ইরানের বিরুদ্ধে চলমান পাঁচ মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় সব নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ করে ফেলেছে। অভ্যন্তরীণ তথ্যের বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র এ কথা জানিয়েছে। এতে ভবিষ্যতের যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রস্তুতির সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্রগুলো
বলছে, এসব অস্ত্র মূলত
মার্কিন সেনাবাহিনীর স্থল থেকে স্থলে
নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, যা ‘আর্মি ট্যাকটিক্যাল
ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা’ (এটিএসিএমএস বা অ্যাটাকামস) এবং
‘প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্র’ (পিআরএসএম বা পিআরএসএম) নামে
পরিচিত। এর মধ্যে দুটি
সূত্রের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এসব অস্ত্রের ‘প্রায়
পুরো অংশই’ ব্যবহার করে ফেলেছে।
মার্কিন
সামরিক বাহিনী কী পরিমাণ অ্যাটাকামস
ও প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে রয়েছে, তার তথ্য আগে
কখনোই সামনে আসেনি।
দূরপাল্লার
এসব ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রাগারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা নিরাপদ
দূরত্ব থেকে শত্রুপক্ষে নিখুঁত
হামলা চালানোর সুবিধা দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধে
যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অ্যাটাকামস ক্ষেপণাস্ত্র
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, যার মাধ্যমে ইউক্রেনীয়
বাহিনী রাশিয়ার ভেতরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পেরেছিল। অন্যদিকে পিআরএসএম হলো তুলনামূলক কম
পাল্লার পুরোনো অ্যাটাকামসের স্থলাভিষিক্ত নতুন ও আরও
উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র।
বিশ্লেষকদের
মতে, এসব অত্যাধুনিক অস্ত্রের
প্রতিটির খরচ ১০ লাখ
ডলারের বেশি। চীনের মতো বড় কোনো
দেশের বিরুদ্ধে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও এই অস্ত্র অতি
জরুরি।
তবে
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এসব অস্ত্রের
মজুত ঠিক কতটা রয়েছে,
সে বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে
সূত্রগুলো।
চলতি
বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে আগ্রাসন চালান। সে সময় সংঘাতটি
স্বল্পস্থায়ী হবে বলে পূর্বাভাস
দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ
করেছে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র। তাদের মতে, কমতে থাকা
এই অস্ত্রের মজুত রাশিয়া ও
চীনের মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের
দমনে ওয়াশিংটনের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলতে পারে।
বিষয়টির
সঙ্গে জড়িত চতুর্থ এক
ব্যক্তি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল কমান্ড
(সেন্টকম) যুদ্ধ শুরুর আগে তাদের কাছে
থাকা স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রায় সবই শেষ করে
এনেছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য
প্রান্তে থাকা মার্কিন সামরিক
ঘাঁটি থেকে আবার তা
পূরণ করার প্রক্রিয়া চলছে।
অস্ত্রাগারের
এ ঘাটতি সংক্রান্ত তথ্যের বিষয়ে মন্তব্য চাওয়া হলে হোয়াইট হাউস
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একটি বিবৃতি প্রকাশ
করে। সেখানে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের
কাছে ‘বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি
অস্ত্র রয়েছে’ এবং ‘আমাদের যা
প্রয়োজন, তার চেয়েও তা
অনেক বেশি।’
বিশ্লেষকরাও
স্বীকার করছেন, কামান–গোলা এবং কয়েক
ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রসহ নির্দিষ্ট কিছু সামরিক সরঞ্জাম
এখন রেকর্ড পরিমাণে তৈরি হচ্ছে। তবে
তাঁরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি
যুদ্ধের চাহিদার তুলনায় এই উৎপাদনের গতি
এখনো অনেক কম।
অ্যাটাকামস,
পিআরএসএম এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
প্রতিরোধী ‘থাড’ ব্যবস্থার নির্মাতা
প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ট্রাম্পের বক্তব্য বা সরবরাহের মাত্রা
সংক্রান্ত প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেয়নি। অন্যদিকে
টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর
প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান রায়থনও এ বিষয়ে কোনো
মন্তব্য করেনি।
পেন্টাগনের
প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল মন্তব্যের
অনুরোধে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা
অনুযায়ী যেকোনো সময় ও স্থানে
তা প্রয়োগের পূর্ণ সামর্থ্য আমাদের রয়েছে। আমাদের জনগণ ও স্বার্থ
রক্ষায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর হাতে পর্যাপ্ত ও
গভীর সক্ষমতার অস্ত্রাগার বজায় রেখেই আমরা
একাধিক কমব্যাট কমান্ডজুড়ে বহু সফল অভিযান
পরিচালনা করেছি।’
ট্রাম্প
প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ উত্তপ্ত আলোচনার মধ্যে গত সপ্তাহে এসব
সরবরাহের তথ্য সরকারের ভেতরে
ছড়ায়। আলোচনাটি ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের
কাছে অন্য যেকোনো সংকট
মোকাবিলার সক্ষমতা ধরে রাখার মতো
ন্যূনতম অস্ত্র বজায় রেখে আর
কত দিন তারা ইরানের
ওপর হামলা চালিয়ে যেতে পারবে।
অস্ত্র
সরবরাহ নিয়ে সতর্কতা
সূত্রমতে,
অ্যাটাকামস ও পিআরএসএম অস্ত্রের
মজুত ফুরিয়ে আসার মূল কারণ
হলো ট্রাম্প প্রশাসনের ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল। অর্থাৎ চালকসহ যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ফেলার
মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে এ
ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে বেশি জোর দেওয়া
হয়েছে।
যেহেতু
এসব অস্ত্র নিরাপদ দূর থেকে শত্রুর
ওপর আঘাত করার সুযোগ
দেয়, তাই চীনের মতো
শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে
এটি অত্যন্ত কার্যকর বলে মনে করেন
বিশ্লেষকেরা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড
ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মার্চ মাসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী,
ইরানের ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় এসব অস্ত্র ব্যবহার
করা হয়েছে।
প্রতিবেদন
অনুযায়ী, পিআরএসএম তুলনামূলকভাবে নতুন অস্ত্র হওয়ায়
এর শুরুতেই মজুত কম ছিল,
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ২০২৭ সালের জন্য
বিপুল পরিমাণ ফরমাশ দিয়েছে। আর মার্কিন সেনাবাহিনী
ইতিমধ্যে জানিয়েছে, অ্যাটাকামস পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হচ্ছে
এবং উৎপাদন নতুন পিআরএসএমের দিকে
স্থানান্তরিত হচ্ছে।
দুটি
সূত্রের মতে, প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরসহ
(যা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করতে পারদর্শী) প্রতিরক্ষামূলক
অস্ত্রের মজুত যে কমে
আসছে, সে বিষয়ে কয়েক
সপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্টকে সতর্ক
করে আসছিলেন সামরিক প্রধানেরা। গত সপ্তাহে বেশ
কয়েকটি গণমাধ্যম জানায়, ট্রাম্পের সামরিক উপদেষ্টারা মার্কিন অস্ত্রাগারের সংকটের বিষয়ে সতর্ক করার পর তিনি
ইরানের অভ্যন্তরে আরেকটি বড় ধরনের আক্রমণ
না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।
তবে
একজন মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য অস্বীকার
করে দাবি করেছেন, উপসাগরীয়
দেশগুলোর চাপের কারণেই ট্রাম্প পরবর্তী হামলা স্থগিত রাখার পথ বেছে নিয়েছেন।
কমেছে
প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের মজুতও
গত সপ্তাহে সিএসআইএসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা
হয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬৫ শতাংশ প্যাট্রিয়ট
ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হয়ে গেছে।
এ ছাড়া মার্কিন অস্ত্রাগারে
থাকা থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র
ধ্বংসকারী ব্যবস্থার মজুত যুদ্ধ শুরুর
পরিস্থিতির চেয়ে অন্তত ৩৮
শতাংশ কমে গেছে। প্যাট্রিয়ট
ও থাড ব্যবস্থা আকাশে
থাকা লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও ধ্বংস করে
এবং এটি দেশটির অস্ত্রাগারের
সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত।
রয়টার্স, ওয়াশিংটন