ইরান-সংঘাতে ‘মধ্যস্থতা’ নিয়ে পাকিস্তানের বাজি

ইরান-সংঘাতে ‘মধ্যস্থতা’ নিয়ে পাকিস্তানের বাজি
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার আগে ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেল ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা, ছবিটি ২১ এপ্রিল ২০২৬ তোলা। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে রাজি হওয়ার সময় পাকিস্তান নিশ্চয়ই জানত যে, দুই অবিশ্বাসী প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে শান্তি স্থাপন করা সহজ হবে না।

ইসলামাবাদের জন্য সাম্প্রতিক দিনগুলো বিশেষভাবে কঠিন। ১১ ও ১২ই এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার আলোচনা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। পাকিস্তান এই সপ্তাহে দ্বিতীয় দফার আলোচনার আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে উভয় পক্ষ ইসলামাবাদে যেতে পারেনি। শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে এখন সন্দেহ দানা বাধছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কোনো বোঝাপড়া ছাড়া যতদিন পর্যন্ত মধ্যস্থতার এই প্রচেষ্টা চলবে, ততদিন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানকে উচ্চমাত্রার ঝুঁকি নিতে হবে।

প্রথমত, ইরানের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ হলেও ভঙ্গুর; ইসলামাবাদ যে বিশ্বাস ও সমর্থন অর্জন করেছে, তা নষ্ট হতে শুরু করতে পারে। গত মাসে পাকিস্তানের সাথে যৌথভাবে প্রকাশিত পাঁচ-দফা শান্তি পরিকল্পনায় চীনের সমর্থন স্পষ্ট হয়েছে। ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা যাতে তেহরান মেনে নেয়, তা নিশ্চিত করার জন্যই সম্ভবত এই সমর্থন প্রয়োজন ছিল। কারণ, তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব বেশি।

কিন্তু এই আলোচনায় পাকিস্তান যত বেশি দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দূত ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে, ইরানের সন্দেহ ততই বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাকিস্তানের নেতাদের ঘন ঘন প্রশংসা ইরানের কাছে ইসলামাবাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। এর আগে প্রকাশিত খবরে বলা হয় যে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পাকিস্তানিদের উৎসাহিত করেছেন ট্রাম্প।

ইরানের ঘোর প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মৈত্রী এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এখনও তেহরানের চোখে একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ণ করেনি। এর একটি কারণ সম্ভবত এই যে, পাকিস্তান ইরানের সাথে সম্পর্ক গভীর করতে এবং নিজেকে একটি নিরপেক্ষ পক্ষ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে। কিন্তু ইসলামাবাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা যদি ইতিবাচক ফল দিতে ব্যর্থ হয় তবে তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে।

পাকিস্তানের জন্য আরেকটি ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক। যদি শান্তি আলোচনা ভণ্ডুল হয় এবং আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ইসলামাবাদ বলির পাঁঠা হতে পারে। বিশেষ করে যেহেতু মধ্যস্থতার প্রচেষ্টায় নিজেদের প্রধান ভূমিকা নিয়ে দেশটি প্রকাশ্যে অনেক কথা বলেছে। বিদেশের সমালোচক এবং দেশের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা একটি উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টায় কূটনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বারা প্রতারিত হওয়ার জন্য পাকিস্তানের তীব্র নিন্দা করবে।

পরিশেষে, এটি উল্লেখ্য যে, যুদ্ধ যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট অচলাবস্থার কারণে পাকিস্তানের জ্বালানি খরচ তত বাড়বে। দেশটি তার ৮০ শতাংশ জ্বালানি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে। এই খরচ ইসলামাবাদের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে, কারণ দেশটি ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল কর্তৃক আরোপিত শর্তাবলী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলো জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা পাকিস্তানের পরিস্থিতিই তুলে ধরে।

পাকিস্তান এই ঝুঁকিগুলো সামলাতে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছন্দ এবং নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। এর কারণ হলো এই খেলায় টিকে থাকার জন্য এর একটি জোরালো প্রেরণা রয়েছে: এটি সংঘাতের প্রভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। প্রথম দফার আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছিল এবং ইসলামাবাদ তা নষ্ট করতে চাইবে না।

পরিশেষে, পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকাকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব আরও গভীর করতে চায়, যা একটি অত্যন্ত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। যতক্ষণ হোয়াইট হাউস ইসলামাবাদকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চাইবে, ততক্ষণ পাকিস্তানিরা সরে আসবে না—তারা অস্থিরমতি ও অপ্রত্যাশিত ট্রাম্প প্রশাসনের সুনজরেও থাকতে চায়।

প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকার জন্য পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও প্রশংসা পেয়েছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ বাড়তে থাকায়, সুসময় সম্ভবত শেষ হয়ে এসেছে। পাকিস্তানকে শীঘ্রই এমন একটি ভূমিকা গ্রহণের কঠিন পরিণতির সাথে লড়াই করতে হবে, যা তার বৈশ্বিক মর্যাদা বাড়িয়েছে কিন্তু একই সাথে তাকে একটি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানেও ফেলেছে।

সূত্র: ফরেন পলিসি