বাংলাদেশে কেমন চলছে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’

বাংলাদেশে কেমন চলছে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’
ছবি: ইলাস্ট্রেশন, ডেইলি স্টার

২০১৬ সালের ১৪ই অক্টোবর, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর বাংলাদেশ সফরকালে, ঢাকা ও বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সম্পর্ককে ‘কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারিত্ব’-এ উন্নীত করে এবং বাংলাদেশ চীনের অর্থায়নে পরিচালিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর অংশগ্রহণকারী হয়। তারপর থেকে, বাংলাদেশে চীনের পৃষ্ঠপোষকতায় বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও বেশ কয়েকটি চলমান রয়েছে।

২০২৪ সালের ১১ই জুলাই, ঢাকা ও বেইজিং তাদের অংশীদারিত্বকে আরও উন্নত করে ‘ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতা’র পর্যায়ে উন্নীত করে। এর এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো জুলাই অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) বিজয়— এর কোন কিছুই বিআরআই-তে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করেনি।

২০১৬ সাল থেকে বিআরআই-তে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর নির্ভর করে, কেউ কেউ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্বকে সমর্থন করেছেন এবং বিআরআই-এর মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন। আবার অন্যরা ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাব্য অবনতি এবং একটি সম্ভাব্য ‘ঋণ ফাঁদ’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে, অনেক ভাষ্যকারের উপস্থাপিত সরলীকৃত বিতর্কের চেয়ে বাস্তবতা অনেক বেশি সূক্ষ্ম।

বাংলাদেশে বিআরআই প্রকল্প: প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা

বিআরআই-এর অধীনে, বাংলাদেশের চীন থেকে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল: ২৬ বিলিয়ন ডলার স্বতন্ত্র প্রকল্পের জন্য এবং ১৪ বিলিয়ন ডলার যৌথ উদ্যোগ প্রকল্পের জন্য। তবে, এই বিনিয়োগগুলোর বেশিরভাগই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ২০২৩ সালে জানান যে, চীন দেশের ৩৫টি বিআরআই প্রকল্পের জন্য ৪.৪৫ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, যা প্রতিশ্রুত অর্থের এক-দশমাংশের সামান্য বেশি। তবে, অক্টোবর ২০১৬ থেকে এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে বিআরআই-এর অধীনে চীন কর্তৃক বাংলাদেশকে প্রদত্ত সঠিক পরিমাণ অর্থ জানা যায়নি।

বাংলাদেশে বিআরআই-এর বেশিরভাগ প্রকল্পই পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো সম্পর্কিত। তবে, সাধারণভাবে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দেশে বিআরআই প্রকল্পের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। বেশিরভাগ হিসাবে ৩৫-৪০টি প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয় এবং একটি ওয়েবসাইট ভুলবশত বিআরআই-এর অধীনে ৬৪টি প্রকল্পের তালিকাও দিয়েছে। সুতরাং, বাংলাদেশে বিআরআই সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব এর প্রকৃত প্রভাব পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তা সত্ত্বেও, উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে একটি সাধারণ চিত্র পাওয়া এখনও সম্ভব।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে সম্পন্ন হওয়া বিআরআই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু, অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁশখালী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, দশেরকান্দি পয়ঃনিষ্কাশন শোধনাগার, চতুর্থ স্তরের জাতীয় ডেটা সেন্টার এবং বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্র। দেশে আংশিকভাবে সম্পন্ন, নির্মাণাধীন এবং প্রস্তাবিত বিআরআই প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পায়রা সমুদ্রবন্দর, নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, মহেশখালী সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি-র অধীনে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের উন্নয়ন, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)-র অধীনে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল, জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, রাজশাহী ভূপৃষ্ঠের পানি শোধনাগার, নীলফামারীতে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হল।

এদিকে, বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বিআরআই প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ভারতের তীব্র বিরোধিতা এবং পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে ঢাকা ২০২০ সালের আগস্টে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি বাতিল করে দেয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার অতিরিক্ততা ও ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা পাঁচটি বিআরআই প্রকল্প—ঢাকা-সিলেট চার-লেন মহাসড়ক প্রকল্প, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির বিদ্যমান ভূগর্ভস্থ কার্যক্রমের সম্প্রসারণ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) বিতরণ অঞ্চলসমূহ, গজারিয়া কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনস্থ পাটকলগুলোর পুনরুজ্জীবন—বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময়ে, চীন বাংলাদেশকে জানায় যে তারা দেশে কয়লা খনি ও কয়লা-চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো উচ্চ দূষণ ও উচ্চ শক্তি খরচের কোনো প্রকল্প আর গ্রহণ করবে না। এছাড়াও, ২০২১ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি স্থগিত করে এবং এর পরিবর্তে পায়রায় একটি সাধারণ সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। এর কারণ হিসেবে উচ্চ ড্রেজিং খরচ, অগভীরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা এবং অধিক সম্ভাবনাময় মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। একইভাবে, ২০২৪ সালের মে মাসে ঢাকা অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাই-স্পিড রেলওয়ে প্রকল্পটি স্থগিত করে।

এরপাও বিআরআই-এর অধীনে চীন বাংলাদেশে, বিশেষ করে পরিবহন ও জ্বালানি খাতে, বেশকিছু অবকাঠামো প্রকল্প সম্পন্ন করেছে এবং বর্তমানেও কিছু বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া, চীনা কোম্পানিগুলো দেশটিতে ২২.৯৪ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের চুক্তি পেয়েছে। তবে, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের ব্যাপক সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও, এটিকে দেশটির ওপর চীনের কোনো ধরনের অবকাঠামোগত একচেটিয়া আধিপত্য হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি চীনা প্রকল্প স্থগিত করে তার কৌশলগত সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে এবং ভারত, জাপান, রাশিয়া ও বেলজিয়ামসহ আরও বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র দেশটির প্রধান অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পগুলোতে জড়িত রয়েছে।

তাছাড়া, চীন ২০১৬ সালে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিলেও, এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুত অর্থের সামান্য অংশই বাস্তবে বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং প্রকল্পের ক্রমবর্ধমান ব্যয় বাংলাদেশের দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করেছে, অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতির ঝুঁকি এবং ঋণের টেকসই অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করেছে। সুতরাং, যদিও বিআরআই বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে, এটি এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়া থেকে অনেক দূরে এবং বেশ কিছু বাস্তব, আর্থিক, পরিবেশগত ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

বাংলাদেশ এবং চীনের ‘ঋণ ফাঁদ’-এর প্রশ্ন

২০১৬ সাল থেকে চীনের কাছে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঋণ নিয়ে বহুবার উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা এই আশঙ্কা তৈরি করেছে যে ঢাকা বেইজিংকে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। তবে, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের কাঠামো নিয়ে একটি তদন্তই এই আশঙ্কা দূর করার জন্য যথেষ্ট হবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৮.০৬৭ বিলিয়ন ডলারে। যদিও ২০২৬ সালে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের উৎস সম্পর্কিত সর্বশেষ তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে ২০২৫ সালের জুনের একটি সরকারি প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বৃহত্তম ঋণদাতা, এরপরে রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাপান। চীন বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম ঋণদাতা এবং এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের মাত্র ৭ শতাংশের উৎস।

তাছাড়া, বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জুনের মধ্যে বাংলাদেশকে ২ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেখানে চীন সম্প্রতি অনুরূপ কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। সুতরাং, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বাংলাদেশের ঋণ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ অদূর ভবিষ্যতে চীনের কাছে এর ঋণ বাড়ার কোনো পূর্বাভাস নেই।

চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম ঋণদাতা নয়; এটি শীর্ষ তিনের মধ্যেও নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর পদ্ধতিগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চীনে ঋণের পরিমাণ খুবই কম। অধিকন্তু, বাংলাদেশ চীনের কাছে নেওয়া ঋণ খেলাপের কাছাকাছিও যায়নি, কিংবা ঋণ পুনর্গঠনের অনুরোধও করেনি, এবং চীনও বাংলাদেশ থেকে কোনো সম্পদ অধিগ্রহণের চেষ্টা করেনি। ঢাকা স্বাভাবিকভাবেই চীনের ঋণ পরিশোধ করছে, এবং দেশটি কোনো বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন না হলে, কোনো ধরনের ‘ঋণ ফাঁদে’ পড়ার সম্ভাবনা নেই।

বাংলাদেশে বিআরআই অবকাঠামোর সামরিক ব্যবহার: মাঠের বাস্তবতা

সমালোচকরা সাধারণত বাংলাদেশে বিআরআই প্রকল্পগুলোকে একটি বৃহত্তর চীনা কৌশলের অংশ হিসেবে দেখেন, যার মাধ্যমে চীন ‘মালাক্কা সংকট’ সমাধান, দুই মহাসাগর জুড়ে বিস্তৃত একটি ব্লু-ওয়াটার নেভি গঠন এবং এই অঞ্চলে তার প্রতিপক্ষের প্রভাব মোকাবেলার লক্ষ্যে বঙ্গোপসাগরে তার ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। বিশেষ করে, সমালোচকদের মতে, চীন কৌশলগত উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের অবকাঠামো, বিশেষত এর সমুদ্রবন্দরগুলোকে ব্যবহার করতে চায়।

বাংলাদেশের চীনের সাথে একটি শক্তিশালী সামরিক-প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, কারণ এর ৭০ শতাংশেরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম চীনের তৈরি এবং চীন বিএনএস পেকুয়া নির্মাণসহ এর সামরিক অবকাঠামোর উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। তবুও, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত বাহ্যিক সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ার জন্য সামরিক জোটে অংশগ্রহণ এবং তার ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন সযত্নে এড়িয়ে চলেছে।

চীনের সাথে বাংলাদেশের কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নেই এবং ভারত-বাংলাদেশ উত্তেজনার চরম মুহূর্তেও দেশটি ২০২৫ সালের জুনে চীন ও পাকিস্তানের সাথে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। একইভাবে, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট (এসিএসএ) স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থেকেছে এবং পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার, ভারতের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও, এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতীয় উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্থাপনে সহায়তা করেনি। এটি সামরিক জোট এবং বিদেশি ঘাঁটি সম্পর্কে বাংলাদেশের আশঙ্কাকে তুলে ধরে এবং এটি তার পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতির একটি মূল ভিত্তি।

সুতরাং, এই অঞ্চলে যদি চীনকে জড়িত করে কোনো বৃহৎ শক্তির যুদ্ধ শুরু হয়, তবে বাংলাদেশ যুদ্ধে কোনো পক্ষকেই তার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেওয়ার সম্ভাবনা কম। ফলস্বরূপ, যুদ্ধকালীন সময়ে চীনের পক্ষে বাংলাদেশে অবস্থিত বিআরআই-সংযুক্ত অবকাঠামো ব্যবহার করার সম্ভাবনাও কম।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদিও চীনের জন্য বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে, তবে এটিকে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়। মালাক্কা প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে চীন পণ্য পরিবহনের জন্য পাকিস্তান ও মিয়ানমারের সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশকে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। চীন যদি কখনো বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন করতে চায়, তবে তাকে পথে ভারত বা মিয়ানমারের ভূখণ্ড অতিক্রম করতে হবে। চীন-ভারত সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যে চলমান তীব্র সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে এই পথটি অলাভজনক, ঝুঁকিপূর্ণ এবং অকার্যকর।

চীন-ভারত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভূখণ্ড চীনের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ২০২০ সালের চীন-ভারত সংঘাত এবং ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের বিষয়ে বাংলাদেশের নীরব ও নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া এটাই প্রমাণ করে যে, ঢাকা এমন কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়াতে চায় না যা তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। সুতরাং, চীন যদি সামরিক উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে বিআরআই-সংযুক্ত অবকাঠামো ব্যবহার করতেও চায়, তবে তা বেইজিংয়ের জন্য কার্যত অসম্ভব হবে।

উপসংহার

বিগত দশকে, বিআরআই-এর সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্য কিন্তু অসম অগ্রগতি এনেছে, যা পরিবহন ও জ্বালানি অবকাঠামো খাতে সবচেয়ে দৃশ্যমান। তবে, বিলম্ব, ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং নির্বাচিত প্রকল্প সংশোধনের কারণে এই অগ্রগতি সীমাবদ্ধ থেকেছে। চীনের ‘ঋণ ফাঁদ’ নিয়ে উদ্বেগ দেশটির বৈদেশিক ঋণ কাঠামো দ্বারা সমর্থিত নয়, যেখানে বহুপাক্ষিক ও অন্যান্য দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের তুলনায় চীনের অংশ তুলনামূলকভাবে নগণ্য। একইভাবে, বিআরআই-তে অংশগ্রহণ কোনো কৌশলগত নির্ভরশীলতায় পরিণত হয়নি, কারণ বাংলাদেশ পররাষ্ট্রনীতিতে তার ধারাবাহিক নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং সামরিক জোট এড়িয়ে চলেছে। সারকথা হলো, বিআরআই ভূ-রাজনৈতিক অধীনতার পরিবর্তে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাস্তবসম্মত ও উন্নয়নমুখী সহযোগিতার প্রতিফলন ঘটায়।

লেখক: মোঃ হিমেল রহমান গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রভাষক।

দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ