যুদ্ধ ও জাতিগত সম্প্রীতির মাঝে মিয়ানমারের রাখাইন

যুদ্ধ ও জাতিগত সম্প্রীতির মাঝে মিয়ানমারের রাখাইন
ম্রাউক-উ টাউনশিপের একটি গ্রামের বাজারে কেনাকাটা করছেন আরাকানি ও মুসলিম মহিলারা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ছবিটি তোলা। ছবি: ডিএমজি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে ক্রমাগত নতুন রূপ দিচ্ছে যুদ্ধ। কিন্তু আড়ালে ঘটে চলছে এক নীরব রূপান্তর, যা যুদ্ধক্ষেত্রের যেকোনো সাফল্যের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে।

এখন রাজ্যের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে আরাকান আর্মি (এএ)। তারা তাদের বৈচিত্র্যময় ও বিভেদপ্রিয় জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর সুস্পষ্ট ফলও পাওয়া যাচ্ছে।

এর একটি উদাহরণ হলো ম্রাউক-উ টাউনশিপের উজানের লেমিও নদী এলাকা। এখানে আরাকানি, চিন, ম্রো, খামি এবং মারামারগি সম্প্রদায় পাশাপাশি বসবাস করে। এখানকার বাসিন্দারা বলেন যে, আন্তঃজাতিগত সম্পর্ক এখন বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ এবং প্রকাশ্য শত্রুতা প্রায় নেই বললেই চলে।

খিতেচাউং গ্রামের ৫৩ বছর বয়সী কান থেইন বলেন,  “আরাকান পিপলস অথরিটি (এএ) জনগণকে সমানভাবে শাসন করে। আমরা চিন জাতিগোষ্ঠীর হওয়া সত্ত্বেও, আমাদের সাথে আন্তরিক ও শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করা হয়।”

লেমিও চাউং এলাকার মারামারগি বাসিন্দারাও বলেন যে, আন্তঃজাতিগত সম্পর্ক, যোগাযোগ এবং বাণিজ্যের উন্নতি হয়েছে।

তারা সামরিক শাসনের সময়কাল এবং বর্তমান প্রশাসন, আরাকান পিপলস রেভোলিউশনারি গভর্নমেন্টের (এপিআরজি) মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

ম্রাউক-উ-এর ইয়াওমানি গ্রামের মারামারগি নারী উ স নুয়ে বলেন: “পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। যাতায়াত সহজ হয়েছে। এমনকি রাতেও যদি শিশু বা গর্ভবতী মহিলাদের কিছু হয়, আমরা বাইরে যেতে পারি। সামরিক জান্তার আমলে আমরা রাতে চলাচলের সাহস করতাম না। এখন সবকিছু অনেক বেশি সুবিধাজনক: প্রশাসন এবং পরিবহন উভয়ই অনেক উন্নত হয়েছে।”

এই সাক্ষ্যগুলো প্রশাসনিক পরিবর্তনের চেয়েও গভীর কিছুর দিকে ইঙ্গিত করে। এগুলো আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ধারায় শাসনব্যবস্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়, যদিও তা অসম্পূর্ণ।

কর্তৃত্বের এক ভিন্ন মডেল

২০২৩ সালের শেষভাগ থেকে, রাখাইনের বেশিরভাগ অংশে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকরভাবে প্রতিস্থাপন করেছে আরাকানে আর্মি (এএ)।

কয়েক দশক ধরে, আরাকানের জাতিগত সংখ্যালঘুরা, বিশেষ করে চিন, ম্রো, খামি এবং তাদের মতো ছোট ছোট সম্প্রদায়গুলো কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র, সংঘাতের গতিপ্রকৃতি এবং কখনও কখনও স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামোর কাছ থেকে প্রান্তিকীকরণের স্তরের পর স্তর মোকাবেলা করে এসেছে। শাসনব্যবস্থা প্রায়শই ছিল দূরবর্তী, জবরদস্তিমূলক বা একেবারেই অনুপস্থিত।

২০২১ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি এই ফাটলগুলোকে আরও গভীর করে তোলে। সেনাবাহিনী বিমান ও গোলন্দাজ হামলাসহ তাদের অভিযান জোরদার করায়, রাখাইন জুড়ে বেসামরিক জীবনযাত্রার দ্রুত অবনতি ঘটে। ব্যাপকহারে মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে জনগোষ্ঠী বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাজারগুলো ভেঙে পড়ে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ সংকুচিত হয়। মানবিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ভয়াবহ: বিমান হামলায় ক্রমবর্ধমান বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা, গ্রাম ধ্বংস এবং পর্যাপ্ত সহায়তা ছাড়াই সংগ্রামরত অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি।

পরিচয়-রাজনীতি, অবিশ্বাস এবং সংঘাতের কারণে দীর্ঘকাল ধরে বিভক্ত একটি অঞ্চলে, আন্তঃজাতিগত সম্পর্কের সামান্য উন্নতিও অতীত থেকে এক উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতিকে নির্দেশ করে। আর লেমইয়োচাউং-এর মতো জায়গাতেই দৈনন্দিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে নতুন শাসনব্যবস্থা পরীক্ষিত হচ্ছে: চলাচলের স্বাধীনতা, বিরোধ নিষ্পত্তি, স্থানীয় বাণিজ্য এবং সামাজিক সম্পর্ক।

সংঘাতের সময় সম্প্রীতি

তবুও এই উদীয়মান সামাজিক সম্প্রীতি এক তীব্রতর যুদ্ধের পাশাপাশিই বিদ্যমান। আরাকান জুড়ে বেসামরিক এলাকাগুলোতে শাসকগোষ্ঠীর বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে, যার পরিণতি প্রায়শই বিধ্বংসী। গ্রামগুলো ছাই হয়ে গেছে, স্কুল ধ্বংস হয়েছে এবং শিশুরা নিহত বা আহত হয়েছে। মানবিক পরিস্থিতি এখনও ভয়াবহ, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জীবিকার সুযোগ সীমিত।

একদিকে এএ প্রশাসনের অধীনে স্থানীয় সংহতির উন্নতি এবং অন্যদিকে উপর থেকে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার এই দ্বৈত বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে: চলমান যুদ্ধের মাঝে কি একটি নতুন সামাজিক চুক্তি শিকড় গাড়তে পারে?

অনেক সম্প্রদায়ের জন্য এর উত্তরটি বাস্তবসম্মত। টিকে থাকার জন্য অভিযোজন প্রয়োজন। যদি স্থানীয় শাসন কাঠামো নিরাপত্তা, ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি প্রদান করে, তবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নির্বিশেষে সেগুলোর বৈধতা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

অন্তর্ভুক্তির একটি পরীক্ষা

এগুলোর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নির্ভর করবে এগুলো তাৎক্ষণিক যুদ্ধকালীন প্রয়োজনীয়তা থেকে বিকশিত হতে পারে কি না তার উপর।

জাতিগত সম্প্রীতি প্রচার করা কেবল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা বা চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রতি টেকসই অঙ্গীকার: সমান প্রতিনিধিত্ব, সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা।

রাখাইন মিয়ানমারের অন্যতম বৈচিত্র্যময় একটি অঞ্চল। এর ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা নির্ভর করবে এই বৈচিত্র্য অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, নাকি তা উত্তেজনার নতুন উৎস হয়ে ওঠে তার উপর।

এএ-এর বর্তমান কর্মপন্থা এই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সচেতনতার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এটি এখনও একটি চলমান প্রক্রিয়া।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মাত্রা

পরিস্থিতিকে বিচ্ছিন্নভাবে বোঝা যায় না। বাংলাদেশের সাথে আন্তঃসীমান্ত গতিশীলতা, চলমান বাস্তুচ্যুতি এবং অমীমাংসিত মুসলিম/রোহিঙ্গা সংকট—এই সবই অভ্যন্তরীণ শাসন সংক্রান্ত প্রশ্নের সাথে জড়িত। সুতরাং রাখাইনে একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার যেকোনো প্রচেষ্টাকে অনিবার্যভাবে এই বৃহত্তর বিষয়গুলোকেও বিবেচনা করতে হবে।

একই সাথে, শাসকগোষ্ঠীর বিমান হামলা প্রতিরোধ বা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে ক্রমাগত রূপ দিয়ে চলেছে।

উদ্বেগ প্রকাশ করে দেওয়া বিবৃতিগুলো সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তনে সামান্যই ভূমিকা রেখেছে। ফলে স্থানীয় জনগণকে নিজেদের মতো করে শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হচ্ছে।

একটি ভঙ্গুর কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন

লাইমিওচাউং থেকে আসা প্রতিবেদনগুলো থেকে এমনটা মনে হয় না যে রাখাইনের সমস্যাগুলোর সমাধান হয়ে গেছে। তবে এগুলো একটি ভঙ্গুর ও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত দেয়: এই সম্ভাবনা যে, যুদ্ধের মাঝেও সহাবস্থান ও শাসনের নতুন রূপ তৈরি হতে পারে।

ইতিহাস ও সংঘাতের কারণে দীর্ঘকাল ধরে বিভক্ত সম্প্রদায়গুলোর জন্য এই সম্ভাবনাটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোর বাইরে টিকে থাকতে ও প্রসারিত হতে পারবে কিনা তা নির্ভর করবে যুদ্ধের গতিপথ, ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত এবং সম্প্রদায়গুলোর নিজেদের সহনশীলতার ওপর।

লেখক: অং মার্ম উ রাখাইন রাজ্যভিত্তিক সংবাদ সংস্থা ডেভেলপমেন্ট মিডিয়া গ্রুপ (ডিএমজি)-এর প্রধান সম্পাদক ও নির্বাহী পরিচালক। তিনি মিয়ানমারের বেআইনি সংগঠন আইনের অধীনে অভিযুক্ত এবং ২০১৯ সালের মে মাস থেকে আত্মগোপন করে আছেন।

দ্য ইরাবতী থেকে অনুবাদ