
তবে মোদির জন্য বড় ঝুঁকি
তৈরি হতে পারে ২০২৯
সালের জাতীয় নির্বাচনে।
তবে
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, তাঁর দলের নির্বাচনী
রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে
এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া
হয়নি।
কয়েকজন
বিশ্লেষক বলেছেন, এত দিন তরুণ
ভোটাররা মূলত ধর্মীয় বা
জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে ভোট দিয়ে এসেছেন,
যা মোদির হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি)
সুবিধা দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি এখন
বদলাতে পারে।
নিজের
দল গঠন করে এবং
বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে এবার
ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর নির্বাচনে অংশ নেন চলচ্চিত্র
অভিনেতা চন্দ্রশেখর জোসেফ বিজয় (থালাপতি বিজয়)। তাঁর দল
বিপুল ভোটে জয়লাভ করে।
তিনি এখন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী।
ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক জেন-জি ভক্ত-সমর্থকদের ভোটই তাঁকে এ
সাফল্য এনে দিয়েছে বলে
ধারণা করা হয়।
লেখক
অনুরাগ ভার্মা বলেন, ‘এটি প্রধানমন্ত্রী মোদির
জন্য আত্মসমালোচনার একটি মুহূর্ত হয়ে
দাঁড়িয়েছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে
যে জেন-জিরা কী
চায়, তা নিয়ে তারা
সম্পূর্ণভাবে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন।’
‘বছরের
পর বছর ধরে বিজেপির
ডিজিটাল রাজনৈতিক কৌশলের মূল কেন্দ্রে ছিল
এক্স-এর মতো প্ল্যাটফর্ম,
যেখানে রাজনৈতিক আলোচনা-বিতর্কের বড় অংশ হতো।
কিন্তু এখন সেই আলোচনা
ক্রমশ ইনস্টাগ্রামের দিকে সরে গেছে,
বিশেষ করে তরুণ ব্যবহারকারীদের
মধ্যে।’
বিজেপি
হয়তো ভারতের অধিকাংশ অংশ শাসন করে
এবং নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল
বলে দাবি করে। কিন্তু
ইনস্টাগ্রামে বছরের পর বছরেও তাদের
অনুসারীর সংখ্যা মাত্র ১ কোটি হয়েছে।
সিজেপি মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই
যে সংখ্যক অনুসারী পেয়েছে, এটা তার অর্ধেকেরও
কম।
এক্সে
বিজেপির অনুসারী রয়েছে ২ কোটি ৩০
লাখ এবং ফেসবুকে ১
কোটি ৮০ লাখ। তবে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এ তিনটি প্ল্যাটফর্মেই
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত অনুসারীর সংখ্যা অনেক—প্রায় ৬
কোটি থেকে ১০ কোটি
৭০ লাখের মধ্যে।
কলাম
লেখক সন্তোষ দেশাই বলেন, ‘ইনস্টাগ্রামের জন্য একধরনের নিজস্বতা
ও সত্যিকারের ভাবমূর্তি প্রয়োজন। আগে থেকে তৈরি
করা, খুব যত্ন করে
সাজানো-গোছানো বার্তা এখানে কাজ করবে না।
এ মাধ্যমটি এই প্রজন্মই তৈরি
করেছে এবং এই প্রজন্মের
কারণেই এটি বর্তমান রূপ
পেয়েছে। এই প্রজন্মের মধ্যে
অন্ধ শ্রদ্ধাবোধ নেই।’
গত প্রায় এক যুগ ধরে
মোদি এমন একজন শক্তিমান
নেতা হিসেবে দেশ শাসন করেছেন,
যিনি নিজের ভুল খুব কমই
স্বীকার করেন। তাঁর সরকার দীর্ঘদিন
ধরে কোনো চাপের মুখে
মন্ত্রীদের সরিয়ে দিতে অনিচ্ছুক ছিল।
২০২১
সালে বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিল
করতে মোদিকে বাধ্য করার জন্য ভারতীয়
কৃষকদের প্রায় এক বছর আন্দোলন
করতে হয়েছিল। কিন্তু এবার মাত্র ৩৬
দিনের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সফল হয়, শিক্ষামন্ত্রী
পদত্যাগ করেন।
তিওয়ারি
বলেন, ‘এখন থেকে যে
নেতা মানুষের কথা শুনবেন, তিনিই
ভালো করবেন। আর মোদি এখন
সেটাই দেখানোর চেষ্টা করছেন।’