ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করে সিজেপির তিন প্রধান নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস জানিয়ে দিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশকে পদত্যাগ করতে হবে। না হলে দেশজুড়ে আরও একবার আন্দোলন শুরু হবে।
যন্তর
মন্তর আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে
দিয়ে সিজেপির নেতারা বলেছেন, জ্ঞানেশের ইস্তফা আদায় না হওয়া
পর্যন্ত তাঁরা থামবেন না। দীপকে বলেছেন,
প্রধান নির্বাচন কমিশনার সবচেয়ে বড় দেশদ্রোহী। গণতন্ত্রের
পক্ষে সবচেয়ে বিপজ্জনক। এই মুহূর্তে তাঁর
ইস্তফা দেওয়া উচিত।
একই
দাবি জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
আজ নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন,
জ্ঞানেশ কুমার বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী, গণতন্ত্র ধ্বংসকারী। ইস্তফা তাঁকে দিতেই হবে। কংগ্রেস এভাবে
দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস হতে দেবে না।
গত বুধবার সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের
এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড়
হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে বলা
হয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই নির্বাচন
কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও
বিবেক যোশি গত ১০
মাসে ১৪ বার আপত্তি
জানিয়েছেন। এই প্রতিবেদন প্রকাশের
পর বিজেপিবিরোধী প্রায় সব শক্তি একযোগে
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে মুখর। এই দাবি জানানোর
পাশাপাশি বিরোধীরা নতুন করে জ্ঞানেশকে
অভিশংসন করার ভাবনা ভাবতে
শুরু করেছেন।
রাহুল
গান্ধী বলেন, অনেক আটঘাট বেঁধে
নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা
এই ভোট চুরিতে নেমেছেন।
প্রথমে আইন করে প্রধান
নির্বাচন কমিশনার ও অন্য দুই
কমিশনারকে আইনি রক্ষাকবচ দেওয়া
হলো। তারপর শুরু হলো একের
পর এক রাজ্যে ভোট
চুরি। তিনি বলেন, ‘২০২৪
সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই আমরা দেখিয়ে আসছি
কী চাতুরীর সঙ্গে ভোট চুরি করা
হচ্ছে। আজ দুই নির্বাচন
কমিশনার তা সত্য প্রতিপন্ন
করলেন।’
সংবাদ
সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
অমিত শাহর ভিডিও ভাষণ
শোনান রাহুল, যেখানে তাঁরা বলছেন, ৩০ বছর তাঁরা
ক্ষমতায় থাকবেন, ২০২৪–এর নির্বাচনে
৪০০ আসনের বেশি পাবেন। ওই
ভাষণ শুনিয়ে রাহুল বলেন, ‘আমি এক রাজনৈতিক
পরিবারের সন্তান। আমি জানি, কোনো
রাজনৈতিক নেতা এই ধরনের
দাবি করেন না। কারণ,
গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া বা “অ্যান্টি ইনকাম্বেন্সি”
বলে একটা কথা আছে,
যা কাউকে রেয়াত করে না। ইন্দিরা
গান্ধীকেও তা ছাড়েনি। ১৯৭১
সালের বাংলাদেশ যুদ্ধে ঐতিহাসিক জয়ের পর তাঁর
জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে, তার
বছর দুয়েকের মধ্যেই তাঁকে তীব্র জনরোষ ও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার
মুখে পড়তে হয়েছিল। অথচ
এই সত্যের মুখোমুখি নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহকে
হতে হচ্ছে না। এটা খাটে
না উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে, যেখানে
গণতন্ত্র নেই।’
রাহুল
গান্ধী বলেন, ‘এটা কী করে
সম্ভব, সেটাই আমরা খুঁজছিলাম। সেই
উত্তর আমরা পেয়ে গেছি।’
এ প্রসঙ্গে ভোট চুরির বিষয়টি
টেনে আনেন রাহুল গান্ধী।
তিনি বলেন, ভোট চুরি থেকেই
শুরু আইন চুরি। ভোট
চুরি করে যাঁরা পার্লামেন্টে
আসছেন, তাঁরা আইন চুরি করছেন।
তারপর চুরি হয়ে যাচ্ছে
সংবিধান। একের পর এক
প্রতিষ্ঠান। ভোট চুরি করে
জয়ী সংসদ সদস্যরা যে
আইন তৈরি করছেন, তা
বেআইনি। ভোটাধিকার ধ্বংস হওয়ার অর্থ সংবিধান ধ্বংস
হওয়া, প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হওয়া। ভোট চুরি করেই
প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া দূরে সরিয়ে দেওয়া
হচ্ছে। সেটা আজ প্রমাণিত
হয়ে গেছে। রাহুল একটি চিঠি দেখিয়ে
বলেন, কীভাবে তিনি জ্ঞানেশের নিয়োগের
বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তা আমলে
নেননি।
রাহুল
গান্ধী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তদন্তের আওতায়
আসতেই হবে। তাঁরাই মূল
চক্রান্তকারী। জ্ঞানেশ কুমারের উচিত রাজসাক্ষী হওয়া।
আমরা জানি কী ঘটেছে।
আমরা তা প্রকাশ করবই।’
সিজেপির তিন নেতা বুধবারই দিল্লি চলে আসেন। বৃহস্পতিবার ভিড়ে ঠাসা সংবাদ সম্মেলন করে অভিজিৎ দিপকে মোট তিনটি দাবি রাখেন। তিনি বলেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ করলেই হবে না, তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজু করতে হবে। প্রত্যেকের জানা দরকার, কোন অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে তিনি এই ধরনের দেশবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে। ২০২৫ সালে যে ভোটার তালিকা ছিল, তার আধারে নির্বাচন করতে হবে। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগসংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন সংশোধন করে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করতে হবে। এসআইআর প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয় খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গড়ার দাবিও তাঁরা জানিয়েছেন। এই বিষয়ে শীর্ষ আদালতের হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে।