ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ‘হাতের পুতুল’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া জোট’। ঘোষণা করা হয়েছে একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মসূচি। আজ বুধবার রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিরোধী জোটের নেতাদের বৈঠকের পর কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ওই কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, আগামী ২ অক্টোবর থেকে শুরু হবে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও অভিযান’। চলবে ৮ তারিখ পর্যন্ত।
প্রধান নির্বাচন
কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ৬ অক্টোবর বিজেপি ছাড়া অন্যান্য সব দলের
সংসদ সদস্যরা মিছিল করে নির্বাচন সদনে যাবেন। গণতন্ত্র রক্ষা করতে আগামী ১ নভেম্বর
দিল্লিতে তাঁরা বিশাল সমাবেশ করবেন।
খাড়গে আরও জানান,
অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাঁরা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করার জন্য
সময় চাইবেন। তাঁকে তাঁরা জানাবেন, কীভাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করা
হচ্ছে।
আজ বেলা ১১টায়
সংসদ ভবনের কাছে কনস্টিটিউশন ক্লাবে ইন্ডিয়া জোটের এই বৈঠক বসে। ২০টি রাজনৈতিক দলের
নেতারা তাতে অংশ নেন।
বৈঠক শেষে সংবাদ
সম্মেলনে খাড়গে বলেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ না হলে গণতন্ত্রের সলিল সমাধি ঘটে। শাসকের
হাতের পুতুল জ্ঞানেশ কুমারের জন্য দেশের গণতন্ত্র বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। এ থেকে
দেশকে বাঁচাতে ২ থেকে ৮ অক্টোবর দেশের সব জেলায় বিরোধীরা ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেবে। পদযাত্রা করবে। সেই পদযাত্রা শেষ হবে জেলা শাসকের কার্যালয়ে।
খাড়গের তথ্যমতে,
৬ অক্টোবর দিল্লিতে সব বিরোধী সাংসদ নির্বাচন কমিশন অভিযানে অংশ নেবেন। অক্টোবর মাসে
দেশের বিভিন্ন রাজ্যে জোটের পক্ষ থেকে পাঁচটি বড় জনসভার আয়োজন করা হবে। কীভাবে ভোটচুরি
হচ্ছে, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে কীভাবে গণতন্ত্রের সর্বনাশ করা হচ্ছে, তা জনসাধারণকে
বোঝানো হবে। ১ নভেম্বর দিল্লিতে বিশাল জনসমাবেশ করা হবে।
প্রসঙ্গত, জ্ঞানেশকে
অপসারণের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টিও (সিজেপি) ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীর দিন মুম্বাইয়ে
আইন অমান্যের ডাক দিয়েছে। তারাও সারা দেশে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
আজ ইন্ডিয়া
জোটের বৈঠকের পর কংগ্রেস সভাপতি খাড়গে জানান, বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য সব
এনজিও, ছাত্রসমাজ এবং যাঁরা ভারতীয় সংবিধান ও গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, তাঁদের প্রত্যেককে
অনুরোধ করা হবে।
ইন্ডিয়া জোটের
শরিকদের মধ্যে আজকের বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ সরব
ছিলেন। জ্ঞানেশের অপসারণ দাবি করে তিনি বলেন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)
করে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ভোট লুট করেছে। আমরা কমিশনের কাছে গেছি, সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ
হয়েছি। এখন সবকিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। জ্ঞানেশ কুমার কত বড় চোর সবাই জেনে
গেছে। ভোট চুরির জন্য তিনি ইভিএম পর্যন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছেন। গণতন্ত্র রক্ষা করতে গেলে
তাঁকে অবিলম্বে সরিয়ে দিতে হবে।
এ সময় খাড়গে
বলেন, ভোটচুরির অভিযোগ রাহুল গান্ধী অনেক আগে থেকেই করছিলেন। অনেকে তখন তাঁকে গুরুত্ব
দেননি। আজ বোঝা যাচ্ছে সংকট কত গভীর। ভোটচুরির কারসাজি এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে
গেছে। রাহুলের কথা সবাইকে মেনে নিতে হচ্ছে।
ইন্ডিয়া জোটের
পক্ষ থেকে মল্লিকার্জুন খাড়গে আজ মোট ৬টি দাবি প্রকাশ করেছেন। তা হলো—ভবিষ্যতে
ভোট এসআইআর-পূর্ববর্তী ভোটার তালিকা অনুযায়ী করতে হবে। এসআইআরে কেন্দ্রওয়ারি ও বুথওয়ারি
কাদের নাম বাদ গেছে, কাদের নাম ঢোকানো হয়েছে এবং কী কী সংশোধন হয়েছে, সব দাখিল করতে
হবে। প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত সময়ের নোটিশ দিতে হবে, কেন বাদ দেওয়া
হচ্ছে তার স্পষ্ট কারণ দেখাতে হবে এবং আবেদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রশাসনিক অপদার্থতার
দরুন বা ভুলবশত নাম বাদ দেওয়ার হাত থেকে প্রকৃত ভোটারকে রক্ষা করতে হবে। ইলেকট্রনিক
ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পরিবর্তে ব্যালট প্রথার ভোটে ফিরে আসতে হবে। এমন এক কমিশন গঠন
করতে হবে, যা বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ বলে সবাই মনে করবে।
খাড়গে বলেন,
এই লড়াইটা সব বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একজোট হয়েই তাঁরা গণতন্ত্রকে
বাঁচাবেন। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়ে যে মামলাগুলো রয়েছে, সেগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির
আর্জি জানানো হবে।
আজকের বৈঠকে
বিরোধী তিনটি দল উপস্থিত ছিল না। সেগুলো হলো—ডিএমকে, আম আদমি পার্টি ও বিজু জনতা দল।
তবে ইন্ডিয়া জোটের কারও কারও দাবি, ওই তিন দলের নেতারা বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে
লড়াইয়ে তাঁরা রয়েছেন। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব না এলেও তাঁর দলের প্রতিনিধি
উপস্থিত ছিলেন। অসুস্থতার দরুন এনসিপি নেতা শরদ পাওয়ার আসতে পারেননি। তাঁর কন্যা সুপ্রিয়া
সুলে হাজির ছিলেন। শিবসেনা নেতা উদ্ধব ঠাকরে ও ঝাড়খন্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন
ভার্চুয়ালি যোগ দেন।
সূত্র: প্রথম
আলো