শান্তিতে নোবেলজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস মর্যাদাপূর্ণ ‘হিলারি রোডহ্যাম ক্লিনটন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন
ডিসির জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানে
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের
হাতে এই পুরস্কার তুলে
দেন দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
শুক্রবার (১৬
অক্টোবর) এক সংবাদ
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাস্টন
হলরুমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রায়
২৫টি দেশের রাষ্ট্রদূত, উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও গবেষকসহ প্রায়
৪০০ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে ড. ইউনূসের নাম
ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সকলে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ
সময় ধরে করতালি দিয়ে
তাকে সম্মান জানান।
এ বছর ড. ইউনূসসহ
মোট চারজনকে এই সম্মাননা দেওয়া
হয়েছে। অপর তিন বিজয়ী
হলেন, ভারতের ‘সেলফ-এমপ্লয়েড উইমেনস
অ্যাসোসিয়েশন’ (সেবা)-এর পরিচালক রিমা
নানাবতী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও ‘টোরি বার্চ
ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা টোরি
বার্চ এবং জর্দানের ‘মাইক্রোফান্ড
ফর উইমেন’-এর বোর্ড চেয়ার
মুনা সুখতিয়ান। মুনা সুখতিয়ানকে বিশেষ
‘জর্জটাউন অ্যাম্বাসেডরস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে
ড. ইউনূসের ভূয়সী প্রশংসা করে হিলারি ক্লিনটন
বলেন, ‘আমি নিজে গ্রামীণ
ব্যাংকের কার্যক্রম দেখেছি। নারীরা কীভাবে স্বাবলম্বী হয়েছে, নিজেদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত
করেছে। এটা অভূতপূর্ব। শুধু
বাংলাদেশের নারীরা নয়, ড. ইউনূস
তার কাজ সারা পৃথিবীতে
ছড়িয়ে দিয়েছেন।’
পুরস্কার
গ্রহণের পর বক্তৃতায় ড.
ইউনূস তার কাজের ৫০
বছর পূর্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, আমাদের
কাজের ৫০ বছরের স্বীকৃতি
দেওয়া হচ্ছে। এখানে আপনারা যে আয়োজন করেছেন,
তা বাংলাদেশে একটি বড় বার্তা
পৌঁছে দেবে এবং গ্রামীণ
পরিবারকে অনুপ্রাণিত করবে।
দারিদ্র্য
বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে
গ্রামীণ ব্যাংকের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি
বলেন, আমরা ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে
চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষকে নিজের
পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করেছি। আমরা নারীদের দিকে
মনোযোগ দিয়েছি। তারা যেন নিজেদের
শক্তি কাজে লাগাতে, নিজের
দায়িত্ব নিজেই নিতে পারেন এবং
পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেন।
তিনি
বলেন, আজ সেই পরিবারগুলো
অনেক বদলে গেছে। এখন
আর লাজুক, চুপ করে বসে
থাকা দরিদ্র নারী দেখা যায়
না, বরং দেখা যায়
আত্মবিশ্বাসী নারী, যারা নিজেদের সমস্যা
ও প্রয়োজনের কথা তুলে ধরেন।
এসব নারী নিজেদের ব্যাংক
নিজেরাই পরিচালনা করেন, আর তারাই গ্রামীণ
ব্যাংকের মালিক।
ঋণগ্রহীতাদের
সন্তানেরাও এখন চাকরি খুঁজছে
উল্লেখ করে ড. ইউনূস
বলেন, আমরা তাদের বলেছি,
এ কথাটি বারবার বলো- ‘আমরা চাকরিপ্রার্থী নই,
আমরা চাকরিদাতা।’ কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে
নিজের ব্যবসা গড়ে তুলতে হবে।
এ সময় সামাজিক ব্যবসার
ধারণার কথা উল্লেখ করে
তিনি জানান, এর উদ্দেশ্য ব্যক্তিগত
মুনাফা নয়, বরং সমস্যার
সমাধান করা। স্বাস্থ্যসেবা খাতে
সামাজিক ব্যবসার তহবিল থেকে দেশের বিভিন্ন
এলাকায় হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও চক্ষু হাসপাতাল
গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত
অর্থ পুনরায় স্বাস্থ্যসেবাতেই বিনিয়োগ করা হচ্ছে বলে
জানান তিনি।
বর্তমান
শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন,
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ভুলভাবে সাজানো হয়েছে। কারণ, এটি তরুণদের চাকরিপ্রার্থী
হিসেবে তৈরি করে। শিক্ষার
উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সৃজনশীল
ও উদ্যোগী করে গড়ে তোলা।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাব্যবস্থার কাজ
হওয়া উচিত উদ্যোক্তা তৈরি
করা।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চলতি বছরের শেষ
নাগাদ ‘গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়’ চালুর আশা প্রকাশ করেন
ড. ইউনূস।
তিনি
বলেন, গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’
গড়ার পথে নেতৃত্ব দিতে
পারে। এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের
বোঝানোর চেষ্টা করবে, শুধু সার্টিফিকেটের পেছনে
না ছুটে একজন উদ্যোক্তা
হয়ে ওঠো। ব্যবসা শুরুর
জন্য অর্থায়নসহ যা যা প্রয়োজন,
বিশ্ববিদ্যালয় তা নিশ্চিত করবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে
এটি তাদের প্রচেষ্টার একটি নতুন সূচনা
হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত
করেন তিনি।
বাসস