ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার ঠিক দুই মাস পর এর অনুসারীরা এখন এক চরম পরিস্থিতির মুখোমুখি। দিল্লির যন্তর মন্তর মানমন্দিরে সিজেপির অবস্থান কর্মসূচি থেকে শিক্ষাবিদ ও আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ। অনির্দিষ্টকালের অনশনের ২১তম দিনে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ ঘটনার পর
বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকেও অনশন শুরু করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়
ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা ভারতের পার্লামেন্টের দিকে
যাত্রা করেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র
মোদির পদত্যাগের দাবিও উঠেছে।
গত মে মাসের
মাঝামাঝি সময়ে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা’
বলে মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর এ মন্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরপরই জন্ম
নেয় সিজেপি। ভারতের তরুণদের মধ্যে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁরা একের পর এক বিশাল প্রতিবাদ
কর্মসূচি গড়ে তোলেন।
গত শনিবারের
এ সংঘাতের আগে সরকারের অবস্থান ছিল ভিন্ন। তারা কঠোর দমন–পীড়নও
করেনি, আবার আন্দোলন মেনেও নেয়নি। সরকারের নীতি ছিল বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করা। আন্দোলনকে
একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে রাখা এবং জোট ভেঙে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু
এখন মনে হচ্ছে, সিজেপির এই উত্থান শাসকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
সিজেপিকে এখন
আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাময়িক ভাইরাল ঝড় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন
কোনো ব্যঙ্গাত্মক তরুণ সংগঠন নয়, যা রাস্তায় অল্প কিছুদিন দৃশ্যমান থেকে মিলিয়ে যাবে।
এই ‘তেলাপোকা’ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। কারণ, এটি সমাজের এক গভীর ক্ষোভের
নাম দিয়েছে।
কাউকে তেলাপোকা
বলার অর্থ হলো তাকে নোংরা, অপ্রয়োজনীয় ও চোখের আড়ালে রাখার যোগ্য মনে করা। তেলাপোকাকে
সবাই ঘৃণা করে, কিন্তু এটি সহজে মরে না। এটি সমাজের অন্ধকার কোণে টিকে থাকে। বিষ, অন্ধকার
আর ঘৃণা সহ্য করেও এটি বেঁচে থাকে। ঘরের মালিকেরা ঘর যতই পরিষ্কার দাবি করুক না কেন,
ময়লা থাকলেই তেলাপোকা বেরিয়ে আসে।
ভারতের বহু
তরুণ এখন বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মুখোমুখি। এই অপমানজনক
শব্দটি তাঁদের ভেতরের কষ্টকেই যেন ফুটিয়ে তুলেছে। সিজেপি তরুণদের এই অপমানকে দৃশ্যমান
করেছে। তাঁরা বলতে চাইছেন, ক্ষমতা যদি আমাদের এই চোখেই দেখে, তবে এ নামেই আমরা আমাদের
কথা বলব। ফলে একটি গালি এখন তাঁদের গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি কোনো বিপ্লবী রাজনীতি
নয়। এই তেলাপোকা আসলে সেই ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে লাখো তরুণের ওপরমুখী হওয়ার
স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
এমন এক সময়ে
এই ‘তেলাপোকা রাজনীতি’র উদয় হলো, যখন নরেন্দ্র মোদির ভারতীয়
জনতা পার্টি (বিজেপি) এক অপরাজেয় নির্বাচনী যন্ত্র চালাচ্ছে। তাদের রয়েছে বিপুল অর্থবল,
আদর্শিক শৃঙ্খলা ও কল্যাণমুখী প্রকল্প। তারা হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও বিরোধীদের বিভাজনকে
ভোটে রূপান্তর করতে পারদর্শী।
তবু ২০২৪ সালের
সাধারণ নির্বাচনে বিজেপি জাতীয়ভাবে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভোটারের সমর্থন পেয়েছে। অর্থাৎ
ভোট দেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপিকে সমর্থন করেননি। বর্তমান
সরকারের ক্ষমতা কোনো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি টিকে আছে আঞ্চলিক
ও জাতিগত জোট, বিরোধী দলের ভাঙন এবং দুই প্রধান দলের বাইরে তৃতীয় শক্তির দুর্বলতার
সুযোগ নিয়ে।
বর্তমানে ওপর
থেকে নির্বাচনী রাজনীতি গোছানো মনে হলেও নিচ থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা নড়বড়ে। তরুণেরা
চাকরিহীনতা ও পরীক্ষা বাতিলের কারণে ক্ষুব্ধ। তাঁরা এমন এক সময়ে রাজনীতিতে আসছেন, যখন
ক্ষোভ প্রকাশের গণতান্ত্রিক মাধ্যমগুলো—যেমন রাজনৈতিক দল, নির্বাচন, গণমাধ্যম
ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান—দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে।
কোভিড-১৯ মহামারির
পর ভারতের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খায়। বর্তমানে ৮০ কোটির বেশি ভারতীয় সরকারের দেওয়া ফ্রি
রেশনের ওপর নির্ভরশীল। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এই খাদ্যসহায়তা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে
তারা কোনোমতে বেঁচে আছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এই খাদ্যসহায়তা
সমাজের আসল উন্নয়নকে বোঝায় না; বরং এটি মহামারি–যুগের অর্থনৈতিক দুর্বলতা দূর করতে রাষ্ট্রের
ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে।
অন্যদিকে দেশের
সম্পদ মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে চলে গেছে। ভারতের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী এখন দেশের মোট
আয়ের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা গত এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়।
এটাই বর্তমানের রাজনৈতিক অর্থনীতি—নিচে খয়রাতি সাহায্য, ওপরে একচেটিয়া ব্যবসা
আর মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে মধ্যবিত্ত সমাজ। এই মধ্যবিত্ত এখন চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি আর অবরুদ্ধ
আকাঙ্ক্ষার শিকার।
ভারত স্কুল
ও উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটিয়েছে, কিন্তু তরুণদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ও স্থায়ী কর্মসংস্থান
তৈরি করতে পারেনি। শিক্ষিত তরুণেরাই এই বৈপরীত্যের সবচেয়ে বড় শিকার। তাঁরা বিশ্বাস
করেছিলেন, ডিগ্রি থাকলেই জীবনে উন্নতি করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তব অর্থনীতি তাঁদের কেবল
হতাশাই দিচ্ছে।
এ কারণেই প্রশ্নপত্র
ফাঁস বা পরীক্ষা বাতিল তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে
একটি পরীক্ষা মানে কেবলই একটি পরীক্ষা নয়। এটি জীবন পরিবর্তনের এক জুয়া খেলা। সন্তান
যাতে একটি সম্মানজনক চাকরি পায়, সে জন্য মা-বাবা সঞ্চয় করেন, ঋণ নেন, এমনকি জমিও বিক্রি
করে দেন। কোচিং সেন্টারে দেন চড়া ফি।
যখন একটি পরীক্ষার
প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, তখন সেই পরিবারের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়। রাষ্ট্র কেবল
পরীক্ষা নিতেই ব্যর্থ হয় না, বরং লাখ লাখ পরিবারের ত্যাগকে উপহাস করে।
তেলাপোকা প্রতীকটি
তাই আজ অনেক ভারী অর্থ বহন করছে। এটি এমন এক নাগরিকের কথা বলে, যে কোনো সম্মান ছাড়াই
বেঁচে থাকে। মোদি–আমল ভোট জিততে পারলেও সামাজিক অসন্তোষ
দূর করতে পারেনি। ভারতের লাখ লাখ তরুণ আজ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন—যাঁদের
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ বা বৈশ্বিক যোগাযোগ নেই, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী?
সিজেপি নিজেও
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। এই দল অত্যন্ত ভঙ্গুর ও দুর্বল। এর অসংলগ্নতাই এর
আসল সত্য। এটি নতুন কোনো দলের আগমনবার্তা নয়, বরং পুরোনো রাজনীতির ব্যর্থতার প্রতীক।
কোনো ব্যঙ্গাত্মক
আন্দোলন এত দূর এলে সমাজ পরিবর্তনের জন্য তার পুরোপুরি রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠার প্রয়োজন
পড়ে না। সাধারণ ভাষায় কথা বলা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ ব্যঙ্গের আশ্রয় নেয়। সংগঠিত
রাজনীতি যখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তখন মানুষ মিমের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানায়। অন্ধকার সময়ে
হাসতে পারাটাই হলো সাহসের শেষ রূপ।
তেলাপোকা কোনো
বিপ্লবী নায়ক নয়। এটি এক সাধারণ জীব, যা ঘরের মালিকদের পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার
দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে।
আল–জাজিরা
থেকে অনুবাদ