রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে তারা বর্তমানে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে থাকা প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে তাদের দেশে ফেরত নিতে ইচ্ছুক। জান্তাসমর্থিত সরকার নিশ্চিত করেছে, এসব রোহিঙ্গা দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ছিলেন। মিয়ানমারের সেনাসমর্থিত সরকার শনিবার (১৫ আগস্ট) এক বিবৃতিতে ঘোষণা দিয়েছে।
মিয়ানমারের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতি এমন
একটি সময়ে এল, যখন
রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট ৯ বছরে
পড়ছে।
২০১৭
সালে নৃশংস সামরিক অভিযানের কারণে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা
(বাংলাদেশের হিসাবে আট লাখের বেশি)
সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের কক্সবাজারে আগে থেকেই কয়েক
লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। এসব সংখ্যালঘু মুসলিম
রোহিঙ্গাও মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও জাতিগত মিলিশিয়াদের
নৃশংস সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে
আগেই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তারা দীর্ঘদিন ধরে
বাংলাদেশে বসবাস করছে।
এই সামরিক অভিযানের সার্বিক ব্যাপ্তি, সুসংগঠিত রূপ ও ভয়াবহতার
কারণে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যাপকভাবে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের
অভিযোগ তুলেছিল।
মিয়ানমার
(পুরোনো নাম বার্মা) রোহিঙ্গাদের
দেশের ১৩৫টি সরকারি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে স্বীকৃতি দেয় না। তারা
রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে, যাতে বোঝানো
যায় যে তারা বাংলাদেশ
থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী।
মিয়ানমারের
কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮
লাখ ২৮ হাজার ৮২৪
জন শরণার্থীর একটি তালিকা মিয়ানমার
গত জুলাইয়ের শেষ নাগাদ যাচাই-বাছাই করেছে। কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, যাচাই করা ৪ লাখ
২৬ হাজার ৫৪৫ ব্যক্তির মধ্যে
৩ লাখ ৮ হাজার
৭৯৭ জন রাখাইনের বাসিন্দা
ছিলেন।
মিয়ানমারের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে, ১ লাখ ১৩
হাজার ৫০৭ ব্যক্তির পরিচয়
সফলভাবে যাচাই-বাছাই করা যায়নি। অন্যদিকে
৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী
কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিল বলে
সরকার দাবি করেছে।
বিবৃতি
অনুযায়ী, রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পর পরই যাচাই-বাছাই করা রোহিঙ্গা বাসিন্দাদের
ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকার
বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে।
মন্ত্রণালয়ের
বিবৃতিতে রাখাইন থেকে ১০ লাখের
বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তাদের যুক্তি, ২০১৭ সালে সহিংসতা
ছড়িয়ে পড়ার পর ৫
লাখ ৪০ হাজারের বেশি
মানুষ বাংলাদেশে ঢুকেছিল। আর ২ লাখের
বেশি মানুষ উত্তর রাখাইনেই রয়ে গেছে।
মিয়ানমার
ও বাংলাদেশ ২০১৮ সালে দুই
বছর মেয়াদি একটি প্রত্যাবাসন কাঠামোতে
সম্মত হয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালে সামরিক
অভ্যুত্থানে অং সান সু
চির নির্বাচিত সরকার উৎখাত হলে সেটার বাস্তবায়ন
ভেস্তে যায়। এরপর জান্তা শাসনের
বিরুদ্ধে ব্যাপক সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়।
প্রত্যাবাসনের
প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ
২০২৩
সালে এই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের
জন্য সামরিক বাহিনী এবং রাখাইনভিত্তিক সশস্ত্র
গোষ্ঠী আরকান আর্মির (এএ) মধ্যে নতুন
করে সংঘাত শুরু হলে আরও
বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রাণে বাঁচতে আরও বেশি শরণার্থী
বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশে
চলে গেছে। বিস্তৃত এলাকা দখলের পর আরকান আর্মি
এখন রাখাইনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ
করছে।
সাম্প্রতিক
বছরগুলোতে আশ্রয়শিবিরের অবনতিশীল পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ব্যাপক কাটছাঁট এবং মিয়ানমারে ফিরে
যাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে অনেক রোহিঙ্গা জীবনের
ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় করে
সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া
ও ইন্দোনেশিয়ায় চলে গেছেন বা
যাওয়ার চেষ্টা করে অনেকে প্রাণ
হারিয়েছেন।
গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছিলেন, মিয়ানমার প্রত্যাবর্তন উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাঁর
দেশে বসবাসরত পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা
শরণার্থীকে ফেরত নিতে সম্মত
হয়েছে।
তবে
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হান উইন অং
সে সময় বার্তা সংস্থা
এপিকে বলেছিলেন, এই কর্মসূচি কেবল
মালয়েশিয়ার আটককেন্দ্রে থাকা যাচাই করা
মিয়ানমারের নাগরিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
দ্য
ইনডিপেনডেন্ট