আঙ্কারা ও ঢাকার মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আদান-প্রদান, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের তুরস্ক সফর এবং আন্তালিয়া ডিপ্লোমেসি ফোরামে (এডিএফ) তাঁর অংশগ্রহণ, ইত্যাদি, দুই দেশের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্কের নিদর্শন। কিন্তু শুধুমাত্র সফর, চুক্তি এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যের উপর মনোযোগ দিলে একটি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে: বাংলাদেশ কেন এখন তুরস্কের জন্য কৌশলগতভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে?
এর উত্তর শুধু দ্বিপাক্ষিক সদিচ্ছার মধ্যেই নিহিত নয়, বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে একটি গভীর পরিবর্তন এবং দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে একটি বৃহত্তর রূপান্তরের মধ্যেও রয়েছে।
বিগত ১৫ বছরের বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি সংকীর্ণ কৌশলগত পরিসরের মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। এর বাহ্যিক সম্পর্কগুলো ভারতের সঙ্গে জোটবদ্ধতার দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রভাবিত ছিল। এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশের অন্য কোনো অংশীদার ছিল না, কিন্তু এর অর্থ ছিল যে অনেক কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত স্পষ্ট আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে নেওয়া হয়েছিল। এর প্রভাব দৃশ্যমান ছিল। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মূলত স্থবির এবং বছরের পর বছর ধরে সরাসরি ফ্লাইট স্থগিত ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা হ্রাস পেয়েছিল এবং এমনকি একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিষ্ক্রিয় না থাকলেও তা ছিল সীমাবদ্ধ।
এই অবস্থার এখন পরিবর্তন হচ্ছে।
জুলাই ২০২৪-এর পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাবলী এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন ঢাকার কূটনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এডিএফ-এ খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ এখন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার গণ্ডি পেরিয়ে আরও সক্রিয় আঞ্চলিক ভূমিকার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং এর বৃহত্তর মিত্রদের সঙ্গে যুক্ত উদীয়মান নেতৃত্ব আরও ভারসাম্যপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণে আগ্রহ দেখিয়েছে। লক্ষ্য ভারতের সঙ্গে সংঘাত নয়, বরং একটিমাত্র কৌশলগত দিকনির্দেশনার বাইরে গিয়ে বৈচিত্র্য আনা।
এই পরিবর্তন পুরোপুরি নতুন নয়। এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসের একটি পূর্ববর্তী পর্যায়কে প্রতিফলিত করে।
১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে বাংলাদেশ এমন একটি ভারসাম্যপূরর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেছিল। তাঁর প্রশাসন বিভিন্ন বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রেখে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসারিত করেছিল। বাংলাদেশ ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)-তে সক্রিয় হয় এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ আজ সেই ধারণার দিকেই ফিরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে, বর্তমান পরিস্থিতি আরও এগিয়ে গেছে। ঢাকা শুধু তার পররাষ্ট্রনীতিই সমন্বয় করছে না, বরং আঞ্চলিক পরিবেশকেও নিজের মতো করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার উপর নতুন করে জোর দেওয়া এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশের নেতৃত্ব সম্প্রতি আরও সক্রিয় ও কার্যকর সার্কের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে এবং উল্লেখ করেছে যে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে কম সমন্বিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি একটি অবস্থানগত পরিবর্তন। বাংলাদেশ এখন আর নিজেকে শুধু স্থিতিশীলতাকামী একটি দেশ হিসেবে উপস্থাপন করছে না, বরং আঞ্চলিক সমন্বয়ে ভূমিকা রাখতে ইচ্ছুক একটি দেশ হিসেবে তুলে ধরছে।
তুরস্কের জন্য, এই পরিবর্তনটি কৌশলগত তাৎপর্য বহন করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের প্রবেশ
দক্ষিণ এশিয়ায় আঙ্কারার সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সাথে তার শক্তিশালী সম্পর্ককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ এবং তা অব্যাহত থাকবে। তবে, দক্ষিণ এশিয়া এখন আর কেবল একটি সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক পরিসর নয়। এটি আরও জটিল, আরও প্রতিযোগিতামূলক এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সাথে আরও বেশি সংযুক্ত হয়ে উঠছে।
এই পরিবেশে, একটিমাত্র আঞ্চলিক অংশীদারের উপর নির্ভর করা কৌশলগত পরিধিকে সীমিত করতে পারে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ভিন্ন কিছু দিতে পারে।
প্রথমত, এর জনসংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৭ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দেশ। গত এক দশকে এর অর্থনীতি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে উৎপাদন এবং রপ্তানি খাতে। এটি এখন বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পে। দেশটি ক্রমবর্ধমান একটি ভোক্তা বাজারেও পরিণত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, এর ভৌগোলিক অবস্থান আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনায় একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। এটি দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে সংযুক্ত করে এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের কাছাকাছি অবস্থিত। এটি ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্পের সাথেও যুক্ত। এই কারণে বাংলাদেশ শুধু একটি জাতীয় বাজারই নয়, বরং একটি আঞ্চলিক প্রবেশদ্বারও বটে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরীয় বহু-খাতভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (বিমসটেক)-এর মতো বৃহত্তর আঞ্চলিক কাঠামোর সাথে সংযুক্ত, যা দক্ষিণ এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাথে যুক্ত করে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণই করছে না, বরং অঞ্চলগুলোর মধ্যকার পরিসর গঠনেও সহায়তা করছে।
চতুর্থত, তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতার একটি শক্তিশালী ভিত্তি ইতিমধ্যেই রয়েছে।
প্রতিরক্ষা সম্পর্ক প্রসারিত হতে শুরু করেছে এবং বাংলাদেশ ড্রোনসহ তুর্কি প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। এটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে দেশগুলো বৈচিত্র্যময় প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব খুঁজছে এবং তুরস্ক এই ক্ষেত্রে একটি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
মানবিক সম্পৃক্ততাও তুরস্কের অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর থেকে তুর্কি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলো বাংলাদেশে সক্রিয় রয়েছে। এটি আস্থা তৈরি করেছে এবং প্রয়োজনের সময়ে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে তুরস্কের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও প্রসারিত হচ্ছে, যদিও তা এখনও তার পূর্ণ সম্ভাবনার নিচে রয়েছে। বস্ত্র, যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো, জ্বালানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সুস্পষ্ট সুযোগ রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তুরস্কের গুরুত্ব কূটনৈতিক আচরণেও প্রতিফলিত হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের প্রথম দ্বিপাক্ষিক সফর ছিল আঙ্কারায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এডিএফ-এর জন্য তাঁর তুরস্ক সফর এই সম্পর্ককে দেওয়া অগ্রাধিকারকে আরও জোরদার করে। এই ধরনের ইঙ্গিত থেকে বোঝা যায় যে, ঢাকা তুরস্ককে শুধু অংশীদার হিসেবেই নয়, বরং তার বৃহত্তর কূটনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবেও দেখে।
উভয়ের জন্যই সুযোগ
তবুও বাংলাদেশের প্রকৃত গুরুত্ব এই স্বতন্ত্র ক্ষেত্রগুলোর ঊর্ধ্বে। দক্ষিণ এশিয়া এখন জোটগত পরিবর্তনের একটি সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত ও চীন প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রতিযোগিতা করছে। পাকিস্তান চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত রয়েছে। আফগানিস্তানও এমনভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে যা আঞ্চলিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে।
এই পরিস্থিতিতে, যে দেশগুলো নমনীয়তা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তারা আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ নিজেকে সেই দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এটি কোনো একটি পক্ষ বেছে নিচ্ছে না। বরং, এটি একাধিক অংশীদারিত্বের জন্য জায়গা উন্মুক্ত করছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি তুরস্কের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির ধরনের সঙ্গে মিলে যায়, যা নমনীয়তা, বহুমুখী সম্পৃক্ততা এবং কৌশলগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেয়।
আঙ্কারার জন্য, এটি একটি সুস্পষ্ট সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশকে শুধু একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশ বা একটি ক্রমবর্ধমান বাজার হিসেবে দেখার পরিবর্তে, তুরস্ক এটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি পূর্বাঞ্চলীয় কৌশলগত নোঙর হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে। এটি বিদ্যমান অংশীদারিত্বগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে না। বরং এটি সেগুলোকে পরিপূরক করবে এবং তুরস্কের আঞ্চলিক পরিধি প্রসারিত করবে।
এই পরিবর্তনের জন্য আকস্মিক নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। এটি ধীর ও স্থিতিশীল পদক্ষেপের মাধ্যমে বিকশিত হতে পারে। তুরস্ক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করতে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক জোরদার করতে এবং মানবিক সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখতে পারে। এটি একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক পদ্ধতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত করতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়াকে বৃহত্তর এশীয় কাঠামোর সাথে সংযুক্ত করে।
বাংলাদেশের জন্য, তুরস্কের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে তার বৈদেশিক সম্পর্ককে বৈচিত্র্যময় করার একটি পথ খুলে দেয়। তুরস্কের জন্য, বাংলাদেশ একটি বৃহৎ ও ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান এবং এমন একজন অংশীদারের সান্নিধ্য এনে দেয়, যে এই অঞ্চলে সক্রিয়ভাবে তার ভূমিকা নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
সুতরাং, বর্তমান মুহূর্তটিকে কেবল সম্পর্ক উন্নয়নের একটি সময় হিসেবে বোঝা উচিত নয়। এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশ সীমাবদ্ধ কূটনীতির পর্যায় থেকে কৌশলগত ভারসাম্যের পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তুরস্ক যদি প্রতিষ্ঠিত রীতির বাইরে তাকায়, তবে এই পরিবর্তনের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য এটি একটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
আজ যা ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক উষ্ণতা বলে মনে হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি গভীরতর পুনর্গঠনের প্রাথমিক পর্যায় হতে পারে।
ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ