যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় নিহত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি শুক্রবার শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ নেতারা। একই সঙ্গে তাঁর মরদেহ যেখানে শায়িত রয়েছে, সেই তেহরানে শোকাহত মানুষ ও মিত্র দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সমাগম শুরু হয়েছে।
তেহরান
থেকে এএফপি জানায়, কর্তৃপক্ষের ধারণা, দাফনের আগে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান
ও শোভাযাত্রায় কয়েক কোটি মানুষ
অংশ নেবেন। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শুরুতে চার মাস আগে
নিজ বাসভবনে হামলায় ৮৬ বছর বয়সে
নিহত হন খামেনি।
এএফপির
প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, রাজধানীর
বিশাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা ধর্মীয় কমপ্লেক্সে শোকাহত মানুষ কাঁধে করে খামেনির কফিন
বহন করছেন। তিন দশকের বেশি
সময় ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্র
ইরানের নেতৃত্ব দেওয়া খামেনির কফিন দেশটির জাতীয়
পতাকায় মোড়ানো ছিল।
ইরানের
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ফুটেজে শুক্রবার বিকেলে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক
মোহাম্মদ বাকের কালিবাফকে খামেনির কফিনে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়।
সামরিক
বাহিনীর আদর্শিক শাখা **ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)’র প্রধান আহমাদ
বাহিদিও ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম
জনসমক্ষে উপস্থিত হন।
মধ্যপ্রাচ্য
যুদ্ধ অবসানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের
মধ্যে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এবং আফগানিস্তানের তালেবান
সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও খামেনির প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।
শনিবারের
রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আগে ফিলিস্তিনি সংগঠন
হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহর
প্রতিনিধিদলও শোকানুষ্ঠানে অংশ নেয়।
প্রায়
৩০টি দেশের প্রতিনিধি শেষকৃত্যে যোগ দেবেন বলে
আশা করা হচ্ছে। চীন
এবং ককেশাস অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোও প্রতিনিধি পাঠানোর কথা জানিয়েছে।
দেশপ্রেম
ও খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এ বিশাল আয়োজন
উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তেহরান।
৬১ বছর বয়সী শিক্ষক
এজ্জাত শোআই এএফপিকে বলেন,
‘রাজধানীর বাইরে থেকে যারা আসছেন,
তাদের স্বাগত জানাতে আমরা আমাদের বাড়িঘর
প্রস্তুত করেছি।’
তিনি
বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আমরা সবাই মিলে
আমাদের প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে
যাব।’
‘প্রতিশোধের
আহ্বান’
বৃহস্পতিবার
কালিবাফ দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সমস্ত ইরানি জনগণ তাদের উপস্থিতির
মাধ্যমে ইসলামি ইরানের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়
রচনা করুন।’
তিনি
আরও বলেন, ‘প্রতিশোধের জন্য জাতির আহ্বান
যেন পুরো বিশ্বের কানে
পৌঁছে যায়।’
শেষকৃত্য
উপলক্ষে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গ্র্যান্ড মোসাল্লার দেয়ালজুড়ে খামেনির প্রতিকৃতি ও উদ্ধৃতিসংবলিত ব্যানার
টাঙানো হয়েছে।
রাজধানীর
অন্য একটি বড় পার্ককে
অস্থায়ী শিবিরে রূপান্তর করা হয়েছে। সেখানে
রেড ক্রিসেন্টের শত শত তাঁবু
স্থাপন করা হয়েছে।
খামেনির
শেষযাত্রা যে আজাদি অ্যাভিনিউ
দিয়ে যাবে, সেই সড়ক থেকে
বিভিন্ন প্রতিবন্ধকও সরিয়ে ফেলতে দেখা গেছে।
শোকযাত্রীদের
গরম থেকে স্বস্তি দিতে
রাস্তায় পানি ছিটানোর জন্য
ট্যাংকার মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি
লাল পতাকায় সজ্জিত একটি প্রতীকী নৌকাও
স্থাপন করা হয়েছে, যা
শিয়া ঐতিহ্যের একটি প্রতীক।
খামেনির
মরদেহ তিন দিন সর্বসাধারণের
শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে।
তাঁর হামলায় নিহত পরিবারের সদস্যদের
মরদেহও সেখানে রাখা হয়েছে।
তাদের
মধ্যে রয়েছে তাঁর তিন বছর
বয়সী নাতনির মরদেহও, যার কফিনও ইরানের
জাতীয় পতাকায় মোড়ানো।
তেহরানে
ছুটি, শহর ছাড়ছেন অনেক
বাসিন্দা
শেষকৃত্য
ও দাফনের বিভিন্ন ধাপ উপলক্ষে তেহরান
ছাড়াও পবিত্র শহর কোম ও
মাশহাদে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা
হয়েছে।
শনিবার
থেকে সোমবার পর্যন্ত তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস
বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একই
সঙ্গে যান চলাচলে বিধিনিষেধের
কারণে শহরের কেন্দ্রীয় অংশের বড় এলাকা ব্যক্তিগত
গাড়ির জন্য বন্ধ থাকবে।
শুক্রবার
থেকে তেহরানের আকাশসীমা আংশিক এবং সোমবার পুরোপুরি
বন্ধ থাকবে।
তেহরানের
আনুষ্ঠানিকতা শেষে খামেনির মরদেহ
ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও
কারবালায় নেওয়া হবে। এরপর ৯
জুলাই তাঁর জন্মস্থান উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরের ইমাম রেজার মাজারে
তাঁকে দাফন করা হবে।
সর্বোচ্চ
নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে জনসমক্ষে
না আসা খামেনির ছেলে
ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি মূল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে
উপস্থিত থাকবেন কি না, তা
এখনও নিশ্চিত নয়।
অনুষ্ঠানের
আগে এএফপির প্রতিনিধিরা জানান, সাধারণ সময়ের তুলনায় তেহরান অনেকটাই শান্ত। ব্যস্ত সড়কগুলোতেও স্বাভাবিক যানজট দেখা যায়নি।
প্যারিসে
অবস্থানরত এএফপির সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন
তেহরানবাসী জানান, তারা শহর ছেড়ে
যাচ্ছেন।
২৯ বছর বয়সী প্রযুক্তিকর্মী
সাঈদ বলেন, ‘তেহরান থেকে বের হওয়ার
সড়কগুলো গাড়িতে ভরে গেছে।’
তিনি
বলেন, ‘অনেকেই ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলে চলে গেছেন। আমিও
যাচ্ছি, কারণ শহরে থাকা
এখন সত্যিই খুব কঠিন হয়ে
পড়েছে।’
বাসস