আরব সাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ (সম্ভবত আইএনএস কলকাতা) এবং পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস হুনাইনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। মে ২০২৫-এর সংঘাতের পর এটিই ছিল প্রকাশ্যে ঘটা প্রথম কোনো নৌ-সংঘর্ষ বা মুখোমুখি পরিস্থিতি।
ওমানের
প্রায় ২২০ কিলোমিটার পূর্বে—প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে এই ঘটনাটি ঘটে।
ওই এলাকায় টহলের সময় একে অপরের সীমানায়
এমনভাবে প্রবেশ করে যে, নৌ-চলাচল সংক্রান্ত সামান্য ভুলও বড় ধরনের
কৌশলগত উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।
ভারতের
অভিযোগ, পিএনএস হুনাইন তাদের যুদ্ধজাহাজটিকে অনুসরণ (শ্যাডো) করছিল এবং ভিএইচএফ চ্যানেল
১৬-এর মাধ্যমে দেওয়া
বারবার সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল। এরপর জাহাজটি হঠাৎ
গতি বাড়িয়ে ভারতীয় জাহাজটির সম্মুখভাগ বা 'বো'-এর
সামনে দিয়ে—ডান দিক
বা 'স্টারবোর্ড' থেকে—আড়াআড়িভাবে অতিক্রম
করার চেষ্টা করে। এ সময় পিএনএস
হুনাইনের সামনের অংশের সঙ্গে ভারতীয় জাহাজটির ঘষা লাগে।
এতে
বড় কোনো কাঠামোগত ক্ষতি
বা হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও এই সংঘর্ষ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে:
শান্তিকালীন নজরদারি, আক্রমণাত্মকভাবে অনুসরণ এবং অস্পষ্ট কমান্ড-উদ্দেশ্য কীভাবে নৌ-সিদ্ধান্ত গ্রহণের
সময়সীমাকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে—বিশেষ করে যখন কমান্ডাররা
অমীমাংসিত রাজনৈতিক বৈরিতা এবং সংঘাত-পরবর্তী
উচ্চ সামরিক সতর্কতার আবহে কাজ করেন।
ভারতের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাকিস্তানের নৌবাহিনীর এই আচরণকে "অগ্রহণযোগ্য
ও অপেশাদার" বলে অভিহিত করেছে।
তাদের যুক্তি, এই কৌশল ১৯৯১
সালের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ১০ নম্বর অনুচ্ছেদের
সরাসরি লঙ্ঘন। ওই চুক্তিতে প্রতিপক্ষ
নৌ-জাহাজগুলোর মধ্যে অন্তত তিন নটিক্যাল মাইলের
দূরত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধকতা
রয়েছে।
নয়াদিল্লি
পাকিস্তানের হাইকমিশনার সাদ আহমেদ ওয়ারাইচকে তলব করে এবং
এ বিষয়ে "কঠোর প্রতিবাদ" জানায়।
একই সঙ্গে, পাকিস্তানের সামরিক ইউনিটগুলোকে প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক ঝুঁকি-হ্রাসকারী ব্যবস্থাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে যথাযথ সতর্কতা
অবলম্বন করতে বলা হয়।
একই
সময়ে ভারত ইসলামাবাদে নিযুক্ত
তাদের হাই কমিশনারকেও পাকিস্তানের
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানোর নির্দেশ দেয়।
এর মাধ্যমে দুই রাজধানীতে সুপরিকল্পিত
ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়, যার লক্ষ্য
ছিল উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং একই
সঙ্গে নয়াদিল্লির দৃষ্টিতে ইচ্ছাকৃত সামুদ্রিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনাটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিবদ্ধ করা।
পাকিস্তান এখনো
এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা
দেয়নি।
ফলে
পিএনএস হুনাইনের এই কর্মকাণ্ড কি
কোনো অনুমোদিত ভীতি প্রদর্শন কৌশল
ছিল, নাকি নজরদারির অবস্থান
নেওয়ার চেষ্টা, নৌ-চলাচলের ভুল,
উত্তাল সমুদ্রে জাহাজ পরিচালনায় ভুল হিসাব, নাকি
ভারতের বর্ণনায় বাদ পড়া অন্য
কোনো পরিস্থিতি—তা এখনো জানা যায়নি।
বিভিন্ন
বিশ্লেষণে ভারতীয় জাহাজটিকে 'আইএনএস কলকাতা' বলে সন্দেহ করা
হলেও নয়াদিল্লি এর পরিচয় নিশ্চিত
করেনি। এছাড়া সংঘর্ষের ঘটনাটি স্বাধীনভাবে যাচাই করার জন্য কোনো
ভিডিও, ছবি, 'অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম'-এর ট্র্যাক বা
জাহাজের ব্রিজের রেকর্ডও প্রকাশ করা হয়নি।
সব দাবি এখন
পর্যন্ত ভারত থেকে
এসেছে। পাকিস্তান এই ঘটনাটি স্বীকারও
করেনি, কিংবা সেন্সর ডেটা, যোগাযোগের রেকর্ড বা নয়াদিল্লির অভিযোগ
যাচাই করতে সক্ষম এমন
কোনো বিকল্প বিবরণও সরবরাহ করেনি।
এরপরও মাঠ পর্যায়ের
ইউনিটগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরেও কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এটি প্রমাণ
করে যে ভারত-পাকিস্তান
প্রতিযোগিতা এখন আরব সাগরের
এমন এক যুদ্ধক্ষেত্রে বিস্তৃত
হয়েছে যেখানে নজরদারি অভিযান, সম্প্রসারিত নৌবহর এবং রাজনৈতিক সংকেত
ক্রমশ খুব কাছ থেকে
একে অপরের সাথে মিলে যাচ্ছে।
তাই
মূল বিপদটি কেবল এই সীমিত
সংঘর্ষ নয়, বরং এর
দ্বারা সৃষ্ট নজির: বারবার আক্রমণাত্মক সংঘর্ষ অনিরাপদ রণকৌশলকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে,
আস্থা তৈরির নিয়মগুলোকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং
এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে
যেখানে পরবর্তী সংঘর্ষ অস্ত্রের সক্রিয়তা, শক্তিবৃদ্ধি বা প্রতিশোধমূলক মোতায়েনকে
উস্কে দেবে।
ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া