অবশেষে আপন ডেরায় ফিরেছে হরিণ শিকারের ফাঁদে আটকা পড়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার। প্রায় ছয় মাস চিকিৎসা পুনর্বাসনের পর রবিবার (১২ জুলাই) বাগেরহাটের সুন্দরবনে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করেছে বন বিভাগ। অবমুক্তির পর তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২০টি ক্যামেরা বসিয়ে মনিটরিং করা হবে।

এটি প্রথমবারের মতো বন থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসা পুনর্বাসনের পর কোনো বাঘকে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করার ঘটনা।

রবিবার (১২ জুলাই) সকাল ৮টার দিকে বাগেরহাটের মোংলা ফুয়েল জেটি থেকে লোহার খাঁচায় বন্দি বাঘিনীকে বন বিভাগের ট্রলার এমএল সোয়াচ-- করে নদীপথে সুন্দরবনের উদ্দেশে নেওয়া হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আন্ধারমানিক টহল ফাঁড়ি-সংলগ্ন আন্দারিয়া খালে ট্রলারটি নোঙর করা হয়।

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুর ১২টার দিকে বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে প্রবেশের জন্য খাঁচার দরজা খুলে দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় চেষ্টা পরও সেটি খাঁচা থেকে বের হচ্ছিল না। পরে দুপুর ১টার দিকে ট্রলারটি বনের আরও কাছে নেওয়া হয় এবং খাঁচার এক পাশ উঁচু করে দিলে বাঘিনীটি এক লাফে বনের ভেতরে চলে যায়। মুহূর্তেই সেটি চোখের আড়ালে মিলিয়ে যায়।

এর আগে, শনিবার দিবাগত রাতে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে ট্রাঙ্কুইলাইজার গানের মাধ্যমে বাঘটিকে অজ্ঞান করা হয়। পরে ভোরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে সেটিকে মোংলায় নেওয়া হয়।

বন বিভাগ সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি বন বিভাগের কাছে খবর আসে, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খাল থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার ভেতরে বৈদ্যমারি ফরেস্ট টহল ফাঁড়ি এলাকায় হরিণ শিকারের ফাঁদে একটি বাঘ আটকা পড়েছে। খবর পাওয়ার পরপরই অনুসন্ধান শুরু হলেও উদ্ধার অভিযান শুরু হতে এক দিন সময় লাগে।

পরদিন জানুয়ারি দুপুরের আগে খুলনা বিভাগের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদের নেতৃত্বে বন বিভাগের ভেটেরিনারি সার্জনসহ একটি উদ্ধারকারী দল অভিযান শুরু করে। ট্রাঙ্কুইলাইজার গানের সাহায্যে বাঘটিকে অজ্ঞান করা হয়। দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অভিযান চালিয়ে দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে বাঘটিকে উদ্ধার করে শরকির খালের পাড়ে আনা হয়। হাজারো মানুষের উপস্থিতির মধ্যে কঠোর নিরাপত্তায় লোহার খাঁচায় আটকে পরে সেটিকে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ছয় মাস বনকর্মীদের পরিচর্যায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে বাঘিনীটি।

গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকারনাইন বলেন, বাঘটির পায়ে বড় ধরনের ক্ষত ছিল এবং শরীরেও নানা সমস্যা ছিল। প্রথম দিকে এটি কোনো খাবারই খাচ্ছিল না। রক্ত পরীক্ষাসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। শুরুতে কলিজা ছোট ছোট মাংসের টুকরা, পরে ছোট প্রাণী এবং শেষ দিকে ছাগল শুকরের মাংস খাওয়ানো হয়। ছয় মাসের প্রচেষ্টায় বাঘটিকে পুরোপুরি সুস্থ করা সম্ভব হয়েছে।

বাঘ উদ্ধার থেকে অবমুক্ত করা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘বাঘটি উদ্ধার করাই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। হাজার হাজার লোক বাঘ দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। সব বাধা উপেক্ষা করে বাঘ উদ্ধার করি। সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে বাঘটি সুস্থ হয়। এটাই প্রথম কোনো বাঘ বনের বাইরে যাওয়ার পরে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হলো। এটা আমাদের জন্য খুবই আনন্দের।

প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘অসুস্থ বাঘটিকে সুস্থ করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তারপরও সকলের চেষ্টায় আমরা পেরেছি, এটা বন বিভাগের জন্য একটি মাইলফলক। বন বিভাগের সকল প্রাণী জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘সুস্থ বাঘটিকে এখন প্রকৃতিতে নিজের মতো করে বেঁচে থাকতে হবে। শিকার করে খাবার সংগ্রহ করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি, বাঘটি সুস্থভাবে আরও অনেকদিন সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে থাকবে। এজন্য তার গতিবিধি শনাক্ত করতে ২০টি ক্যামেরার মাধ্যমে ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা মনিটরিং করা হবে।

পরিবেশ, বন জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাঘটিকে সুস্থ করে বনে ফিরিয়ে দেওয়া গেছে, এটাই আমাদের আনন্দ। আসলে বন্যেরা বনে সুন্দর। সুন্দরবনে আজ একটি ইতিহাস সৃষ্টি হলো। আমরা বিশ্বাস করি, এখানে বাঘটি ভালো থাকবে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এর আগে সুন্দরবন থেকে একটি বাঘ ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই বাঘটিকে আর সুন্দরবনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।

ইউএনবি