চীন ও পাকিস্তান ‘কারাকোরাম ২০২৬’ নামে একটি যৌথ সামরিক মহড়া শেষ হয়েছে। চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের কোরলা শহরে ১৪ অক্টোবর এই মহড়া শুরু হয়। চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য হলো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের ওপর গুরুত্বারোপ করা।
নয় দিনব্যাপী এই অনুশীলনে বিভিন্ন
ধরনের অপারেশনাল ও কৌশলগত প্রশিক্ষণ
কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা কেবল
দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং পরিবর্তনশীল
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পাকিস্তান
ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সামরিক মহড়া তাদের প্রতিরক্ষা
সহযোগিতার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও
নিয়মিত অংশ। পারস্পরিক সক্ষমতা
বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক সহযোগিতা
জোরদার করার লক্ষ্যে চলতি
বছরের শুরুর দিকে দেশ দুটি
‘সি গার্ডিয়ান ৪’ নামে নৌ-মহড়া পরিচালনা করেছিল।
এছাড়া, যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী মহড়াও
তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি নিয়মিত অনুষঙ্গ;
যার সর্বশেষ উদাহরণ ছিল ২০২৫ সালের
ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ারিয়র ৯’ মহড়া।
চীনের
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্রের ভাষ্যমতে,
‘কারাকোরাম ২০২৬’-এ মূলত উচ্চ
পার্বত্য অঞ্চলে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের
ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—ইউএভি বা চালকবিহীন আকাশযান
পরিচালনা, চলমান অবস্থায় লক্ষ্যবস্তু অনুসন্ধান ও গুলি চালানো,
দূরপাল্লার স্নাইপিং, এবং যৌথ কমান্ড
ও সরাসরি সৈন্য নিয়ে পরিচালিত মহড়া।
চীনের
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন’-এর সামরিক বিষয়ক
চ্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, এই
মহড়ায় চীন প্রয়োজনীয় সব
সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—টাইপ ১৯১ রাইফেল,
টাইপ ২০১ স্কোয়াড মেশিনগান,
টাইপ ১১ আর্মার্ড অ্যাসল্ট
ভেহিকল, টাইপ ০৮ ইনফ্যান্ট্রি
ফাইটিং ভেহিকল, আর্টিলারি বা কামানের মতো
ভারী অস্ত্র, এবং বিভিন্ন ধরনের
চালকবিহীন আকাশযান ও সেগুলো প্রতিরোধের
প্রযুক্তি। চীনা সরঞ্জামের ব্যবহার
এবং এগুলোর সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচিতি ভবিষ্যতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এসব
সরঞ্জাম সংগ্রহের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
তবে
‘কারাকোরাম ২০২৬’-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য
দিক হলো, এই প্রথম
উভয় দেশ কেবল বিশেষায়িত
ইউনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত
সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণ
পরিচালনা করছে। এই পদক্ষেপটি তাদের
প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও সুদৃঢ় করবে
এবং পাকিস্তান ও চীনের মধ্যকার
দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বাত্মক কৌশলগত
অংশীদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করে
তুলবে। এর মূল লক্ষ্য
হলো সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত বিষয়ে আন্তঃকার্যক্ষমতা এবং যৌথ সহযোগিতা
বৃদ্ধি করা। ‘কারাকোরাম ২০২৬’ হলো এই অঞ্চলে
অভিন্ন নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়ে চীন ও পাকিস্তানের
মধ্যকার বৃহত্তর সমন্বয়ের একটি প্রতিফলন। যদিও
তাদের নিজ নিজ হুমকির
ধারণা হয়তো হুবহু এক
নয়, তবুও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো
যেন ভূখণ্ডের দুর্বলতাকে কাজে লাগাতে না
পারে—সে বিষয়ে তাদের
অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে। বেইজিংয়ের মনে চীনের অভ্যন্তরে
হামলার আশঙ্কা যেমন রয়েছে, তেমনি
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে কর্মরত
চীনা নাগরিকরাও মাঝেমধ্যে হামলার শিকার হয়েছেন। সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ প্রশিক্ষণ এই
অভিন্ন উদ্বেগগুলোকে কার্যকর সামরিক সহযোগিতায় রূপান্তর করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক
কাঠামো প্রদান করে।
এই মহড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক
ছিল ইউএভি বা ড্রোন পরিচালনা।
আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চলে ড্রোন যুদ্ধের আবির্ভাব—বিশেষ করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর
দ্বারা ড্রোনের ব্যবহার—বিবেচনা করলে এর পেছনের
উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই
ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নজরদারি কার্যক্রমকে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, চলমান
যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ ও সেগুলোর বিরুদ্ধে
ব্যবস্থা গ্রহণের সক্ষমতা সামরিক বাহিনীর মধ্যকার সমন্বয়কে আরও জোরদার করবে।
দীর্ঘপাল্লার
স্নাইপিং এবং সরাসরি সৈন্য
নিয়ে পরিচালিত মহড়াগুলো কৌশলগত দক্ষতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা ও আন্তঃকার্যক্ষমতাকে যাচাই করে।
অংশগ্রহণকারী বাহিনীর জন্য এই মহড়া
জটিল অভিযানের সময় পারস্পরিক সাড়া
প্রদান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার
উন্নতির ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
‘কারাকোরাম
২০২৬’-এ প্রদর্শিত সক্ষমতাগুলো
বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়
যে, উত্তর পাকিস্তান এবং চীনের জিনজিয়াং
অঞ্চলের দুর্গম ভূখণ্ডের কথা মাথায় রেখেই
এই মহড়াগুলো বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। চীন-পাকিস্তান সীমান্ত
অঞ্চলটি অত্যন্ত দুর্গম ও পার্বত্যময়; এখানকার
চরম আবহাওয়া নিরাপত্তা কার্যক্রমকে জটিল করে তোলে।
তবে, এই মহড়াগুলোকে এমনভাবে
দেখা উচিত নয় যে
চীন ও পাকিস্তান এই
অঞ্চলে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযানের
প্রস্তুতি নিচ্ছে। বরং, ‘কারাকোরাম ২০২৬’-এর মূল তাৎপর্য
হলো—সন্ত্রাসবিরোধী যৌথ পরিস্থিতির জন্য
প্রস্তুতি বৃদ্ধি করা এবং সামরিক
বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও পরিচিতি জোরদার
করা।
দ্য ডিপ্লোম্যাট,
ইংরেজি থেকে অনুবাদ