মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পুনরায় তীব্র আকার ধারণ করার পর প্রথমবারের মতো মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র রোববার (১৯ জুলাই) ইরানের বিরুদ্ধে ‘শাস্তিমূলক’ বিমান হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে তেহরান।
বিশ্বের
গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হরমুজ
প্রণালী কেন্দ্র করে অচলাবস্থা নিরসনের
লক্ষ্যে হওয়া প্রাথমিক সমঝোতা
ভেঙে পড়ার পর দুই
পক্ষের সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে।
ইরানের
সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ড্রোন হামলার মাধ্যমে তারা কুয়েতে অবস্থিত
দুটি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। তাদের দাবি, ক্যাম্প উদাইরির একটি গোলাবারুদ ডিপো
এবং আলি আল সালেম
বিমানঘাঁটির প্যাট্রিয়ট রাডার ও আকাশ নজরদারি
ব্যবস্থা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই
সময়ে জর্ডানেও নতুন করে হামলা
চালায় ইরান। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শুক্রবার জর্ডানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
প্রতিহত করার সময় দুই
মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন।
সেন্টকম
আরও জানায়, আরেক সেনাসদস্য এখনও
নিখোঁজ রয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র
ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর
থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন
বাহিনীর নিহত সদস্যের সংখ্যা
বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন
সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, টানা অষ্টম রাতের
মতো তারা ইরানে বিমান
হামলা চালিয়েছে। হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে জর্ডানে দুই মার্কিন সেনাকে
হত্যার জন্য দায়ী বলে
দাবি করা ইউনিটগুলোও ছিল।
সেন্টকম
এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলাকারী ইসলামিক
রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)’র
সদস্যদের দ্রুত শাস্তি দিতেই এই হামলা চালানো
হয়েছে।’
এদিকে
ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।
রাষ্ট্রীয়
টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি
জানায়, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে
যুক্তরাষ্ট্র রোববার একাধিক প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করে নির্মাণাধীন দারখোভিন
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে।
জর্ডান,
কুয়েত ও বাহরাইনেও উত্তেজনা
জর্ডানে
হামলার সতর্কসংকেত (সাইরেন) বেজে ওঠে। ইসরাইলি
সেনাবাহিনী জানায়, তাদের বাহিনী এবং জর্ডানের সেনারা
যৌথভাবে আকাবা বন্দরের দিকে ধেয়ে আসা
একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
ইরান
তাৎক্ষণিকভাবে ওই হামলার দায়
স্বীকার না করলেও এর
আগে আম্মানে মার্কিন দূতাবাস আকাবা বন্দর ও বিমানবন্দরকে লক্ষ্য
করে ‘সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য’ হামলার
হুমকির বিষয়ে মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করেছিল।
কুয়েতের
বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, টানা দ্বিতীয় দিনের
মতো একটি বিদ্যুৎ ও
পানি উৎপাদনকেন্দ্রে হামলা হয়েছে, যাতে সেখানে অগ্নিকাণ্ডের
ঘটনা ঘটেছে।
বাহরাইনের
সামরিক বাহিনীও জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ইরানের একাধিক হামলা প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে।
দেশটি অভিযোগ করেছে, ইরান বেসামরিক স্থাপনা
লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
হরমুজ
প্রণালী ঘিরে অচলাবস্থা
কৌশলগত
হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে ইরানের হামলাকে কেন্দ্র করেই সাম্প্রতিক সংঘাতের
সূত্রপাত হয়।
যুদ্ধ
শুরু হওয়ার পর ইরান হরমুজ
প্রণালী বন্ধ করে দেয়।
অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রও গত মঙ্গলবার ইরানের
বন্দরগুলোর ওপর পুনরায় অবরোধ
আরোপ করে। ফলে প্রণালীটির
নিয়ন্ত্রণ এখন দুই পক্ষের
আলোচনায় অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
রোববার
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়,
প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করা চারটি জাহাজের
মধ্যে দুটি দুর্ঘটনার কবলে
পড়ে থেমে যায় এবং
বাকি দুটি যাত্রা বাতিল
করে ফিরে যায়।
ইরানের
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এক
সপ্তাহ আগে পুনরায় সংঘর্ষ
শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত
৫০ জন নিহত এবং
৫০০ জনের বেশি আহত
হয়েছেন।
’মনে রাখার
মতো শিক্ষা’
দেওয়ার হুমকি
যুদ্ধের
রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে, যদিও
মধ্যস্থতাকারীরা এখনও দুই পক্ষকে
আলোচনায় ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের প্রথম দফার হামলায় নিহত
সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির
উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
শনিবার এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে
‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
খামেনির
জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন
রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, আগামী
কয়েক দিন মার্কিন হামলা
অব্যাহত থাকলে ইরান আবারও ‘পূর্ণমাত্রার
সামরিক অভিযান’ শুরু করবে।
এদিকে
ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ডার আলী আবদুল্লাহি রাষ্ট্রীয়
টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলেন,
যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন আগ্রাসনের জবাব
হবে ‘চূড়ান্ত ও বিধ্বংসী’।
কুয়েতসহ
উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে বেসামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে
হামলার অভিযোগ করেছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে।
কুয়েতের
বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী
হাসান রায়ান বলেন, ‘আজ সকাল থেকেই
পানি ও টিনজাত খাদ্যের
চাহিদা বেড়ে গেছে। মানুষ
আশঙ্কা করছে, প্রয়োজনীয় সেবা ও সরবরাহব্যবস্থা
ব্যাহত হতে পারে।’
এএফপি,
তেহরান