২০১৫ সালের মার্চ মাসে নির্বাচনের দিন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২৮ সেকেন্ডের একটি বিতর্কিত ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ডানপন্থী ভোটারদের সতর্ক করে বলেন যে, আরব নাগরিকরা ‘দল বেঁধে’ ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছে। এক সপ্তাহ পর, সবার প্রত্যাশাকে ভুল প্রমাণ করে তিনি জয়লাভ করেন। এরপর তিনি ক্ষমা চেয়ে বলেন যে, সামগ্রিকভাবে আরব সম্প্রদায়ের কাউকে অপমান করার উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না।

এগারো বছর এবং ছয়টি নির্বাচনের পর, নেতানিয়াহু আবারও সেই একই কৌশল অবলম্বন করছেন, তবে এবার অনেক বড় পরিসরে।

২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা একটি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন: আরব দলগুলো ঘুষ, বিদেশি অর্থায়ন এবং কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। তাঁরা ঘটনার তদন্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছেন; এমনকি চরমপন্থী অবস্থানে গিয়ে তাঁরা নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোটগ্রহণেরও দাবি তুলছেন।

এখন পর্যন্ত তাঁরা কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি, তবে তাঁদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট: ‘জয়েন্ট লিস্ট’ এবং ‘রাম’—এই দুটি আরব দলের বৈধতার ওপর প্রশ্ন তোলা। এই দল দুটিতে রেকর্ড সংখ্যক ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী নেতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার যেকোনো প্রচেষ্টায় এদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাডি আইজেনকোট বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় বলেন, “তাঁরা এসব করছেন কারণ তাঁরা হেরে গেছেন।”

নেতানিয়াহু নির্বাচনে পুরোপুরি হেরে যাননি, আবার জিতেও যাননি। আইজেনকোটের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ১২০ আসনবিশিষ্ট ইসরায়েলি সংসদে নিরঙ্কুশ বিজয়ের জন্য ৬১টি আসনের প্রয়োজন, যা তাঁদের কেউই অর্জন করতে পারেননি। ইসরায়েল এখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে—যা কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

নেতানিয়াহু ভালোভাবেই হিসাবটি বোঝেন। তাঁর জোটের আসন সংখ্যা কমে ৫৩-তে নেমে এসেছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কোনো স্পষ্ট পথ তাঁর সামনে নেই। আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের নিজস্ব আসন সংখ্যা ৪৮। তবে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন যুক্ত হলে, তাদের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭-তে, যা একটি স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা। নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করা একমাত্র সরকার—২০২১ সালের বেনেট-লাপিদ সরকার—এর অংশ ছিল ‘রাম’ পার্টি; প্রায় এক বছর টিকে থাকার পর সেই সরকার ভেঙে যায়। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মতে, নির্বাচনের পর তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো ইহুদি ও আরবদের মধ্যকার যেকোনো রাজনৈতিক সহযোগিতাকে অবৈধ প্রতিপন্ন করা এবং তা প্রতিরোধ করা, কারণ এটি তাঁর ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দিতে পারে।

এই প্রচেষ্টা নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগেই শুরু হয়েছিল।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে, নেতানিয়াহু এবং ‘রিলিজিয়াস জায়োনিস্ট’ পার্টির প্রধান বেজালেল স্মোত্রিখ আরব অধ্যুষিত এলাকায় ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রায় ২,০০০ পর্যবেক্ষক মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তাঁরা আরবদের ভোটকেন্দ্রগুলোকে এমন জায়গা হিসেবে চিত্রিত করেন, যেখানে জালিয়াতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নির্বাচনের দিন খুব সকালে, পুলিশ ‘রাম’ পার্টির তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ ওঠে, তাঁরা ভোটের বিনিময়ে অর্থ প্রদানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঘটনাটি ব্যাপক প্রচার পায়। ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১২ নিউজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রথম তথ্যটি দিয়েছিলেন নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ; তিনি প্রচলিত নিয়ম না মেনে সরাসরি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের জন্য পুলিশের করা অধিকাংশ আবেদন আদালত প্রত্যাখ্যান করে এবং সন্দেহভাজনদের কয়েকজনকে মুক্তিও দেওয়া হয়। তবে নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় নিয়োজিত দল বিষয়টিকে লুফে নেয়, গ্রেপ্তারের ঘটনাটিকে বড় করে প্রচার করে এবং দাবি করে যে, এটি ছিল “নির্বাচন চুরি” করার একটি প্রচেষ্টা।

ভোট গণনার সময় এই প্রচারণা আরও জোরদার হয়। বুধবার নেতানিয়াহুর ‘লিকুদ’ পার্টি জানায় যে, তারা ‘রাম’ এবং ‘জয়েন্ট লিস্ট’-এর বিরুদ্ধে ঘুষ প্রদান, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির অভিযোগ সম্বলিত শত শত সাক্ষ্য জমা দিয়েছে। একই সময়ে, নেতানিয়াহু-পন্থী ‘চ্যানেল ১৪’ প্রচার করে যে, কোনো বিদেশি উৎস থেকে কয়েক মিলিয়ন শেকেল (ইসরায়েলি মুদ্রা) আসার সন্দেহ রয়েছে।

এরপর একটি চিঠি ফাঁস হয়।

কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান তথা সুপ্রিম কোর্টের ডেপুটি চিফ জাস্টিস নোয়াম সোলবার্গ, ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা ‘শিন বেত’-এর পরিচালক ডেভিড জিনির কাছে একটি চিঠি লিখে বিদেশি অর্থায়নের “গুরুতর সন্দেহ” নিয়ে তদন্তের অনুরোধ জানান। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পরই জিনি নিজে এই চিঠিটি চেয়েছিলেন। সোলবার্গ চিঠিতে লিখেছিলেন যে, তিনি প্রমাণের গুরুত্ব যাচাই করতে পারেননি। তবে লিকুদ এবং অন্যান্য ডানপন্থী রাজনীতিবিদদের কাছে এর কোনো গুরুত্ব ছিল না; তাঁরা এই চিঠিটিকে ঘটনার নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবেই গ্রহণ করেন। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী মিত্র স্মোত্রিখ ও ইতামার বেন গভির আরব দলগুলোর নেতাদের গ্রেপ্তারের আহ্বান জানিয়েছেন। বেন গভির অভিযোগ করেছেন যে, আরব ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য কাতারের অর্থায়নে একটি প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে—যা কাতার স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে একে ‘হাস্যকর ও বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছে।

চ্যানেল ১৪-এ এই ঘটনাটিকে ‘ব্যালট সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। লিকুদ দলের আইনপ্রণেতা বোয়াজ বিসমুথ ‘এক্স’ -এ লিখেছেন যে, ‘সন্ত্রাসী দলগুলোর’ নির্বাচনী ফলাফল ততক্ষণ পর্যন্ত স্বীকৃতি পাওয়া উচিত নয়, যতক্ষণ না প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। রবিবার নেতানিয়াহু নিজে ডানপন্থী এক কর্মীর একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যেখানে ওই ব্যক্তি ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ‘নির্বাচন বাতিল করার’ আহ্বান জানান।

এই ঘটনাগুলো ইসরায়েলের পুলিশ কমিশনার এবং শিন বেট (অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা)-এর প্রধানের তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়—যাদের উভয়কেই নেতানিয়াহু নিজেই নিয়োগ দিয়েছিলেন।

‘হারেৎজ’ পত্রিকার জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আমোস হারেল লিখেছেন, “এই দুটি ঘটনার মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পর্দার আড়াল থেকে শিন বেট ও পুলিশকে প্রভাবিত করছে। আর লিকুদ দল তাৎক্ষণিকভাবে এই প্রতিবেদনগুলোকে কাজে লাগিয়ে একটি ব্যাপক প্রচারণামূলক অভিযান চালাচ্ছে,” যার উদ্দেশ্য হলো আরব দলগুলোর বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং বিরোধী শিবিরের কাজের স্বাধীনতা কমিয়ে আনা।

তবে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ নেতানিয়াহুর এই বয়ান প্রত্যাখ্যান করেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে, ভোট প্রক্রিয়ায় পরিকল্পিত কোনো কারচুপি হয়েছে—এমন দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

রবিবার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান, শিন বেট প্রধান এবং অ্যাটর্নি জেনারেল এক যৌথ বিবৃতিতে জানান যে, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তারা আরও বলেন, যদি বিদেশি অর্থায়নের সন্দেহ প্রমাণিতও হয়, তবুও তা নির্বাচনের ফলাফলকে উল্টে দিতে পারবে না বা পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবে না। সোলবার্গ বলেন, “ব্যালট বাক্সে আপনারা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা অবশ্যই মান্য করা হবে।”

কিন্তু লিকুদ দল তাদের অবস্থানে অটল থেকে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে যে, নির্বাচনী ফলাফলের ওপর একটি ‘কালো মেঘ’ (সন্দেহের ছায়া) রয়ে গেছে।

বিরোধী দলগুলো তদন্তের বিষয়টিকে সমর্থন জানালেও, নেতানিয়াহুর অভিযোগগুলোকে তারা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি অপচেষ্টা হিসেবে দেখছে। আইজেনকোট একে ‘ঘৃণ্য ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের কৌশল’ বলে অভিহিত করেছেন, যার লক্ষ্য হলো নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশে বিলম্ব ঘটানো এবং ২৬তম নেসেট (ইসরায়েলি পার্লামেন্ট)-এর বৈধতাকে খর্ব করা। বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলান মন্তব্য করেছেন, “একজন স্বৈরশাসক, যিনি ব্যালট বাক্সে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করেন, তিনি ঠিক এভাবেই আচরণ করে থাকেন।”

‘জয়েন্ট লিস্ট’—যারা এই অবৈধকরণের প্রচারণার মূল লক্ষ্যবস্তু—তারাও পাল্টা বিবৃতিতে এর কড়া জবাব দিয়েছে। গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে দলটি বলেছে, “কোনো অপপ্রচারই আরব জনগণের অর্জনকে মুছে ফেলতে পারবে না এবং আমাদের ভোটের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টির কোনো প্রচেষ্টাই ভোটারদের ইচ্ছাকে পরিবর্তন করতে পারবে না। আপনারা চেয়েছিলেন আমরা যেন ছোট ও দুর্বল থাকি, কিন্তু আমরা হয়ে উঠেছি বড় ও শক্তিশালী।”

সিএনএন