ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আঙ্কারা সফরকে ঘিরে তুরস্কের প্রত্যাশা বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সফরের ফলে তুরস্ক বেশ কয়েকটি এফ-১১০ যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন সংগ্রহের পথ সুগম করতে পারে। তবে দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের কারণ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি নিয়ে বিরোধের সমাধান হবে না।

জুলাই অনুষ্ঠেয় ন্যাটো সম্মেলনের আয়োজক প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান। এতে সামরিক জোটটির ৩২ সদস্য দেশের নেতারা অংশ নেবেন।

গত মাসে তুরস্কের এফ-১১০ যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন সংগ্রহ এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, তিনি এরদোগানকে 'খুব খুশি' করবেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এর অর্থ হতে পারে তুরস্কের প্রধান কেএএএন স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন সরবরাহে অনুমোদন দেওয়া।

ইস্তাম্বুলভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইডামের পরিচালক সিনান উলগেন এএফপিকে বলেন, 'কেএএএন যুদ্ধবিমানের জন্য প্রায় ৪০টি এফ-১১০ জিই ইঞ্জিন সরবরাহে সবুজ সংকেত মিলতে পারে। সরবরাহে কিছু বাধা ছিল। এখন সেগুলো সম্ভবত দূর হচ্ছে।'

তিনি বলেন, 'তুরস্ক ইতোমধ্যে এফ-১১০ ইঞ্জিন ব্যবহার করে কেএএএনের দুটি প্রোটোটাইপ তৈরি করেছে, যা উড্ডয়ন করছে। তবে আরও বেশি কেএএএন প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য অতিরিক্ত ইঞ্জিন সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে।'

কেএএএন হলো তুর্কির অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ (টিএআই) নির্মাণাধীন দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট একটি স্টেলথ যুদ্ধবিমান। তুরস্কের বিমানবাহিনীর এফ-১৬ বহরের পরিবর্তে এটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন রাশিয়ার মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদনকারী দেশের কাতারে যোগ দেওয়াও আঙ্কারার লক্ষ্য।

যদিও ভবিষ্যতে এই যুদ্ধবিমানে তুরস্কের নিজস্ব তৈরি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে। কারণ, এফ-১১০ ইঞ্জিনে স্টেলথ সক্ষমতা নেই। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের গত সেপ্টেম্বরে জানান, দেশীয় ইঞ্জিন তৈরির প্রকল্প এখনো প্রাথমিক নকশা পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, গত সেপ্টেম্বরে তুরস্ক প্রথম দফায় ১০টি এফ-১১০ ইঞ্জিন পেয়েছে। আরও ৮০টি ইঞ্জিন সংগ্রহের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলমান রয়েছে।

 দেশীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর জোর

পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গত সেপ্টেম্বরে বলেন, ২০১৭ সালে রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে রাজনৈতিক অনুমোদন না মেলায় ইঞ্জিন সরবরাহ আটকে রয়েছে।

ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওয়াশিংটন ২০১৯ সালে তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। এক বছর পর 'কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভার্সারিজ থ্রু স্যাংশনস অ্যাক্ট' (ক্যাটসা) অনুযায়ী তুরস্কের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এতে দেশটির প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত হয় এবং দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়।

ফিদান বলেন, 'ক্যাটসা-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হতে হবে। এফ-৩৫ এবং কেএএএনের ইঞ্জিনÑউভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রকে পদক্ষেপ নিতে হবে। কেএএএনের ইঞ্জিন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।'

তার এই বক্তব্য তুরস্কে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ, আঙ্কারা আগে জানায়, কেএএএন সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হবে।

এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ায় তুরস্ককে আত্মনির্ভরশীলতার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে।

আঙ্কারায় জার্মান মার্শাল ফান্ডের প্রধান ওজগুর উনলুহিসারচিকলি বলেন, 'অনেকে মনে করেন, আমাদের এফ-৩৫ কেনা উচিত নয়। বরং সেই অর্থ নিজস্ব পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করা উচিত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন রপ্তানির সিদ্ধান্তে ঠিক সেটাই ঘটছে।'

তিনি বলেন, 'এই ইঞ্জিন ছাড়া তুরস্ক কেএএএন যুদ্ধবিমান তৈরি করতে পারবে না।'

এফ-৩৫ ইস্যুতে অচলাবস্থা বহাল

কেএএএন সরবরাহ শুরু হতে এখনো বহু বছর বাকি। এখন পর্যন্ত শুধু ইন্দোনেশিয়া ৪৮টি যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ১০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। তবে উলগেনের মতে, ন্যাটো সম্মেলনের পর আরও কিছু দেশের আগ্রহ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, 'জার্মানি-ফ্রান্সের এফসিএএস উদ্যোগের ব্যর্থতা বিবেচনায় কিছু দেশের আগ্রহ দেখা যেতে পারে। স্পেন সম্ভাব্য অংশীদার হতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোরও আগ্রহ থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এটি বিশ্বাসযোগ্য প্রস্তাব হয়ে উঠতে হলে আরও অনেক বাধা অতিক্রম করতে হবে।'

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এফ-৩৫ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনা কম। কারণ, ক্যাটসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কংগ্রেসের সম্মতি পেতে হলে তুরস্ককে এস-৪০০ ব্যবস্থা সরিয়ে ফেলতে হবে। কিন্তু সেটি তৃতীয় কোনো দেশের কাছে বিক্রি করতে রাশিয়ার অনুমতি প্রয়োজন। আর রাশিয়াকে সেটি ফিরিয়ে দেওয়ারও কোনো সম্ভাবনা নেই।

ইস্তাম্বুলের কাদির হাস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুস্তাফা আইদিন বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন হয়তো বিষয়টি পেছনে ফেলে তুরস্ককে কিছু এফ-৩৫ বিক্রি করতে চাইতে পারে। কিন্তু বিষয়টি কংগ্রেসে যাবে। আর কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা সহজ হবে না।'

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক এবং হোয়াইট হাউস পররাষ্ট্র দপ্তরের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ম্যাথিউ ব্রাইজা মনে করেন, ট্রাম্প চাইলে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে পারেন। কারণ, এফ-৩৫ কর্মসূচি ছিল নির্বাহী সিদ্ধান্তের বিষয়, যা তিনি সহজেই পরিবর্তন করতে পারবেন।

তিনি এএফপিকে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্যই ঘোষণা করতে পারেন যে, এস-৪০০ এফ-৩৫ বিরোধের অবসান হয়েছে। তবে ক্যাটসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কংগ্রেসের পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি কংগ্রেসকে রাজি করাতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে বিষয়ে তিনি কতটা রাজনৈতিক মূলধন ব্যয় করতে প্রস্তুত।'

তিনি বলেন, গ্রিক আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত তুরস্কবিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ নেওয়া ট্রাম্পের জন্য 'রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল' হতে পারে।

এএফপি, ইস্তাম্বুল