বহু বছর পর এই প্রথম নিজেকে ভারতীয় ভেবে দারুণ এক আনন্দ অনুভব হচ্ছে। ঠিক যখন সব আশা শেষ হয়ে গেছে মনে হচ্ছিল, তখনই তাঁদের আগমন। বৃষ্টিতে সওয়ার হয়ে এলেন একদল তরুণ তেলাপোকা। বিচারক আর রসিকতার এক অশুভ সংযোগ থেকে তাঁদের জন্ম।

গল্পটা আমাদের সবারই জানা, তবু আলাপের খাতিরে আরও একবার বলা যাক। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেশ অহংকার অবজ্ঞার সঙ্গে কয়েকজন বেকার ভারতীয় তরুণকেতেলাপোকাবলে কটাক্ষ করেছিলেন। এর জবাবে বোস্টনে থাকা অভিজিৎ দিপকে নামের এক শিক্ষার্থী ইনস্টাগ্রামে একটি মন্তব্য পোস্ট করেন: ‘সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়, তবে কী হবে?’ কোটি কোটি তরুণ এতে সাড়া দিলেন। আর এভাবেই জন্ম নিলককরোচ জনতা পার্টি’ (তেলাপোকা জনতা পার্টি) দিপকে হয়ে উঠলেন এই তেলাপোকাদের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা।

তাঁদের প্রথম দাবি ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। দুর্নীতিগ্রস্ত পচে যাওয়া এক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাথায় তিনি বহাল তবিয়তে বসে আছেন, যেখান থেকে প্রতিনিয়ত সরকারি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়।

বিরোধী দলগুলোর মতে, ২০১৪ সাল থেকে পর্যন্ত আনুমানিক ১৫২টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এতে সেই লাখ লাখ তরুণের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে, যাঁরা বছরের পর বছর এসব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অনেক মা-বাবাকে তো সন্তানের পড়াশোনা চালানো পরীক্ষার ফি মেটাতে জমিজমা বা ঘরবাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। এটি আসলে একধরনের আইনি চাঁদাবাজি।

সম্প্রতি ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্টের (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে অন্তত ১২ জন হতাশাগ্রস্ত শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন।

অনলাইনে তেলাপোকাদের ক্ষোভ যখন গণজোয়ারে রূপ নিচ্ছিল, তখন গত জুন বোস্টন থেকে ফিরে সোজা দিল্লি বিমানবন্দরের প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে পৌঁছান দিপকে। লাদাখের প্রখ্যাত আন্দোলনকারী শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন ঘোষণা করেন।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (লিবারেশন) ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) ছয়জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নেহা বোরা, মনীশ কুমার, আমীন অমিতোষ, দানিশ আলী, হৃষিকেশ দীপক অনশনের ঘোষণা দিয়ে পাশের আরেকটি মঞ্চে অবস্থান নেন। দেশের অন্যান্য শহরেও প্রতিবাদ শুরু হয়।

অনশনকারীদের শারীরিক অবস্থার যখন অবনতি হতে শুরু করে, তখন ইন্টারনেটে আলোড়ন তোলা সেই তরুণ তেলাপোকারা সত্যি সত্যিই যন্তর মন্তরে এসে হাজির হতে থাকেন। ককরোচ জনতা পার্টি ঘোষণা দেয়, ২০ জুলাই সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই তারা সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা করবে।

পরিকল্পিত ওই পদযাত্রার দুই দিন আগে পুলিশ সোনম ওয়াংচুককে মঞ্চ থেকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে আটক করে। প্রথমে তাঁকে সরকারি হাসপাতালে রাখা হয়, পরে স্ত্রীর জেদের মুখে রাখা হয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে। তিনি এখনো অনশন করে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, ২০ জুলাই পদযাত্রার সকালে আইসার শিক্ষার্থীরা তাঁদের অনশন ভঙ্গ করেন।

রাজধানী দিল্লিকে একদম কাঁপিয়ে দিলেন তেলাপোকারা। ট্রেনে, বাসে, বিমানে, মেট্রোতে করে হাজার হাজার তরুণ আসতে লাগলেন। দিল্লির বর্ষার আকাশে ভোরের প্রথম আলো ফোটার বহু আগেই যন্তর মন্তরে কোটি কোটি তরুণের ঢল নামল। সূর্য ওঠার আগেই পরিষ্কার হয়ে গেল, যে তরুণ প্রজন্মের চোখ থেকে ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তারা তাদের বাবা-দাদা পূর্বপুরুষদের হারিয়ে ফেলা জিনিস পুনরুদ্ধার করতে এসেছে: জনগণ দেশ হিসেবে আমাদের সম্মান। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার তাঁরা ফেরত চান।

আন্দোলনকারীরা সাহসিকতা, মার্জিত আচরণ কৌতুকবোধ দিয়ে আমাদের ভয়কে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। দিন শেষে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রতিবাদকারীরা বা তাঁদের নেতারা যা চেয়েছিলেন, আন্দোলন এখন তার চেয়েও অনেক বড় কিছুতে রূপ নিয়েছে। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এখন খুব সামান্য এক দাবি। লড়াইয়ের পরিধি এখন অনেক বড়। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত গোটা শাসনব্যবস্থার পচন এখন স্পষ্ট, যা পচা লাশের মতো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সাত বা আট বছরের ছোট ছোট তেলাপোকারাও এই সত্য খুব গুছিয়ে বলতে পারছে।

পদযাত্রার মাত্র কয়েক দিন আগে হুট করে নতুন পুলিশপ্রধান নিয়োগ দেওয়া হয়। আমাদের প্রভাবশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভয়াবহ দক্ষতা নিয়েও নানাজন নানা কথা বলছিলেন। কিন্তু পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়উভয়েই ২০ জুলাই দিল্লিতে ঘটে যাওয়া জনসমুদ্রের মাত্রা বুঝতে ভুল করেছিল। তারা সব রকম চেষ্টা করেছিল। বাস, সড়ক মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু লাভ হয়নি। ইন্টারনেট জ্যাম করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু ইন্টারনেটের যুগে বড় হওয়া এসব তরুণ মিম আর ভিডিওর বন্যায় সব বাধা উড়িয়ে দিলেন। এসব মিম ভিডিও কখনো আপনাকে হাসাবে, কখনো কাঁদাবে।

দিল্লির মতো জায়গায় প্রতিবাদে অংশ নেওয়া তরুণীরা বলছিলেন, ওই ভিড়ের মধ্যে তাঁরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করেছেনযদিও কয়েকজন অভিযোগ করেছেন যে পুলিশ তাঁদের গায়ে হাত দিয়েছে। মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, শিখ, বৌদ্ধসব জাতি শ্রেণি-বর্ণের মানুষ একসঙ্গে একে অপরকে রক্ষা করতে এবং পুলিশের মুখোমুখি হতে দেখা গেছে। বক্তৃতা বা জ্ঞান না দিয়ে তাঁরা আমাদের স্বপ্নপূরণের এক সুন্দর ভারতের পথ দেখিয়ে দিলেন।

এই বিপদ সামলাতে পুলিশ লোহার হলুদ ব্যারিকেড ঝালাই করল। তাদের পুরোনো কৌশল কাজে লাগিয়ে পাথরভর্তি ট্রাক আর ভাঙাচোরা গাড়ি নিয়ে এল, যাতে প্রমাণ করা যায় যে শিক্ষার্থীরা সহিংস হয়ে উঠেছে আর পুলিশ আত্মরক্ষার্থেই পদক্ষেপ নিয়েছে। লাঠিধারী সাধারণ পোশাকের গুন্ডাবাহিনী নামানো হলো। অভিযানের জন্য তৈরি হতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র‍্যাফ) জোয়ানরা তাঁদের পোশাক থেকে নাম মুছে ফেললেন।

বাধ্য অনুগত টিভি চ্যানেলগুলোকে মিথ্যা খবর প্রচারের জন্য তৈরি রাখা হয়েছিল। (কিছু চ্যানেল তো অতি উৎসাহী হয়ে ঘটনা ঘটার আগেই তা প্রচার করে ফেলল। ভারতে আজকাল বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যতের খবরই বেশি দেখানো হয়।)

কিন্তু কোনো কিছুই কাজে আসেনি। পুলিশ র‍্যাফ এলোপাতাড়ি লাঠি চালিয়ে শিশুদের মাথা ফাটিয়ে দিল, হাত-পা ভেঙে দিল। কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ল। তবু তরুণেরা এগিয়ে গেলেন। তাঁরা হেঁটে সোজা সংসদের দিকে চললেনঠিক যেখানে যাওয়ার কথা ছিল। কাছে যেতেই নিরাপত্তাকর্মীরা একে-৪৭ উঁচিয়ে তাঁদের দিকে তাক করল। তবু তাঁরা থামেননি।

পদযাত্রা চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই সরকারের আসল রূপ বেরিয়ে পড়লতাদের মখমলের দস্তানা খুলে বেরিয়ে এল ফ্যাসিবাদী এক লৌহমুষ্টি। একটি স্বৈরাচারী দল, যাদের ভারতের ইতিহাস বা বৈচিত্র্য বোঝার কোনো ক্ষমতা নেই। যে মানুষগুলো কেবল ঘৃণা ছড়াতে জানে, ভালোবাসতে বা চিন্তা করতে জানে না।

পদযাত্রাকারীরা যতই এগিয়ে আসতে লাগলেন, আমাদের বীর অহংকারী প্রধানমন্ত্রীকে তত দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হলো। নতুন তৈরিসংবিধান সংসদভবনের ভেতর থেকে সংসদ সদস্যদের বের হতে দেওয়া হলো না; যে ভবনের প্রধান কাজই নাকি প্রতিদিন সংবিধানকে অপমান করা!

সন্ধ্যা নাগাদ পুলিশ আন্দোলনের মূল মঞ্চটি ভেঙে দেয়। রাতে আবার মানুষ তা পুনর্দখল করে। পুলিশ যখন রাতের জন্য পিছু হটল, তখন এই তেলাপোকারা করতালির মাধ্যমে তাদের বিদায় জানালেন: শিশুদের ওপর অত্যাচার করার জন্য ধন্যবাদ জানাতে! বাহ মোদিজি, বাহ!

এখান থেকে কোনো বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে, এমন ভাবাটা বোকামি। কিন্তু একে শুধু একটি উত্তেজনাকর মুহূর্ত ভেবে উড়িয়ে দেওয়াও ভুল হবে। টিভি চ্যানেলগুলো যে এখন বিদেশি অর্থায়ন আর সিআইএর ষড়যন্ত্রের গল্প ছড়াচ্ছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একজন গর্বিতআন্দোলনজীবী’ (মোদি আমাদের মতো মানুষদের এই নামেই ডাকেন) হিসেবে সত্যি বলতে, আন্দোলনটা যখন শুরু হয়, আমিও কিছুটা সংশয়ে ছিলাম।

আমার ভয় ছিল, আমরা হয়তো আবার ২০১১ সালের আন্না হাজারের আন্দোলনের মতো কোনো ফাঁদে পা দিচ্ছি। সেই তথাকথিত দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আমাদের এমন এক রাজনৈতিক দলের হাতে তুলে দিয়েছিল, যারা দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। তারা দল আর সরকারের মধ্যে কোনো পার্থক্য রাখে না, দেশের মানুষকে সম্মান করে না এবং বিশ্বদরবারে ভারতকে লজ্জিত করেছে।

তবে ককরোচ জনতা পার্টির ওপর থেকে আমার সংশয় কেটে যায় যখন দেখলাম মূলধারার সংবাদমাধ্যম তাদের প্রতি কতটা বিদ্বেষী। এটাই ছিল আমার কাছে প্রথম ইতিবাচক ইশারা। অভিজিৎ দিপকে যে একজন দলিত সম্প্রদায়ের তরুণ, তা জেনে আমি আনন্দিত হয়েছিলাম, আর তার চেয়েও বেশি আনন্দ পেয়েছি যখন দেখলাম কেউ বিষয়টিকে ইস্যু বানায়নি। কিন্তু সবকিছু বদলে গেল যখন আমি তাঁকে বলতে শুনলাম: ‘আমার নাম যদি খালিদ হতো বা আমি যদি মুসলিম হতাম, তবে এতক্ষণে আমাকে জেলে থাকতে হতো।

ভারতের বাস্তবতা কতটা নিষ্ঠুর, তা জনসমক্ষে তুলে ধরার সাহস তিনি দেখিয়েছেন। আমাদের দেশে ধর্ম, জাতি, শ্রেণি লিঙ্গভেদে কীভাবে আইন আলাদা হয়, তা তিনি এক কথায় প্রকাশ করে দিয়েছেন। যেখানে প্রধান বিরোধী দলগুলোও কেবলসংখ্যালঘু সম্প্রদায়শব্দটি ব্যবহার করে, হিন্দু ভোটের আশঙ্কায়মুসলিমশব্দটি মুখে আনে নাসেখানে দাঁড়িয়ে দিপকের এই স্পষ্ট বক্তব্য আমাকে যন্তর মন্তরের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

আমি জানতাম, দিপকে যখনখালিদনামটি উচ্চারণ করেন, তিনি হয়তো দিল্লির জেএনইউ-এর গবেষক উমর খালিদের কথাই বলছিলেন। উমর খালিদ, শারজিল ইমামসহ অনেকেই কোনো বিচার ছাড়াই প্রায় ছয় বছর ধরে কারাগারে আছেন। উমরের অপরাধ কী ছিল? ২০২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় তিনি সবাইকে অহিংস থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ সে সময় দিল্লির রাজপথে দাঙ্গা, হত্যাকাণ্ড মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছিল পুলিশ উগ্রপন্থীদের মদদে। আদালতের বিচারকেরা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেছেন, আর তাই জামিনের আবেদনগুলো বারবার খারিজ হয়ে যাচ্ছে।

তেলাপোকাদের মিছিলে হাজার হাজার মানুষকে দেখে আমি ভাবছিলাম: ভাগ্যিস তাঁরা বেশির ভাগই মুসলিম, শিখ, খ্রিষ্টান বা আদিবাসী নয়! তা না হলে এতক্ষণে তাঁদের গুলি করে মেরে ফেলা হতো বা জেলে পোরা হতো। তাঁরা কাশ্মীরি নয় বলেও ভালো হয়েছে, তা না হলে অন্ধ করে দেওয়া হতো। তাঁরা বেশির ভাগই হিন্দুএটাই হয়তো রক্ষা। ভারতের বর্তমান অবস্থা কতটা দুঃখজনক, এটা তারই প্রমাণ।

তবে পরিস্থিতির মোড় যেকোনো মুহূর্তে ঘুরে যেতে পারে। অন্য রাজ্য থেকে হাজার হাজার আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানদের উড়িয়ে আনার সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে কী অপেক্ষা করছে, তা আমরা কেউ জানি না।

তাহলে এই আন্দোলন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আন্না হাজারের আন্দোলনের মতো এই আন্দোলনের পেছনে মিডিয়া বা টিভি চ্যানেলের সমর্থন নেই। ককরোচ জনতা পার্টির একমাত্র ভরসা তারা নিজেরা এবং ইন্টারনেট। আন্না আন্দোলনের ভেতরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ঢুকে দখল করে নিয়েছিল, এবং মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি দরজায় কড়া নাড়ছিল টিভি-সৃষ্ট উন্মাদনাকে নির্বাচনী ফায়দায় কাজে লাগানোর জন্য।

কিন্তু তেলাপোকাদের পেছনে কিন্তু এমন কোনো সংগঠিত বিরোধী দল সুযোগের অপেক্ষায় বসে নেই, যারা বিষয়টিকে আরও এগিয়ে নিতে প্রস্তুত। তাই জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ যদি কোনো রাজনৈতিক রূপ না নেয়, তবে তা একসময় মিলিয়ে যাবে। যদি বিরোধী দলগুলো তাদের ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে ঐক্যবদ্ধ না হয়, তবে এই আন্দোলন টিকবে না। সরকারও তা জানে, তাই তারা অপেক্ষা করার কৌশল নিয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকারের হাতে সময় থাকে, কিন্তু সাধারণ মানুষের হাতে থাকে না।

এই মুহূর্তে ভারতে আরও বেশ কয়েকটি আন্দোলন চলছে। মধ্যপ্রদেশে কেন-বেতোয়া নদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে আদিবাসীরা প্রতিবাদ করছেন। উত্তরাখন্ডে গাছ কাটার বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছেন। গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের পরিবেশ ধ্বংসের প্রতিবাদ হচ্ছে। মণিপুরে আগুন জ্বলছে। চাকরি নেই, জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে।

আর বিজেপি-আরএসএসের ধর্মীয় রাজনীতি যে একটি প্রতারণা, তা এখন পরিষ্কার। অযোধ্যার রামমন্দির নিয়ে যা হচ্ছে, তা একটি বাজে চিত্রনাট্যের মতো। সাধু আর দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারা হোটেল জমিজমা দখল করছেন, দামি গাড়িতে ঘুরছেনআর সবই হচ্ছে গরিবের বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে। দুর্নীতির আর দিনদুপুরের ডাকাতির অক্টোপাসীয় হাত একদম শীর্ষ পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে।

তেলাপোকাদের এই শক্তি কি আমাদের এই অন্ধকার থেকে বের করে আনতে পারবে? সহজ নয়। ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাস খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। ষাটের সত্তরের দশকে নকশালবাড়িসহ বিভিন্ন আন্দোলন জমি সম্পদ বণ্টনের দাবি জানিয়েছিল। সেগুলোকে দমন করা হয়েছিল।

আশি নব্বইয়ের দশকে সামাজিক আন্দোলনগুলোযেমন বিখ্যাত নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন, আর পরে অন্ধ্র প্রদেশ, ছত্তিশগড় ঝাড়খন্ডের মাওবাদী লড়াইকৃষক আর আদিবাসীদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। সোজা কথায়, গরিব মানুষের সম্বলটুকু যাতে কেড়ে নেওয়া না হয়, তারা কেবল সেই দাবিটাই জানিয়েছিল। কিন্তু সেই আন্দোলনগুলোকেও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০০০-এর দশকে এসে মানুষকে কেবল ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট-তেই সন্তুষ্ট থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল: ন্যূনতম মজুরিতে তিন মাসের কাজের অধিকার, যে টাকা দিয়ে শহরের কোনো দামি রেস্তোরাঁয় বড়জোর এক বেলা খাওয়া যায়।

বর্তমান সরকার সেটাও তুলে দিয়েছে। বদলে তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে জীবনধারণের ন্যূনতম রেশনমোদির ছবি সাঁটানো চাল-ডালের বস্তা। ভোট আর আনুগত্যের বিনিময়ে চলন্ত গাড়ি থেকে ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেওয়ার মতোই অবজ্ঞার সঙ্গে এসব ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে মানুষের দিকে। আর দেশের অর্থনীতিতে যেভাবে ধস নামছে, তাতে এই সামান্য সহায়তাটুকুও এখন অনিশ্চিত।

আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের ভোট দেওয়ার অধিকার আর নাগরিকত্ব রক্ষার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। সিএএ আর এনআরসির এই প্রক্রিয়া মূলত ১৯৩৫ সালের জার্মানির নাৎসি আইনের মতো, যেখানে কাগজের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব ঠিক করা হতো। ভারতে কতজনের কাছে সেই কাগজপত্র আছে?

সিএএ এনআরসির বিরুদ্ধে গণআন্দোলনগুলো যখন আন্দোলনকারীদের হত্যা আর নেতাকর্মীদের কারাবাসের মুখে পড়ে, তখন তা স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু এই তীব্র প্রতিবাদের মুখেই সরকার নতুন আইনগুলোর বাস্তবায়ন কিছুটা ধীর করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে মূলত মুসলিমদের লক্ষ্য করে প্রণীত সেই সিএএ-এনআরসি ভোটার তালিকা এখনএসআইআর’-এর ছদ্মবেশে ফিরে এসেছে।

আমাদের খুব সাধারণভাবেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে পাসপোর্টও নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের নাম। সারা দেশ এখন মরিয়া হয়েবংশপরম্পরার কাগজপত্রের’ (লিগ্যাসি পেপার্স) খোঁজ করছে। আমরা আজ জানি না আমাদের অবস্থান কোথায়। আমরা কি বৈধ, নাকি অবৈধ? আমাদের কি কোনো অধিকার আছে? ‘সংশয়যুক্ত নাগরিকদেরজন্য যে বিশাল বিশাল আটককেন্দ্র বানানো হয়েছে, তার কোনটায় ঠাঁই হবে আমাদের? আমাদের কি তবে জীবনের বাকি দিনগুলো ট্রাইব্যুনালে ট্রাইব্যুনালে ছুটে বেড়াতেই কাটাতে হবে? ফ্যাসিবাদীরা বিশৃঙ্খলা ধোঁয়াশা ভালোবাসে।

আমাদের আতঙ্ক যন্ত্রণা হয়তো এই আন্দোলনের ওপর অতিরিক্ত আশা তৈরি করছে। কেউ কেউ এর সঙ্গে বাংলাদেশ, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার ছাত্র আন্দোলনের তুলনা করছেন। কিন্তু ভারত অনেক বড় দেশ, এখানে পরিস্থিতি আলাদা। আবার কেউ ১৯৭৭ সালের জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করছেন। এসব তুলনা মোটেও অর্থবহ নয়। ককরোচ জনতা পার্টি সম্পূর্ণ নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের এক আন্দোলন; সময়ের এক অনন্য ফসল। এটি মূলত একদল অসহায় অরক্ষিত তরুণের লড়াই, যাঁরা এক নিষ্ঠুর প্রতিশোধপরায়ণ সরকারের মুখোমুখি হয়েছে। এই সরকার বিরোধীদের দমনে কতটা নির্মম হতে পারে তা বহুবার দেখিয়েছে। প্রতিপক্ষের মূল পরিকল্পনাকারীদের ওপর নিশ্চিতভাবেই প্রতিশোধ নেওয়ার ছক কষা হচ্ছে, এবং সেই প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

যে সরকার দিন দিন এতটা জনবিচ্ছিন্ন আর অপ্রিয় হয়ে উঠছে, নিজের ভোটারদের কাছে বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার না করার সাহস তারা পায় কীভাবে? সম্ভবত তাদের ধারণানির্বাচনের পুরো ব্যবস্থাটাকেই তারা পুরোপুরি কবজা করে নিতে পেরেছে। পুরো নির্বাচনী কলকবজা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। নির্বাচন কমিশনের গঠনপ্রণালিতেই গলদ তৈরি করা হয়েছে, নিরপেক্ষতার জন্য এখন আর তাদের ওপর ভরসা করা যায় না। ইভিএম কারচুপি করা হয়েছে; আসল লাখ লাখ মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সেখানে জায়গা দেওয়া হয়েছে লাখ লাখ ভুতুড়ে নাম। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আমলাতন্ত্র শাসকদলের সহযোগী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

আদালতের ওপর নির্দ্বিধায় ভরসা রাখা যায় যে তাঁরা বিচার বিলম্বিত করবেন কিংবা এই চরম জালিয়াতির দিকে চোখ বুজে থাকবেন। পুলিশের কাছে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। আর ক্ষমতায় থাকা কেউ আঙুল তুললেই গণমাধ্যম মাথা নত করে দাঁড়ায়।

সীমানাগুলো এমনভাবে নতুন করে নির্ধারণের ছক কাটা হচ্ছে, যাতে সুবিধা সব সময় বিজেপির পক্ষেই থাকে। তাহলে ক্ষমতাসীন দলের ভয় কিসের? তারা কেন কারও কথা শুনতে যাবে? বিশ্বসেরা ধনিকদের সমর্থনে গড়ে ওঠা এই দল এখন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী রাজনৈতিক দল। তারা সবকিছু কিনে নিতে পারে, কিনে নিতে পারে যে কাউকেওঅন্তত তারা এমনটাই বিশ্বাস করে।

কিন্তু এই খেলা কি চিরকাল চলতে পারে? সব মানুষকে কি সব সময় বোকা বানিয়ে রাখা সম্ভব? ১৫০ কোটি জনসংখ্যার একটা দেশকে কি চিরকাল লাশের মতো টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া যায়? সম্ভব নয়। তেলাপোকারা রাজপথে নেমে এসেছে। কৃষকেরা আবারও দিল্লির দিকে পদযাত্রা শুরু করেছেন।

এবার ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তির প্রতিবাদে, যা ভারত সরকার দাসানুদাস হয়ে স্বাক্ষর করতে রাজি হয়েছে এবং যা তাদের জন্য এক মৃত্যু পরোয়ানা। শহরের সীমানা সিল করে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তা তাঁদের থামাতে পারবে বলে মনে হয় না। কীভাবে একটুবিপজ্জনকহয়ে উঠতে হয়, হয়তো আমাদের বাকিরা কৃষক আর এই তেলাপোকাদের কাছ থেকে সেই শিক্ষা নিতে পারি। তরুণেরা আমাদের এক অনন্য উপহার দিয়েছেন। তাঁরা যা করেছেন তাকে সার্থক করে তোলার দায়িত্ব এখন আমাদের সবার, প্রতিটি মানুষের।

একজন প্রধানমন্ত্রী যখন শারীরিকভাবে পালিয়ে যান, তখন রাজত্ব থেকেও তাঁর পতন খুব বেশি দূরে নয়।

তবে এই শাসনব্যবস্থা এত সহজে ছেড়ে দেবে না। রাজধানীর রাজপথে এই অপমান তারা মেনে নেবে না। আমরা হয়তো রক্তপাত দেখতে যাচ্ছি। তরুণদের ধৈর্য ক্ষয়ে আসছে। এই উদ্দীপ্ত তরুণ দলের মধ্যে কেউ একজন মেজাজ হারিয়ে পুলিশকে গুলি চালানোর সুযোগ করে দেওয়া পর্যন্ত আর কতক্ষণ? আমাদের ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য তারা সবকিছুই করবে। আর তাদের থামানোর জন্য যা করা দরকার, আমাদেরও তা করতে হবে।

দ্য ওয়ার ইন, ইংরেজি থেকে অনূদিত