২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি এবং তাদের জোটশাসিত ২১ রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এদিকে মুসলিম নেতারা এই আইনকে বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করে বলেছেন, এর মাধ্যমে এমন সব আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

রবিবার মুম্বইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের ১২ বছরের সাফল্যের কথা বর্ণনা করছিলেন শাহ। সে সময়ে তিনি বলেন, “আমরা তিন তালাক প্রথা তুলে দিয়েছি। এর ফলে মুসলিম মহিলারা সমানাধিকার পেয়েছেন। বেশ কিছু রাজ্যে আমরা অভিন্ন দেওয়ানিবিধিও চালু করেছি। আমি নিশ্চিত, ২০২৯ সালের মধ্যে বিজেপি এবং এনডিএ-শাসিত ২১ রাজ্যে আমরা অভিন্ন দেওয়ানবিধি চালু করে দেব।

দেশের মধ্যে প্রথম রাজ্য হিসেবে উত্তরাখণ্ডে চালু হয় অভিন্ন দেওয়ানিবিধি। তার পরে গুজরাত, অসম এবং মধ্যপ্রদেশের বিধানসভাতেও এই সংক্রান্ত বিল পাশ হয়। পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং ছত্তীসগঢ়েও অভিন্ন দেওয়ানিবিধি চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এই রাজ্যগুলির প্রতিটিতেই বিল পেশের আগে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে গত জুনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, এই বিলের জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠিত হয়েছে। কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা দেশাই। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি অন্য বেশ কিছু রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানিবিধি সংক্রান্ত কমিটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

কালো আইন

এদিকে, অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) প্রস্তাবিত অভিন্ন দেওয়ানি বিধির (ইউসিসি) বিরুদ্ধে তাদের বিরোধিতা পুনর্ব্যক্ত করেছে। দলের নেতা রফিকুল ইসলাম এই আইনকে বৈষম্যমূলক বলে অভিহিত করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন যে, এর মাধ্যমে এমন সব আইন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে যা মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, এআইইউডিএফ বরাবরই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির বিরোধিতা করে আসছে এবং এখনও সেই অবস্থানেই অটল রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, দলের সভাপতিসহ শীর্ষ নেতৃত্ব এই প্রস্তাবিত আইনের বিরোধিতা করেছেন।

তিনি বলেন, “আমরা অতীতেও ইউসিসি- বিরোধিতা করেছি এবং আজও করছি। আমাদের দলের সভাপতিও এর বিরোধিতা করেছেন।

এআইইউডিএফ নেতা আরও অভিযোগ করেন যে, প্রস্তাবিত আইনটি প্রকৃত অর্থে কোনো অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নয় এবং তিনি একে একটিকালো আইনহিসেবে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, মুসলিমদের ওপর অন্য সম্প্রদায়ের আইন চাপিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই আইনটি আনা হয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোয় উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে যে ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তা নিয়েও ইসলাম প্রশ্ন তোলেন। তিনি যুক্তি দেন যে, আইনটি যদি সর্বজনীনভাবে কল্যাণকর হওয়ার উদ্দেশ্যে আনা হয়ে থাকে, তবে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে ছাড় দেওয়ার বিষয়টি এর সর্বজনীন প্রয়োগের ওপর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে।

তিনি বলেন, “আইনটি যদি এতটাই ভালো হয়, তবে উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে কেন এর আওতামুক্ত রাখা হলো? যদি এই আইন তাদের সংস্কৃতি ঐতিহ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তবে মুসলিমদের কেন লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে?”

আসাম এবং দেশের অন্যান্য অংশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই এই মন্তব্যগুলো সামনে এল। এই প্রস্তাবটি রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সম্প্রদায়-ভিত্তিক সংগঠন এবং সুশীল সমাজের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে; যেখানে সমর্থকরা যুক্তি দিচ্ছেন যে এটি আইনি সমতা আনবে, অন্যদিকে সমালোচকদের মতে এটি ব্যক্তিগত আইনের আওতায় সুরক্ষিত ধর্মীয় সাংস্কৃতিক রীতিনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এআইইউডিএফ -এর অবস্থান হলো, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার যেকোনো পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত এবং ধর্মীয় সাংস্কৃতিক পরিচিতি সংক্রান্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো বজায় রাখা প্রয়োজন।