ভারতের ‘জোরাওয়ার’ট্যাঙ্ক এমন সব জায়গায় ব্যবহারের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ভারী ট্যাঙ্ক পৌঁছাতে পারে না—যেমন চীন সীমান্তের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চল, যেখানে বাতাসে অক্সিজেন কম, রাস্তা সরু এবং সেতুগুলো ছোট।

প্রাথমিক কাঠামো অনুযায়ী, ‘জোরাওয়ার’ ট্যাঙ্কর ওজন প্রায় ২৫ টন—যা এতই হালকা যে এটিকে আকাশপথে সরাসরি ‘লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল’ (এলএসি) বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে বড় ক্যালিবারের স্বয়ংক্রিয় কামানের গোলা (অটোক্যানন ফায়ার) সহ্য করার মতো সক্ষমতা যোগ করতে গেলে এর ওজনে আরও সাত টন বাড়তে পারে।

সীমান্তে ভারত ও চীনা বাহিনীর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির খবর—যার মধ্যে ২৩ অক্টোবর ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটিও অন্তর্ভুক্ত—ট্যাঙ্কর ওজন কত হওয়া উচিত, তা নিয়ে চলমান বিতর্কে নতুন করে জরুরি গুরুত্ব যোগ করেছে।

অতীতে বিভিন্ন সংঘাতের সময় ভারত আকাশপথে তাদের পুরোনো, রুশ প্রযুক্তির টি-৭২ ও টি-৯০ ট্যাঙ্ক লাদাখ সীমান্তে নিয়ে গিয়েছিল। এগুলোর একেকটির ওজন ৪৫ থেকে ৫০ টনের মতো। সেখানে এগুলোকে মোকাবিলা করতে হয়েছে চীনের অপেক্ষাকৃত হালকা ‘টাইপ ১৫’ ট্যাঙ্কগুলোর সঙ্গে, যেগুলোর ওজন ৩৩ থেকে ৩৬ টনের মধ্যে।

তবে ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’-এর ২০২১ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে, যেখানে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকে এবং অক্সিজেনের পরিমাণ অত্যন্ত কম, সেখানে এই ভারী মূল যুদ্ধ ট্যাঙ্কগুলোর (মেইন ব্যাটল ট্যাঙ্ক) কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এর বিপরীতে, চীনের ‘টাইপ ১৫’ ট্যাঙ্ক উচ্চ উচ্চতায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ এবং এটি ২০১৮ সালের শেষ দিক থেকেই ব্যবহার করা হচ্ছে।

ভারতের রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ এবং বেসরকারি প্রকৌশল গোষ্ঠী ‘লারসেন অ্যান্ড টুব্রো’ যৌথভাবে ‘জোরাওয়ার’ ট্যাঙ্ক তৈরি করেছে। ২০২২ সালের মার্চ মাসে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের পর থেকে ২০২৪ সালে এর প্রোটোটাইপ প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আনা পর্যন্ত—এই দুই বছর সময় লেগেছে এটি উন্নয়নের কাজে।

এই ট্যাংকে রয়েছে ১০৫ মিলিমিটারের রাইফেলড গান, যা বেলজিয়ামের নকশা করা ‘ককারিল’ টারেটে (ট্যাংকের ওপরের ঘূর্ণায়মান অংশ) বসানো হয়েছে। এই টারেটটি ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি এবং আর্টিলারি থেকে ছিটকে আসা টুকরো থেকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম; তবে চীনের অটো-ক্যানন থেকে ছোড়া আর্মার-পিয়ার্সিং শেল (যা ধাতব বর্ম ভেদ করার জন্য তৈরি) ঠেকানোর ক্ষমতা এর নেই।

ভারতীয় সেনাবাহিনী এই ট্যাংকের বর্ম বা আর্মারকে ন্যাটোর সর্বোচ্চ ব্যালিস্টিক সুরক্ষা মান—‘স্ট্যান্যাগ লেভেল ৬’—অনুযায়ী উন্নত করার জন্য চাপ দিচ্ছে। এই মান অর্জিত হলে ট্যাঙ্ক ২৫ মিমি ও ৩০ মিমি ক্যালিবারের আর্মার-পিয়ার্সিং গুলির আঘাত সহ্য করতে পারবে।

এভাবে বর্ম উন্নত করলে ট্যাংকের ওজন বেড়ে যাবে, নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে এবং এর উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হবে। এই পরিস্থিতির কারণে, ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, ‘জোরাওয়ার’ ট্যাঙ্ক ২০২৮-২৯ সালের দিকে সেনাবাহিনীতে যুক্ত হতে পারে, যা মূল লক্ষ্যমাত্রা (২০২৭ সাল) থেকে পিছিয়ে গেছে।

জরুরি প্রয়োজন ও বাস্তবতা

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল অশোক ভীম শিভানে—যিনি অতীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেকানাইজড ফোর্সের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং একটি স্ট্রাইক কোরের (সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান আক্রমণাত্মক ইউনিট) কমান্ডার ছিলেন—তিনি কেন এই বিলম্ব একটি বড় সমস্যা, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন।

তিনি ‘দিস উইক ইন এশিয়া’ -কে বলেন, “এর জরুরি প্রয়োজনীয়তাটি বাস্তব। যেসব এলাকায় মাঝারি ক্যাটাগরির টি-৯০ বা টি-৭২ ট্যাঙ্ক পৌঁছাতে পারে না বা কাজ করতে অক্ষম, সেসব জায়গার জন্য একটি হালকা ট্যাঙ্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি—এমনকি এটি আরও আগেই প্রয়োজন ছিল।”

ভারী বর্মের জন্য আরও শক্তিশালী ইঞ্জিনের প্রয়োজন হয়। শিবানের মতে, ৪,৫০০ মিটারের (১৫,০০০ ফুট) বেশি উচ্চতায়—যেখানে ‘জোরাওয়ার’ ট্যাঙ্কটিকে কাজ করতে হবে—সেখানে বাতাস পাতলা হওয়ার কারণে ইঞ্জিনের ক্ষমতা ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এটি এড়াতে ট্যাঙ্কটির বর্তমান ৭৬৪ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিনটিকে ১,০০০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিনে উন্নীত করা প্রয়োজন।

শিবানে, যিনি দেশীয় প্রযুক্তিতে হালকা ট্যাঙ্ক তৈরির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার ক্ষেত্রে সহায়তা করেছেন এবং এর উন্নয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন, তিনি বলেন, “এর নকশা নিয়েও একটি প্রশ্ন রয়েছে। বেলজিয়ামের তৈরি টারেটটি অতিরিক্ত ভারী বর্ম বা আর্মার বহন করতে সক্ষম নয়।”

তিনি জানান, অতিরিক্ত বর্ম যুক্ত করলে ট্যাঙ্কটির ওজন সাত টন পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের উপায় হিসেবে তিনি পরামর্শ দেন যে, ভারতের উচিত ট্যাঙ্কটির নকশাকে আরও বেশি করে দেশীয়করণ করা। বর্তমানে এর মোট মূল্যের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি।

ভারত প্রাথমিকভাবে ৫৯টি এবং সব মিলিয়ে মোট ৩৫৪টি ‘জোরাওয়ার’ ট্যাঙ্ক মোতায়েন করার পরিকল্পনা করেছে। শিবানে জানান, তিনি চান ২০২৮ সালের মধ্যেই প্রথম ব্যাচের ট্যাঙ্কগুলো সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হোক—তবে তা হতে হবে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ভবিষ্যতের আপগ্রেডের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দসহ। অর্থাৎ, ট্যাঙ্কটির নকশা হতে হবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষিত ও চূড়ান্ত, এবং এর পরবর্তী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলও আগে থেকেই নিশ্চিত থাকতে হবে।

তিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি "স্পাইরাল অ্যাপ্রোচ" বা পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়েছেন। এই পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়ানো হবে এবং কোনো দুর্বলতা দেখা দিলে তা সাময়িকভাবে দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, "যে ট্যাঙ্কটির অস্তিত্বই নেই, তা দিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া সম্ভব নয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে যা শেখা যায়, তা কোনো গবেষণাগারে শেখা সম্ভব নয়।"

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার সঞ্জয় আইয়ার একমত পোষণ করেন যে, যে 'জোরাওয়ার' ট্যাঙ্কগুলো ইতিমধ্যে পরীক্ষার ধাপ পার করেছে, সেগুলোর প্রথম ব্যাচ মোতায়েন করা অনেক ভালো; বরং এমন কোনো ভারী সংস্করণের জন্য অপেক্ষা করা অর্থহীন, যা এখন পর্যন্ত কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।

ভারত-চীন সীমান্তের বিতর্কিত এলাকাটিকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "সেনাবাহিনীর অবস্থানটি আমি বুঝতে পারছি। কোনো কমান্ডারই এমন কোনো যানে করে তার ক্রুদের এলএসি-তে পাঠাতে চাইবেন না, যেটির ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা নেই। তবে, এই ট্যাঙ্কগুলো এমন কোনো জায়গায় যাচ্ছে না যেখানে আগে থেকে কিছুই নেই।"

আইয়ার জানান, লাদাখে ইতিমধ্যে টি-৭২ ও টি-৯০ ট্যাঙ্ক নিয়ে গঠিত একটি আর্মার্ড ব্রিগেড (যাতে সাধারণত ১৩৫ থেকে ১৫০টি ট্যাঙ্ক থাকে) মোতায়েন রয়েছে। আর 'জোরাওয়ার' এমন কিছু সুবিধা নিয়ে আসবে, যা ওই ট্যাঙ্কগুলোর পক্ষে দেওয়া কঠিন।

তিনি আরও বলেন, "এগুলোকে আকাশপথে আনা সম্ভব, এগুলো ছোট সেতু ও সরু রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারে এবং এমন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে যেখানে ৪৫ টন ওজনের ট্যাঙ্কগুলোর জন্য চলাফেরা করা কষ্টসাধ্য। সমতল ভূমিতে ভারী ট্যাঙ্কগুলোর পাশাপাশি যদি ৫৯টি 'জোরাওয়ার' ট্যাঙ্কও যুক্ত করা হয়, তবে তা পুরো ব্রিগেডের কার্যক্ষমতায় অনেক বেশি নমনীয়তা আনবে।"

এক দশকের এগিয়ে আছে চীন

'জোরাওয়ার' ট্যাঙ্কটি ভারতের আর্মার্ড বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। এই পরিকল্পনার আওতায় সোভিয়েত আমলের ও রাশিয়ার প্রকৌশল নকশা ব্যবহার করে টি-৭২ ও টি-৯০ ট্যাঙ্কগুলোকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে দেশীয় প্রযুক্তিতে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামরিক পর্যবেক্ষণ ওয়েবসাইট 'গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার'-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাছে প্রায় ৩,৯০০টি মেইন ব্যাটল ট্যাঙ্ক রয়েছে, যা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ট্যাঙ্ক বহর। অন্যদিকে, চীনের কাছে রয়েছে ৫,৮০০টিরও বেশি ট্যাঙ্ক, যা বিশ্বের বৃহত্তম ট্যাঙ্ক বহর। আইয়ার বলেন, হালকা ট্যাঙ্কের ক্ষেত্রে চীন ভারতের চেয়ে প্রায় এক দশক এগিয়ে আছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, আট বছর আগে বাজারে আসা চীনের ‘টাইপ ১৫’ ট্যাঙ্কে ১,০০০ হর্সপাওয়ারের ইঞ্জিন রয়েছে এবং এটি ১০৫ মিমি কামানে সজ্জিত।

তিনি বলেন, কাগজে-কলমে ‘জোরাওয়ার’ ট্যাঙ্কটি তুলনামূলক হালকা। তাঁর মতে, ট্যাঙ্কগুলোর শক্তি ও ওজনের অনুপাত মোটামুটি একই রকম এবং এগুলোর কামানও প্রায় সমমানের।

আইয়ার আরও বলেন, তবে অন্যান্য বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে—যেমন সড়ক, রেল ও আকাশপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিপুল সংখ্যায় ট্যাঙ্ক তৈরির শিল্প সক্ষমতা।

তিনি জানান, ভারতের বর্তমান ট্যাঙ্ক বহর বেশ পুরোনো এবং সুরক্ষাসংক্রান্ত প্রযুক্তির দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে আছে। তবে পরিস্থিতি একেবারেই হতাশাজনক নয়; তিনি উল্লেখ করেন যে, এই ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যে সেনাবাহিনী লাদাখে আরও বেশি সংখ্যক টি-৯০ ও টি-৭২ ট্যাঙ্ক মোতায়েন করেছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ