বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল করতে দিতে সম্মত হয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। এমনকি ইসরায়েলের জাহাজেও হামলা করবে না বলে জানিয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবের জাহাজকে কোনও অবস্থাতেই ছাড় দেওয়া হবে না। ওমানে মার্কিন কূটনৈতিক দলের সঙ্গে সাম্প্রতিক বৈঠকে ইরানের মদতেপুষ্ট শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর তরফে স্পষ্ট ভাবে এ কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চলতি
সপ্তাহের গোড়ায় পশ্চিম এশিয়ার দেশ ওমানে মার্কিন
কূটনৈতিক দল হুথি প্রতিনিধিদের
সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানেই
লোহিত সাগর এবং এডেন
উপসাগরের সঙ্গে আরব সাগরের সংযোগকারী
বাব আল-মান্দেব প্রণালী
দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে দু’পক্ষের
আলোচনা হয়। ওয়াশিংটনের প্রস্তাব
মেনে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের উপর হামলা বন্ধ
করতে নিমরাজি হলেও হুথির তরফে
জানিয়ে দেওয়া হয়, সৌদি আরবের
জাহাজকে তারা ছাড় দেবে
না।
১০ সেপ্টেম্বর ইয়েমেনের মোখা বন্দরের দখল
করে হুথি গোষ্ঠী। ১১
সেপ্টেম্বর পেরিম দ্বীপও তাদের দখলে চলে যায়।
লোহিত সাগরের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ
এলাকা ইরানের সমর্থনপুষ্ট শিয়া জঙ্গিগোষ্ঠীটি কব্জা
করে নেওয়ায় কার্যত বন্ধ হতে চলেছে
বাব আল-মান্দেব প্রণালী।
এক দিকে আরব উপদ্বীপের
ইয়েমেন, অন্য দিকে, আফ্রিকার
জিবুতি ও এরিট্রিয়ার মধ্যবর্তী
এই সরু জলপথটি বিশ্ব
বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে লোহিত সাগর-এডেন উপসাগর-আরব সাগরের সংযোগ রক্ষাকারী বাব
এল-মান্দেব প্রণালীতে সৌদি আরবের তেলবাহী
জাহাজের উপর নৌ-অবরোধ
ঘোষণা করেছিল হুথি। এর পরে তারা
একাধিক বার সৌদি ও
ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজে হামলাও চালিয়েছে।
গত ১০ দিনে হুথি
বাহিনীর সঙ্গে লড়াইয়ে কোণঠাসা ইয়েমেন সেনা কার্যত লোহিত
সাগরের উপকূলবর্তী পুরো এলাকারই দখল
হারিয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে হরমুজ় প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বার বার বন্ধ
হচ্ছে। এই আবহে গুরুত্ব
বেড়েছিল বাব আল-মান্দেবের।
কিন্তু মোখা এবং পেরিমের
পতনের পরে ওই প্রণালীর
‘ভবিষ্যৎ’ নিয়েও প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। সম্প্রতি
দিল্লিতে ব্রিক্স সম্মেলনে ইরানের
সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির বৈঠকেও
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে
বলে সূত্রের খবর। এই আবহে
বুধবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি
ভান্স প্রথম হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে
আলোচনার কথা জানিয়েছিলেন।
কিন্তু
সৌদি সম্পর্কে কেন অনড় হুথি?
এর নেপথ্যে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার আঞ্চলিক সামরিক সমীকরণ। সৌদির মদতে পুষ্ট ইয়েমেন
সরকারের সেনা বহু বছর
ধরে উত্তরের ইরান-সমর্থিত হুথি
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। ২০২৩-এর অক্টোবরে গাজ়ায়
সংঘর্ষ শুরুর পরে ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে
যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল হুথি। সে সময় ইজ়রায়েলে
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
চালিয়েছিল তারা। পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনার সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টিকম) বাহিনী চলতি বছরের গোড়া
থেকে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। সৌদির
মদতে পুষ্ট ইয়েমেনের সুন্নি মুসলিম গোষ্ঠীর সরকারও শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠী
হুথিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালালেও রাজধানী সানা-সহ উত্তর
ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ অংশ হুথিদের নিয়ন্ত্রণে।
সেখান থেকে তারা ধারাবাহিক
ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে সৌদি ভূখণ্ডে।
অন্যদিকে,
পশ্চিম এশিয়ায় আর এক দেশ
সংযুক্ত আরব আমিরশাহি দীর্ঘদিন
ধরে সহায়তা করেছে দক্ষিণ ইয়েমেনে সক্রিয় গণতন্ত্রপন্থী সুন্নিগোষ্ঠী ‘সাদার্ন ট্রানজ়িশনাল কাউন্সিল’ (এসটিসি)-কে কিন্তু সৌদি
আরবের হুমকির জেরে গত বছরের
শেষপর্বে এসটিসি-কে সহায়তা বন্ধ
করার ঘোষণা করে আমিরশাহি। এর
পরে চলতি বছরের গোড়ায়
ইয়েমেন সেনা সৈদির মদতে
দক্ষিণ ইয়েমেনের এসটিসি নিয়ন্ত্রিত এলাকার দখল নেয়। কিন্তু
সৌদির প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও হুথিকে বাগে আনা সম্ভব
হয়নি। গাজ়ার হামাস, লেবাননের হিজ়বুল্লা, ইরাকের ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ) এবং আশাব আল-কাহ্ফের মতোই
ইয়েমেনের হুথিও তেহরানের ‘যৌথ প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি’
(অ্যাক্সিস অফ রেজ়িস্ট্যান্স)-র
অন্যতম অংশ। ২০২৪ সালের
ডিসেম্বরে হুথি বাহিনী ইজ়রায়েলে
হাইপারসনিক (শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ
বা তার বেশি গতিসম্পন্ন)
ক্ষেপণাস্ত্র ‘প্যালেস্টাইন-২’ দিয়ে হামলা
চালিয়েছিল সানায়।
রয়টার্স